চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের গুদাম থেকে বিপুলসংখ্যক পরীক্ষার খাতা ও লুজশিট উধাও হয়ে যাওয়ার ঘটনায় তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। বোর্ডের গুদামে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার জন্য বিশেষায়িত ১৬ লাখ ৪৫ হাজার ১৮৯টি খাতা থাকার কথা থাকলেও গণনায় মেলে মাত্র ১০ লাখ ৪৭ হাজারটি। অর্থাৎ প্রায় ছয় লাখ খাতা গায়েব হয়ে গেছে। একইভাবে ১২ লাখ ৪৮ হাজার ৭৯০টি লুজশিট থাকার কথা থাকলেও পাওয়া গেছে সাড়ে আট লাখ, উধাও প্রায় চার লাখ। এ ঘটনায় বোর্ডের ভবিষ্যৎ পরীক্ষাগুলোতে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন।
ঘটনাটি ধরা পড়েছে এক সপ্তাহ আগে, তবে গোপনীয়তা রক্ষার চেষ্টা চলায় বিষয়টি নিয়ে সন্দেহ আরও ঘনীভূত হয়েছে। বোর্ডের সঙ্গে যুক্ত অনেকেই দাবি করছেন, খাতা উধাও এবং সাম্প্রতিক ফল জালিয়াতির ঘটনাগুলো একই সিন্ডিকেটের কাজ। তাদের অভিযোগ, বোর্ডের কিছু দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা, ঠিকাদার এবং বাইরের একটি প্রভাবশালী চক্র দীর্ঘদিন ধরে নানা অনিয়ম করে আসছে। এ চক্রটির নিয়ন্ত্রণে আগে ছিলেন পলাতক শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল। শীর্ষ পদে পরিবর্তন এলেও নিচের দিকের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অপরিবর্তিত থাকায় একই সিন্ডিকেট এখনও সক্রিয়।
শিক্ষা বোর্ডে ফল জালিয়াতির অভিযোগ নতুন নয়। ২০২৩ সালের শেষ দিকে আলোচনায় আসে তৎকালীন সচিব ও সাবেক পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক নারায়ণ চন্দ্র নাথের বিরুদ্ধে নিজের ছেলেকে জিপিএ-৫ পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগ। অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তাকে কারাগারে যেতে হয়। এ বছরও অন্তত ২৩ শিক্ষার্থীর ফল জালিয়াতির ঘটনা ধরা পড়ে। খাতায় লেখা নম্বর ও সার্ভারে প্রকাশিত ফলের মধ্যে আট থেকে ২০ নম্বর পর্যন্ত পার্থক্য পাওয়া যায়। বিষয়টি ধরা পড়ার পর বোর্ড কর্তৃপক্ষ সার্ভারে সংশোধন করে এবং তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে।
এ ছাড়া সম্প্রতি রেজিস্ট্রেশন জালিয়াতির চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। খাগড়াছড়ির রামগড় উপজেলার হাফছড়ি উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্রী সাদিয়া জাহান লাভলী ২০২৫ সালের এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৩.৭৮ পেয়েছিলেন। অন্যদিকে একই উপজেলার শহীদ লে. মুশফিক উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্র পিয়াল আশরাফ শান্ত পেয়েছিলেন জিপিএ-৩.৪৪। কিন্তু বোর্ড কর্মকর্তারা সাদিয়ার ফল পিয়ালের নামে দেখান। তদন্তে জানা যায়, পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক প্রফেসর ড. পারভেজ সাজ্জাদ চৌধুরী সাদিয়ার মার্কশিটে নাম, বাবার নাম ও মায়ের নাম পরিবর্তনের লিখিত নির্দেশ দিয়েছিলেন। তবে রেজিস্ট্রেশন নম্বর অপরিবর্তিত থাকায় বিষয়টি ধরা পড়ে যায়। তদন্ত কমিটি এ ঘটনাকে নিছক ভুল বলে দায়সারা প্রতিবেদন জমা দিলেও এতে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের সরাসরি দায় এড়ানো যাচ্ছে না বলে বোর্ড সূত্র জানিয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগের সাবেক শিক্ষামন্ত্রীর অনুসারী কর্মকর্তারাই এখনো বোর্ড নিয়ন্ত্রণ করছেন। এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বহু বছর ধরে ফল পরিবর্তন, জিপিএ-৫ পাইয়ে দেওয়া এবং শিক্ষার্থীদের ভাগ্য বদলে দেওয়ার মতো অনিয়ম চলে আসছে। প্রতিটি রেজাল্ট পরিবর্তনের জন্য ১০ থেকে ১২ লাখ টাকা পর্যন্ত লেনদেন হচ্ছে বলে অভিযোগ।
এ বিষয়ে বোর্ড সচিব প্রফেসর ড. সামছু উদ্দিন আজাদ বলেন, গত ১৬ বছর ধরে বোর্ডের স্টোর মেলানো হয়নি। তিনি সম্প্রতি এ কাজ শুরু করেছেন এবং এতে খাতা-সহ অনেক জিনিস রেজিস্টারের সঙ্গে মিলছে না। কাজটি চলমান রয়েছে, শেষ হলে বিস্তারিত জানা যাবে। পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক পারভেজ সাজ্জাদ চৌধুরী বলেন, জনবল সংকটের কারণে দু-তিনজন অপারেটরের মাধ্যমে অনেক কাজ করাতে হয়। এ কারণে কিছু খাতায় ভুল নম্বর পোস্টিং হয়েছে, তবে তা পরে সংশোধন করা হয়েছে। তদন্তে কারও গাফিলতি প্রমাণিত হলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বোর্ড চেয়ারম্যান ইলিয়াস উদ্দিন আহাম্মদ জানান, খাতা উধাও হওয়ার বিষয়টি তিনি শুনেছেন। স্টোরে অন্য কোনো জিনিস কম আছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। নিশ্চিত হওয়ার পর আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হবে। ফল জালিয়াতি ও রেজিস্ট্রেশন জালিয়াতি—উভয় বিষয়ে তদন্ত চলছে। প্রয়োজনে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন নতুন তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) চট্টগ্রাম জেলা শাখার সম্পাদক আখতার কবির চৌধুরী বলেন, শিক্ষার্থীর ফল পরিবর্তন করে দেওয়ার মতো গর্হিত অপরাধ আর হতে পারে না। নারীকে পুরুষ বানানোর মতো ঘটনাও ঘটেছে। এখানে সাধারণ কর্মচারীদের ওপর দায় চাপানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। অথচ সার্ভারের পাসওয়ার্ডসহ একাধিক নিরাপত্তা স্তর নিয়ন্ত্রণ ছাড়া এ ধরনের জালিয়াতি সম্ভব নয়। ছয় লাখ খাতা উধাও হওয়াও অত্যন্ত অস্বাভাবিক। প্রতি বছর নিয়মিত অডিট হওয়ার কথা থাকলেও তা হয়নি। দায় এড়ানো যাবে না।
চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের এই সব অনিয়ম ও জালিয়াতি নিয়ে শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং শিক্ষাবিদদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিষয়টি যদি এখনই সঠিকভাবে তদন্ত করে কঠোর ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তবে ভবিষ্যৎ পরীক্ষার বিশ্বাসযোগ্যতা পুরোপুরি প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়বে।


