বৃহস্পতিবার, ২ জুলাই ২০২৬
Single Top Banner

  ‘৩৬ জুলাই’

নিজস্ব প্রতিবেদক :

২০২৪ সালের জুলাই মাস বাংলাদেশের ইতিহাসে এক ব্যতিক্রমী অধ্যায়ের নাম। ক্যালেন্ডারের হিসাবে জুলাই মাস ৩১ দিনের হলেও গণআন্দোলনের উত্তাপে সেই মাস যেন শেষই হয়নি। আন্দোলন চলতে থাকে আগস্টের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত। তাই আন্দোলনকারীরা প্রতীকীভাবে ১ আগস্টকে ‘৩২ জুলাই’, ২ আগস্টকে ‘৩৩ জুলাই’, ৩ আগস্টকে ‘৩৪ জুলাই’, ৪ আগস্টকে ‘৩৫ জুলাই’ এবং ৫ আগস্টকে ‘৩৬ জুলাই’ নামে অভিহিত করেন। সেই থেকেই ‘৩৬ জুলাই’ কেবল একটি প্রতীকী তারিখ নয়, বরং বাংলাদেশের ইতিহাসে গণঅভ্যুত্থান, আত্মত্যাগ, প্রতিরোধ ও বিজয়ের এক অবিস্মরণীয় স্মারকে পরিণত হয়। আন্দোলনের সময় দেশের বিভিন্ন শহরের দেয়ালে দেয়ালে বড় অক্ষরে লেখা হয়েছিল ‘৩৬ জুলাই’। চারুকলার শিক্ষার্থী, তরুণ শিল্পী ও স্বেচ্ছাসেবীরা রাতভর আঁকেন শহীদদের প্রতিকৃতি, রক্তাক্ত হাত, শিকল ভাঙার প্রতীক, জাতীয় পতাকা এবং প্রতিবাদের নানা চিত্র। এসব দেয়ালচিত্র হয়ে ওঠে আন্দোলনের নীরব ভাষা, যা আজও সেই সময়ের সাক্ষ্য বহন করে।

জুলাই-আগস্টের এই আন্দোলনের সূত্রপাত হয় ২০২৪ সালের ৫ জুন। ওইদিন হাইকোর্ট সরকারি চাকরিতে ৩০ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা কোটা পুনর্বহালের নির্দেশ দিয়ে রায় দেন। রায়ের পরপরই দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ সৃষ্টি হয়। তারা এই কোটা ব্যবস্থাকে বৈষম্যমূলক আখ্যা দিয়ে প্রতিবাদে নামেন। সেদিন সন্ধ্যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রথম প্রতিবাদ মিছিল বের হয়। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের প্রায় সব সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে।

ঈদুল আজহার ছুটির কারণে আন্দোলনে সাময়িক বিরতি এলেও ১ জুলাই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলার সঙ্গে সঙ্গে আন্দোলন আরও শক্তিশালী হয়ে ফিরে আসে। শিক্ষার্থীরা ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’ নামে একটি সমন্বিত প্ল্যাটফর্ম গঠন করেন। দ্রুতই এই আন্দোলন কেবল কোটা সংস্কারের দাবিতে সীমাবদ্ধ না থেকে বৃহত্তর গণআন্দোলনের রূপ নিতে শুরু করে।

৪ জুলাই আপিল বিভাগ হাইকোর্টের রায় বহাল রাখলে আন্দোলন নতুন গতি পায়। পরদিন থেকেই শুরু হয় দেশব্যাপী বিক্ষোভ, অবস্থান কর্মসূচি ও সড়ক অবরোধ। ৬ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ‘বাংলা ব্লকেড’ কর্মসূচির ঘোষণা দেওয়া হয় এবং ৭ জুলাই থেকে দেশের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও রেলপথ অবরোধ করা হয়। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে জনজীবন কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে। ১০ জুলাই আপিল বিভাগ রায়ের ওপর স্থিতাবস্থা জারি করলেও আন্দোলনকারীরা কর্মসূচি প্রত্যাহার করেননি। তাদের দাবি ছিল কোটা ব্যবস্থার স্থায়ী ও গ্রহণযোগ্য সংস্কার।

১৪ জুলাই তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একটি বক্তব্য আন্দোলনে নতুন মোড় এনে দেয়। তিনি গণভবনে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, “মুক্তিযোদ্ধাদের নাতি-পুতিরা পাবে না? তাহলে কি রাজাকারের নাতি-পুতিরা পাবে?” এই বক্তব্যকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। শিক্ষার্থীরা ক্ষুব্ধ হয়ে আরও বড় পরিসরে আন্দোলনে যুক্ত হন।

১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রলীগের হামলার অভিযোগ ওঠে। এতে বহু শিক্ষার্থী আহত হন। আহতদের দেখতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গেলে সেখানেও হামলার অভিযোগ উঠে। একই রাতে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়েও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। ১৬ জুলাই রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন। দুই হাত প্রসারিত করে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় তাকে গুলি করার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে সারা দেশে ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটে। ওইদিনই সরকার দেশের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করে। কিন্তু শিক্ষার্থীরা আন্দোলন থেকে সরে আসেননি। বরং বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্ররাজনীতিমুক্ত ক্যাম্পাসের দাবিও জোরালো হয়ে ওঠে।

১৭ ও ১৮ জুলাই আন্দোলনে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন। রাজধানী ঢাকা সংঘর্ষ, ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে ওঠে। ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচির আওতায় সারা দেশে ব্যাপক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে এবং বহু মানুষ হতাহত হন। ১৯ জুলাই পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নেয়। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে গুলিবর্ষণ, অগ্নিসংযোগ ও সহিংসতার ঘটনা ঘটে। হাসপাতালগুলোতে আহত ও নিহতদের ভিড় বাড়তে থাকে। বিভিন্ন সরকারি স্থাপনা, মেট্রোরেল স্টেশন, এক্সপ্রেসওয়ের টোল প্লাজা এবং নরসিংদী জেলা কারাগারকে কেন্দ্র করে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার কারফিউ জারি করে এবং সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়।

জুলাই মাসের শেষ সপ্তাহে আন্দোলন আর শুধু শিক্ষার্থীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। শিক্ষক, আইনজীবী, চিকিৎসক, সাংবাদিক, সাংস্কৃতিক কর্মী, শ্রমিক, ব্যবসায়ী, অভিভাবকসহ সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এতে যুক্ত হন। দেশের বিভিন্ন জেলায় প্রতিদিনই মিছিল, প্রতিবাদ সমাবেশ, শোক কর্মসূচি এবং শহীদদের স্মরণে নানা আয়োজন চলতে থাকে। আন্দোলনকারীরা ঘোষণা করেন, বিজয় না আসা পর্যন্ত ‘জুলাই’ শেষ হবে না। সেই ভাবনা থেকেই ১ আগস্টকে ‘৩২ জুলাই’, ২ আগস্টকে ‘৩৩ জুলাই’, ৩ আগস্টকে ‘৩৪ জুলাই’, ৪ আগস্টকে ‘৩৫ জুলাই’ এবং ৫ আগস্টকে ‘৩৬ জুলাই’ হিসেবে প্রতীকীভাবে ঘোষণা করা হয়।

৩ আগস্ট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে অনুষ্ঠিত সমাবেশে সরকার পতনের এক দফা দাবি ঘোষণা করা হয়। এরপর ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। প্রথমে ৬ আগস্ট কর্মসূচির দিন নির্ধারণ করা হলেও পরবর্তীতে তা এগিয়ে এনে ৫ আগস্ট পালন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ৫ আগস্ট, প্রতীকী ‘৩৬ জুলাই’, দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লাখো মানুষ ঢাকায় সমবেত হন। নানা বাধা, কারফিউ ও নিরাপত্তা ঝুঁকি উপেক্ষা করে মানুষ রাজপথে অবস্থান নেন। সেদিন দুপুরের আগেই শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে ভারতে চলে যান। দীর্ঘ আন্দোলনের পর সেই দিনটিকে আন্দোলনকারীরা বিজয়ের দিন হিসেবে ঘোষণা করেন। সেই সঙ্গে ‘৩৬ জুলাই’ বাংলাদেশের ইতিহাসে গণঅভ্যুত্থান, প্রতিরোধ, আত্মত্যাগ ও পরিবর্তনের এক অবিস্মরণীয় প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়।

আন্দোলনের সময় দেশের বিভিন্ন দেয়ালে আঁকা শত শত গ্রাফিতি ও ম্যুরালে লেখা ছিল—‘৩৬ জুলাই’, ‘জুলাই শেষ হয়নি’, ‘আমার ভাইয়ের রক্ত বৃথা যেতে দেব না’, ‘বিজয় না হওয়া পর্যন্ত সংগ্রাম চলবে’—এমন অসংখ্য স্লোগান। শহীদদের মুখাবয়ব, রক্তমাখা পতাকা, শিকল ভাঙার প্রতীক এবং স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা ফুটে ওঠা এসব দেয়ালচিত্র আজও সেই আন্দোলনের স্মৃতি বহন করছে। তাই ‘৩৬ জুলাই’ শুধু একটি প্রতীকী দিন নয়; এটি একটি সময়ের নাম, একটি সংগ্রামের নাম এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে গণমানুষের প্রতিরোধ ও পরিবর্তনের এক অনন্য অধ্যায়।

Single Sidebar Banner
  • সর্বশেষ
  • পঠিত