টানা ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে দেশের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র রাঙামাটির সাজেকে আটকা পড়েছেন পাঁচ শতাধিক পর্যটক। একই সঙ্গে অব্যাহত বৃষ্টিতে পাহাড়ধস ও আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যাওয়ায় সাজেকসহ রাঙামাটির সব পর্যটন স্পটে ভ্রমণ সাময়িকভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে জেলা প্রশাসন। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত পর্যটকদের পাহাড়ি এলাকায় ভ্রমণ থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে।
বুধবার (৮ জুলাই) দুপুরে বিষয়টি নিশ্চিত করেন বাঘাইছড়ি উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আমেনা মারজান।
তিনি জানান, খাগড়াছড়ির দিঘীনালা-বাঘাইহাট-সাজেক সড়কের একাধিক নিচু স্থানে পাহাড়ি ঢলের পানি উঠে যাওয়ায় যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে সাজেকে অবস্থানরত পাঁচ শতাধিক পর্যটক ফিরতে পারছেন না। তাদের নিরাপদে বিভিন্ন রিসোর্ট, কটেজ ও আবাসন কেন্দ্রে অবস্থান করতে বলা হয়েছে।
ইউএনও আরও জানান, স্থানীয় প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো সার্বক্ষণিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। সড়কের পানি নেমে গেলে এবং যাতায়াত নিরাপদ হলে পর্যটকদের পর্যায়ক্রমে নিজ নিজ গন্তব্যে পাঠানো হবে।

আবহাওয়া পরিস্থিতি দিন দিন আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। গত ২৪ ঘণ্টায় পাহাড়ি অঞ্চলে ২৮৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এতে পাহাড়ের মাটি নরম হয়ে যাওয়ায় ভূমিধসের আশঙ্কা বেড়েছে। পাশাপাশি পাহাড়ি ছড়া ও ঝিরির পানি দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ায় বিভিন্ন নিচু এলাকায় জলাবদ্ধতা ও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঘটনা ঘটছে।
দুর্যোগের ঝুঁকি বিবেচনায় জেলা প্রশাসন সাজেকসহ জেলার সব পর্যটন স্পটে ভ্রমণ সাময়িকভাবে নিষিদ্ধ করেছে। নতুন করে কোনো পর্যটককে পাহাড়ি এলাকায় না যাওয়ার জন্য অনুরোধ জানানো হয়েছে।
জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, সম্ভাব্য দুর্যোগ মোকাবিলায় রাঙামাটির ১০ উপজেলায় ২১২টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
রাঙামাটি জেলার ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম জানান, রাঙামাটি সদর, কাউখালী, কাপ্তাই ও বাঘাইছড়ি উপজেলার ১৬টি আশ্রয়কেন্দ্রে বর্তমানে ৮০৪ জন আশ্রয় নিয়েছেন। জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের পাশাপাশি বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের উদ্যোগে তাদের জন্য শুকনো খাবারসহ প্রয়োজনীয় ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করা হচ্ছে।
দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে রাঙামাটি জেলার সব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে পুনরায় শিক্ষা কার্যক্রম চালু করা হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
এদিকে সম্ভাব্য ভূমিধস নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ বাড়িয়েছে সড়ক ও জনপথ বিভাগের একটি বৈজ্ঞানিক গবেষণা।
রাঙামাটি সড়ক বিভাগের উদ্যোগে ২০২২ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত পরিবেশগত ও ভৌগোলিক তথ্য পরিষেবা কেন্দ্র (সিইজিআইএস) তিন পার্বত্য জেলায় জিআইএস ভিত্তিক বৃষ্টিপাতের থ্রেশহোল্ড মডেলিং পদ্ধতিতে একটি গবেষণা পরিচালনা করে।
গবেষণায় বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেন, যদি কয়েকদিন ধরে একটি বৃষ্টিবলয়ের প্রভাবে ধারাবাহিক বৃষ্টি হয়, মোট বৃষ্টিপাত ৩৭৫ মিলিমিটারে পৌঁছে এবং বৃষ্টির গড় হার প্রতি ঘণ্টায় ৮.১০ মিলিমিটারের বেশি হয়, তাহলে পাহাড়ধস শুরু হওয়ার ঝুঁকি অত্যন্ত বেড়ে যায়।
রাঙামাটি সড়ক বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গতকাল সকাল ৬টা থেকে আজ সকাল ৬টা পর্যন্ত জেলায় ২৮৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে এবং বৃষ্টির হার ছিল ঘণ্টায় ১১.৯৫ মিলিমিটার, যা গবেষণায় নির্ধারিত ঝুঁকির হারের চেয়েও বেশি।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, বর্তমান গতিতে বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে আজ রাতের মধ্যেই মোট বৃষ্টিপাত ৩৭৫ মিলিমিটার অতিক্রম করতে পারে। এরপরও যদি আগামীকাল বৃষ্টিপাত চলমান থাকে এবং ঘণ্টায় ৮ মিলিমিটারের বেশি হারে বৃষ্টি হয়, তাহলে পাহাড়ধসের ঝুঁকি ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে।
গবেষণাটি মূলত সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের আওতাধীন পাহাড়ঘেঁষা সড়কগুলোর জন্য পরিচালিত হলেও এর ফলাফল পার্বত্য অঞ্চলের সামগ্রিক ঝুঁকি মূল্যায়নেও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী ১১ জুলাই পর্যন্ত রাঙামাটিসহ পার্বত্য এলাকায় মাঝারি থেকে ভারী বর্ষণ অব্যাহত থাকতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এ বছর শক্তিশালী সুপার এল নিনোর প্রভাবে স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি বৃষ্টিপাত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
এ অবস্থায় জেলা প্রশাসন, সেনাবাহিনী, পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোকে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রাখা হয়েছে।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারী মানুষকে দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে জরুরি প্রয়োজন ছাড়া পাহাড়ি এলাকায় ভ্রমণ না করা এবং প্রশাসনের নির্দেশনা মেনে চলার জন্য সর্বসাধারণের প্রতি অনুরোধ জানানো হয়েছে।


