ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের বিস্তারের ফলে নতুন প্রজন্ম বই থেকে দূরে সরে যাচ্ছে—এমন উদ্বেগ প্রকাশ করে প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক সাদাত হোসাইন বলেছেন, পাঠক, লেখক ও প্রকাশকের মধ্যে সেতুবন্ধন রক্ষায় পাঠাভ্যাস ফিরিয়ে আনা এখন সময়ের দাবি।
তিনি বলেন, একসময় পত্রিকার সাহিত্য পাতা ছিল লেখকদের জন্য প্রধান প্ল্যাটফর্ম। নিয়মিত যাদের লেখা প্রকাশিত হতো, তারা পাঠকের কাছে গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করতেন। সেই জনপ্রিয়তার ভিত্তিতেই প্রকাশকরা তাদের বই প্রকাশে আগ্রহী হতেন।
বুধবার (১৫ এপ্রিল) বিকেলে নগরীর কাজীর দেউরী জেলা স্টেডিয়াম সংলগ্ন জিমনেসিয়াম মাঠের বই মেলা মঞ্চে স্বাধীনতার বই মেলার আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে ১৯ দিন ব্যাপি বই মেলার ১৬ তম দিনে “লেখক-পাঠক সেতুবন্ধন তৈরি করে একজন প্রকাশক” শীর্ষক এই আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়।
অনুষ্ঠানে সাদাত হোসাইন বলেন, আগে পত্রিকার সাহিত্য পাতায় একটি শক্তিশালী সম্পাদনা পরিষদ থাকতো, যারা ভালো লেখাগুলো বাছাই করতেন। ফলে মানসম্মত লেখাই পাঠকের কাছে পৌঁছাতো এবং লেখকদের একটি স্থায়ী পাঠকগোষ্ঠী তৈরি হতো।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে তিনি উল্লেখ করেন, এখন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম এতটাই শক্তিশালী যে লেখকরা সরাসরি পাঠকের কাছে পৌঁছে যেতে পারেন। অনেক ক্ষেত্রে প্রকাশকরা সোশ্যাল মিডিয়ায় জনপ্রিয়তা, যেমন লাইক বা পাঠকের সংখ্যা, দেখেই বই প্রকাশের সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন।
তবে এ প্রবণতার পেছনে একটি ‘ভয়ঙ্কর বাস্তবতা’ রয়েছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
তার ভাষায়, মানের সঙ্গে অনেক সময় আপস করতে হচ্ছে। কারণ অধিকাংশ প্রকাশকের পক্ষে আলাদা সম্পাদনা পরিষদ রাখা অর্থনৈতিকভাবে সম্ভব হয় না।
তিনি বলেন, পাঠাভ্যাস কমে যাওয়ার কারণে প্রকাশকরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। বাংলাদেশে লেখালেখিকে পেশা হিসেবে নেওয়া মানুষের সংখ্যা কম। কিন্তু প্রকাশকদের প্রধান জীবিকা হচ্ছে প্রকাশনা। পাঠক কমে গেলে প্রকাশক ক্ষতিগ্রস্ত হবেন, আর প্রকাশক ক্ষতিগ্রস্ত হলে লেখকরাও পিছিয়ে পড়বেন।
তিনি আরও বলেন, প্রকাশকরা লেখকের কল্পনার জগৎকে পাঠকের কাছে পৌঁছে দেন। এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সুন্দর একটি কাজ। কিন্তু এই কাজ করতে গিয়ে তারা নানা সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি হচ্ছেন।
পাঠাভ্যাস গড়ে তোলার ক্ষেত্রে অভিভাবকদের ভূমিকার ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, শিশুরা অনুকরণপ্রিয়। আপনি যদি নিজে বই না পড়ে সারাক্ষণ মোবাইল ফোনে ব্যস্ত থাকেন, তাহলে শিশুকে বই পড়তে বলা ফলপ্রসূ হবে না। আগে বড়দেরই বই পড়ার পরিবেশ তৈরি করতে হবে।
তিনি আহ্বান জানান, প্রতিটি পরিবারে বই পড়ার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। প্রত্যেক ঘরে যদি একটি করে পাঠাগার গড়ে ওঠে, তাহলে একটি জ্ঞানভিত্তিক প্রজন্ম তৈরি হবে। আর সেই প্রজন্মই দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবে।
শেষে তিনি উপস্থিত সবাইকে ঘরে ঘরে পাঠাগার গড়ে তোলার প্রতিজ্ঞা করার আহ্বান জানান।
অনুষ্ঠানে বেতার ও টেলিভিশনের শিল্পী মুন্না ফারুক ও শেলী দে গান পরিবেশন করেন এবং চসিকের মিউনিসিপ্যাল মডেল উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ, সালেহ জহুর উচ্চ বিদ্যালয়, বাগমনিরাম বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় এবং ফতেয়াবাদ শৈলবালা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশ নেন।
চট্টগ্রাম সৃজনশীল প্রকাশক পরিষদের সভাপতি সাহাব উদ্দিন হাসান বাবুর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় প্রধান আলোচক ছিলেন সাংবাদিক ও কথাসাহিত্যিক কবি বিশ্বজিৎ চৌধুরী, বিশেষ আলোচক ছিলেন কবিতায় গল্প বলা মানুষ কবি সালমান হাবীব, স্বাগত বক্তব্য রাখেন চট্টগ্রাম সৃজনশীল প্রকাশক পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ সোহেল রানা। অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন টিভি ও বেতারের উপস্থাপিকা নাহিদা নাজু।


