ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশে ফিরে বিচার মোকাবিলা করতে চান—এমন দাবি ঘিরে নতুন করে রাজনৈতিক আলোচনা শুরু হয়েছে। দলীয় সূত্র ও নেতাদের বক্তব্য অনুযায়ী, তিনি মৃত্যুদণ্ডের রায় মাথায় নিয়েই দেশে ফেরার মানসিক প্রস্তুতি নিয়েছেন বলে প্রচার করা হচ্ছে। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের বড় অংশ এটিকে বাস্তব পরিকল্পনার চেয়ে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের চাঙা রাখার কৌশল হিসেবেই দেখছেন।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের পর ভারতে আশ্রয় নেওয়া শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধ, গণহত্যা, গুম-খুন ও দুর্নীতিসহ একাধিক মামলা বর্তমানে বিচারাধীন। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) ইতোমধ্যে তাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে এবং সম্পদ বাজেয়াপ্তের নির্দেশও এসেছে।
আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এ এফ এম বাহাউদ্দীন নাছিম দাবি করেছেন, শেখ হাসিনা দ্রুত দেশে ফিরতে চান এবং এ লক্ষ্যে দলীয় প্রস্তুতিও চলছে। তিনি বলেন, নেতাকর্মীদের পাশে দাঁড়াতেই শেখ হাসিনা দেশে ফিরবেন এবং তার প্রত্যাবর্তন ঘিরে বড় জনসমাগমের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
দলীয় সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, ইউরোপে অবস্থানরত আওয়ামী লীগের এক নেতা সম্প্রতি শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে জানতে পেরেছেন—তিনি দেশে ফিরে আদালতের মুখোমুখি হতে চান। এমনকি আগামী ১৫ আগস্টের আগেই দিল্লিতে বাংলাদেশ হাইকমিশনের কাছে ট্রাভেল পাস (ভ্রমণ অনুমতিপত্র) চাওয়ার সম্ভাবনার কথাও আলোচনা হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
একটি টেলিগ্রাম গ্রুপ কলে শেখ হাসিনা নাকি বলেছেন, জীবনের বাকি সময় খুব বেশি নয়; গণতন্ত্রের জন্য দেশে ফিরে ফাঁসির মঞ্চেও যেতে হলে তাতেও তার আপত্তি থাকবে না। যদিও এসব বক্তব্যের স্বাধীন যাচাই এখনো সম্ভব হয়নি।
বর্তমানে ভারতে অবস্থান করলেও শেখ হাসিনা নিয়মিত দলীয় নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করছেন বলেও জানা গেছে। আওয়ামী লীগের নেতারা বলছেন, ভারত সরকার তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করে এসব বৈঠকের সুযোগ দিচ্ছে। দলকে পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে নেতাকর্মীদের সংগঠিত করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে জাহাঙ্গীর কবির নানককে।
অন্যদিকে অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকেও শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচার মুখোমুখি করার বিষয়ে অবস্থান স্পষ্ট করা হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, ভারত-বাংলাদেশ চুক্তি অনুযায়ী তাকে ফেরত চেয়ে আনুষ্ঠানিক অনুরোধ জানানো হয়েছে এবং সরকার চায় তিনি আদালতে মামলার মুখোমুখি হন।
তবে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী দিলায়ারা চৌধুরী মনে করেন, শেখ হাসিনার দেশে ফেরার বক্তব্য মূলত রাজনৈতিক কৌশল। তার মতে, বর্তমান বাস্তবতায় দেশে ফেরার মতো বিশ্বাসযোগ্য কোনো ইঙ্গিত এখনো দেখা যাচ্ছে না। বরং সরকার চাইলে আইনগত প্রক্রিয়ায় তাকে ফিরিয়ে এনে রায় কার্যকর করার উদ্যোগ নিতে পারে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে ফিরলে শেখ হাসিনাকে প্রথমেই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আত্মসমর্পণ করতে হতে পারে। এছাড়া গণহত্যা, গুম, হত্যা ও দুর্নীতির মামলাগুলোও তাকে মোকাবিলা করতে হবে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাবেক চিফ প্রসিকিউটর (প্রধান কৌঁসুলি) ও সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী তাজুল ইসলাম বলেন, আপিলের নির্ধারিত সময় ইতোমধ্যে পেরিয়ে গেছে; ফলে তিনি নতুন করে আপিল করতে পারবেন কি না, সেটি সুপ্রিম কোর্টের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে।
সব মিলিয়ে শেখ হাসিনার সম্ভাব্য দেশে ফেরা এখনো রাজনৈতিক অঙ্গনে জল্পনা-কল্পনার বিষয়। আওয়ামী লীগ এটিকে দল পুনর্গঠনের আশার প্রতীক হিসেবে তুলে ধরলেও বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করছেন, এটি মূলত সাংগঠনিক মনোবল ধরে রাখার প্রচেষ্টা।
সূত্র : টাইমস অব বাংলাদেশ


