শুক্রবার, ৩ জুলাই ২০২৬
Single Top Banner

গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটে দুই বছরে বন্ধ পাঁচ শতাধিক শিল্পকারখানা, ঝুঁকিতে আরও শত শত প্রতিষ্ঠান

নিজস্ব প্রতিবেদক :

দেশের শিল্প খাত গভীর সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। গত দুই বছরে গ্যাস ও বিদ্যুতের তীব্র সংকট, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, রপ্তানি আদেশ কমে যাওয়া এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতার কারণে পাঁচ শতাধিক শিল্পকারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। শিল্প পুলিশ ও উদ্যোক্তা সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, পরিস্থিতির উন্নতি না হলে আরও কয়েকশ কারখানা বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এরই মধ্যে শুধু তৈরি পোশাক খাতেই প্রায় দেড় লাখ শ্রমিক কর্মহীন হয়েছেন।

অর্থনীতিবিদদের মতে, এই সংকট দেশের বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও রপ্তানি আয়ের ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

শিল্প সংশ্লিষ্টরা জানান, গ্যাস ও বিদ্যুতের সরবরাহ স্বাভাবিক না থাকায় অধিকাংশ কারখানাই পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। উৎপাদন কমে যাওয়ায় অনেক প্রতিষ্ঠান লোকসানের মুখে পড়ে একপর্যায়ে কার্যক্রম বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছে। যেসব কারখানা এখনও চালু রয়েছে, তাদের বড় অংশই আংশিক উৎপাদন করছে।

শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার প্রভাব পড়েছে দেশের রপ্তানি বাণিজ্যেও। সদ্য সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আগের অর্থবছরের তুলনায় পণ্য রপ্তানি প্রায় এক শতাংশ কমেছে। একই সময়ে রপ্তানি আয় কমেছে ১ দশমিক ৬৪ শতাংশ। পাশাপাশি নতুন রপ্তানি আদেশও উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পেয়েছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদনে শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে মাত্র ২ দশমিক ৮৬ শতাংশে।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এত বিপুল সংখ্যক শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়া দেশের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক। গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বিপুলসংখ্যক শিল্পকারখানা বন্ধ থাকা এবং আরও বহু কারখানা বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে থাকা দেশের সার্বিক অর্থনীতির জন্য বড় ধরনের অভিঘাত। এতে বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হবে, কর্মসংস্থান কমবে এবং শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি আরও শ্লথ হয়ে পড়বে।

তিনি বলেন, সরকার প্রণোদনা তহবিল ঘোষণা করলেও অনেক কারখানা এখন এমন অবস্থায় পৌঁছেছে যে শুধু ঋণ দিয়ে তাদের পুনরায় সচল করা সম্ভব নয়। যেসব প্রতিষ্ঠান আর ঘুরে দাঁড়াতে পারবে না, তাদের জন্য সুনির্দিষ্ট প্রস্থান নীতি গ্রহণ করা প্রয়োজন। অন্যদিকে যেসব প্রতিষ্ঠান পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা রাখে, তাদের জন্য সহজ শর্তে পরিচালন মূলধন, নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং শ্রমিকদের সহায়তায় শিল্পাঞ্চলে ন্যায্যমূল্যের খাদ্য বিক্রয় কার্যক্রম সম্প্রসারণের পরামর্শ দেন তিনি।

দেড় লাখ শ্রমিকের কর্মসংস্থান হারানোর দাবি
শ্রমিক নেতাদের দাবি, প্রকৃতপক্ষে বন্ধ হওয়া কারখানার সংখ্যা সরকারি হিসাবের চেয়েও অনেক বেশি। ইন্ডাস্ট্রিঅল গ্লোবাল ইউনিয়নের বাংলাদেশ কাউন্সিলের সাধারণ সম্পাদক বাবুল আখতার বলেন, বড় কারখানা বন্ধ হলে তা নথিভুক্ত হলেও ছোট ও মাঝারি কারখানা বন্ধ হওয়ার অনেক ঘটনাই সরকারি হিসাবের বাইরে থেকে যায়।

তাঁর মতে, গত দুই বছরে শুধু তৈরি পোশাক খাতেই প্রায় দেড় লাখ শ্রমিক চাকরি হারিয়েছেন। অন্যান্য শিল্পখাতের হিসাব যুক্ত করলে কর্মহীন মানুষের সংখ্যা আরও অনেক বেশি হবে।

শ্রমিক ও উদ্যোক্তাদের মতে, গ্যাস-বিদ্যুতের সংকটই কারখানা বন্ধ হওয়ার প্রধান কারণ। এর পাশাপাশি ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা, নির্ধারিত সময়ে বিদেশে পণ্য পাঠাতে ব্যর্থ হওয়া এবং উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়াও অনেক প্রতিষ্ঠানের জন্য বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিও শিল্প খাতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্কনীতি, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা এবং বিশ্ববাজারে চাহিদা কমে যাওয়ায় বাংলাদেশের রপ্তানিনির্ভর শিল্পগুলো বড় ধরনের চাপের মুখে পড়েছে।

দুই বছরে বন্ধ ৪৫৭ কারখানা:

শিল্প পুলিশের তথ্য শিল্প পুলিশের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুন থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত দুই বছরে ৪৫৭টি শিল্পকারখানা বন্ধ হয়েছে। এর মধ্যে ১৭০টি বস্ত্র ও তৈরি পোশাক কারখানা এবং ২৮৭টি অন্যান্য শিল্পকারখানা।

বন্ধ হওয়া প্রতিষ্ঠানের মধ্যে তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারকদের সংগঠনের সদস্য ১০৮টি, নিট পোশাক প্রস্তুতকারকদের সংগঠনের সদস্য ৩৫টি, বস্ত্রকল মালিকদের সংগঠনের সদস্য ৮টি এবং রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকার ১৯টি কারখানা রয়েছে।
তবে উদ্যোক্তা সংগঠনগুলোর তথ্য বলছে, প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি। তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারকদের সংগঠনের তথ্য অনুযায়ী, গত দুই বছরে তাদের সদস্যভুক্ত ২২১টি কারখানা বন্ধ হয়েছে। এর মধ্যে ২০২৫ সালে বন্ধ হয়েছে ১৪১টি এবং ২০২৪ সালে ৭৭টি।

শিল্পাঞ্চলে ভয়াবহ গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট

গাজীপুর, সাভার, আশুলিয়া, চট্টগ্রাম ও নারায়ণগঞ্জের শিল্পাঞ্চলে বর্তমানে গ্যাস ও বিদ্যুতের তীব্র সংকট চলছে। উদ্যোক্তারা জানান, চাহিদার তুলনায় বিদ্যুৎ সরবরাহ প্রায় ৪০ শতাংশ কম হওয়ায় নিয়মিত লোডশেডিংয়ের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।
বিদ্যুৎ না থাকলে জেনারেটর চালিয়ে উৎপাদন চালু রাখতে হয়। কিন্তু গ্যাস ও ডিজেলের সংকট এবং জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে উৎপাদন ব্যয়ও ব্যাপকভাবে বেড়ে গেছে। অন্যদিকে নতুন গ্যাস সংযোগ বন্ধ থাকায় অনেক নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান উৎপাদন শুরুই করতে পারছে না।

চট্টগ্রাম ও নারায়ণগঞ্জের একাধিক ইস্পাত পুনঃগলন কারখানা এবং সিরামিক শিল্পেও গ্যাসের চাপ এতটাই কম যে চুল্লি স্বাভাবিকভাবে চালানো সম্ভব হচ্ছে না।
বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে আরও শত শত কারখানা
তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারকদের সংগঠনের সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, ইতোমধ্যে দুই শতাধিক কারখানা বন্ধ হলেও আরও দুই শতাধিক প্রতিষ্ঠান ঝুঁকিতে রয়েছে। এসব কারখানা বর্তমানে আংশিক উৎপাদন করছে। যে কোনো সময় সেগুলোও বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

তিনি বলেন, সরকারের প্রণোদনা তহবিল থেকে ঋণ সহায়তার জন্য আবেদন করা প্রায় ৪০০ কারখানার সক্ষমতা যাচাই করছে দুটি নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান। তাদের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে ঋণ সহায়তার সুপারিশ করা হবে।

তবে তাঁর মতে, শুধু ঋণ দিয়ে শিল্প খাতকে টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। তিনি বলেন, “শিল্পকে বাঁচাতে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ। এগুলোর নিশ্চয়তা না থাকলে কোনো প্রণোদনাই কার্যকর হবে না।”

এদিকে বস্ত্রকল মালিকদের সংগঠনের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সাল থেকে এখন পর্যন্ত তাদের সদস্যভুক্ত ২৩৪টি কারখানা বন্ধ হয়েছে। এর মধ্যে ১১৪টি সুতা উৎপাদনকারী কারখানা। পাশাপাশি আরও এক হাজার ১২১টি কারখানায় অর্ধেক সক্ষমতায় উৎপাদন চলছে। তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারকদের সংগঠনের হিসাবেও বর্তমানে এক হাজার ৩২১টি কারখানা আংশিকভাবে সচল রয়েছে।

আশুলিয়ার লিটিল স্টার স্পিনিং মিলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম খোরশেদ আলম জানান, তাঁর কারখানায় গ্যাসের চাপ থাকার কথা ১০ পাউন্ড প্রতি বর্গইঞ্চি হলেও অধিকাংশ সময় তা এক থেকে দুই পাউন্ডের বেশি থাকে না। ফলে মেশিন সচল রাখা সম্ভব হয় না এবং বাধ্য হয়ে মাত্র অর্ধেক সক্ষমতায় উৎপাদন চালাতে হচ্ছে।

রপ্তানি আদেশেও বড় ধস

রপ্তানি আদেশের চিত্রেও উদ্বেগজনক পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছে। পোশাক রপ্তানির জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামাল আমদানির অনুমোদনপত্রের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ ও জুন মাসে রপ্তানি আদেশের সংখ্যা এবং মূল্য উভয়ই আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।

বিশেষ করে জুন মাসে রপ্তানি আদেশের মূল্য ২২৭ কোটি ডলারের বেশি থেকে নেমে প্রায় ১৭৯ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে। এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে আগামী মাসগুলোতে উৎপাদন ও কর্মসংস্থানের ওপর আরও বড় চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

Single Sidebar Banner
  • সর্বশেষ
  • পঠিত