মঙ্গলবার, ১২ মে ২০২৬
Single Top Banner

২২ মাসে রাউজানে ২৩ খুন, নগরীতেও ছড়িয়ে পড়ছে সন্ত্রাসের রেশ

রাউজানের নাসির হত্যার ‘বদলা’ নিতে নগরীতে রাজু খুন

সাকিব উদ্দিন :

চট্টগ্রামের রাউজানে যুবদলকর্মী নাসির উদ্দিন হত্যাকাণ্ডের প্রতিশোধ নিতেই নগরীতে মোহাম্মদ হাসান ওরফে রাজুকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে বলে ধারণা করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। নগরের বায়েজিদ বোস্তামী থানার রৌফাবাদ এলাকার শহীদ মিনার কলোনিতে বৃহস্পতিবার রাত ১০টার দিকে ঘটে এই চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ড। এ সময় সন্ত্রাসীদের ছোড়া গুলিতে রেশমি আক্তার (১২) নামে এক শিশুও গুরুতর আহত হয়। তাকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

নিহত রাজুর বাড়ি রাউজান উপজেলার কদলপুর ইউনিয়নের দক্ষিণ শমসেরপাড়া এলাকায়। তার বাবার নাম আবুল কালাম। রাজু নগরীতে তার বোনের বাসায় বেড়াতে এসেছিলেন। খুব কাছ থেকে তাকে লক্ষ্য করে গুলি করা হয় বলে জানিয়েছে পুলিশ। শুক্রবার বিকেল পর্যন্ত এ ঘটনায় কোনো মামলা হয়নি। তবে নিহতের পরিবার মামলা প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে জানা গেছে।

তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, ঘটনাটি ছিল পূর্বপরিকল্পিত। হামলাকারীরা রাজুর গতিবিধি আগে থেকেই অনুসরণ করছিল। সুযোগ বুঝে তাকে বাসা থেকে ডেকে বের করে এনে গুলি করা হয়। পুলিশের ধারণা, সম্প্রতি রাউজানে সংঘটিত যুবদলকর্মী নাসির হত্যাকাণ্ডের জের ধরেই এ হত্যার ঘটনা ঘটেছে।

জানা গেছে, গত ২৬ এপ্রিল রাউজানে যুবদলকর্মী নাসির উদ্দিনকে গুলি করে হত্যা করা হয়। ওই ঘটনায় দায়ের করা মামলার এজাহারভুক্ত আসামিদের একজন ছিলেন রাজু। প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত দিয়ে নিহত নাসিরের ভাই-বোন দাবি করেছিলেন, নাসিরকে ঘিরে ধরে যারা গুলি চালিয়েছিল তাদের মধ্যে রাজুও ছিলেন। নাসির ছিলেন রাউজানে বিএনপির সংসদ সদস্য গিয়াসউদ্দিন কাদের চৌধুরীর অনুসারী।

এক মিনিটেই শেষ হয়ে যায় সব : 

স্থানীয় সূত্র জানায়, বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে রাজু বোনের বাসায় রাতের খাবার খেয়ে আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে আড্ডা দিচ্ছিলেন। এ সময় তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনে একটি কল আসে। ফোন পাওয়ার পর তিনি বাসা থেকে বের হয়ে গলির মুখে যান। ঠিক তখনই মুখোশধারী ৩ থেকে ৪ যুবক তাকে লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি গুলি ছোড়ে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, প্রথম গুলির পর রাজু প্রাণ বাঁচাতে দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু হামলাকারীরা তাকে ধাওয়া করে কাছ থেকে গুলি চালাতে থাকে। মুহূর্তের মধ্যে তার শরীর ঝাঁঝরা হয়ে যায়। ঘটনাস্থলেই লুটিয়ে পড়েন তিনি।

এ সময় সেখানে থাকা রেশমি আক্তার নামে এক শিশু গুলিবিদ্ধ হয়। স্থানীয়রা দ্রুত তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যান। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, তার অবস্থা সংকটাপন্ন।

ঘটনার পর পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, প্রথমে তারা শব্দটিকে আতশবাজি কিংবা বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিটের শব্দ মনে করেছিলেন। পরে বাইরে এসে রক্তাক্ত অবস্থায় রাজু ও গুলিবিদ্ধ শিশুটিকে পড়ে থাকতে দেখেন।

সিসি ক্যামেরায় ধরা পড়ে হামলার দৃশ্য : 

রৌফাবাদ এলাকার শহীদ মিনার কলোনির একটি সিসি ক্যামেরার ফুটেজে হামলার আংশিক দৃশ্য ধরা পড়েছে। ফুটেজে দেখা যায়, রাতের অন্ধকারে কয়েকজন যুবক দৌড়ে এসে গুলি ছুড়ছে। মাত্র ৬ সেকেন্ডের মধ্যে চার রাউন্ড গুলির শব্দ শোনা যায়। পরে হামলাকারীরা দ্রুত এলাকা ত্যাগ করে।

শুক্রবার দুপুরে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, পুরো এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। স্থানীয় বাসিন্দারা আতঙ্কে অপরিচিত কারও সঙ্গে কথা বলতে অনাগ্রহ দেখান। ঘটনাস্থলে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। গুলি চালানোর স্থানে শুকিয়ে যাওয়া রক্তের দাগ তখনও স্পষ্ট ছিল।

‘রাজু কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে জড়িত ছিল না’
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে নিহতের যমজ ভাই মোহাম্মদ হোসেন সাজু সাংবাদিকদের বলেন, “আমার ভাই কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত ছিল না। সে শহরে দিনমজুরের কাজ করত। তার কোনো শত্রুও ছিল না। নাসির হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে রাজুর কোনো সম্পৃক্ততা নেই।”

তিনি বলেন, “আমার ভাইকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। আমরা এ ঘটনায় মামলা করব।”
ময়নাতদন্ত শেষে শুক্রবার বিকেলে রাজুর মরদেহ রাউজানে নিয়ে যাওয়া হয়।

তদন্তে পুলিশ, ডিবি ও র‌্যাব : 

ঘটনার পরপরই বায়েজিদ বোস্তামী থানা পুলিশ, নগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) ও র‌্যাবের গোয়েন্দা ইউনিট যৌথভাবে তদন্ত শুরু করেছে। তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ঘটনাস্থল ও আশপাশের একাধিক সিসি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়েছে। হামলাকারীদের শনাক্তে ফুটেজ বিশ্লেষণ চলছে।

সিএমপির উত্তর বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) আমিরুল ইসলাম বলেন, “রাউজান উপজেলার অপরাধের রেশ এখন মহানগর এলাকাতেও ছড়িয়ে পড়ছে। আমরা ঘটনাটিকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করছি। সন্ত্রাসীদের আইনের আওতায় আনতে একাধিক টিম কাজ করছে। তবে এখনো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি।”

রাউজানে বাড়ছে রাজনৈতিক সহিংসতা : 

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর রাউজানে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ও রাজনৈতিক সহিংসতা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যায়। গত ২২ মাসে উপজেলাটিতে অন্তত ২৩টি হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। এর মধ্যে ১৬টিই রাজনৈতিক বিরোধ ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে ঘটেছে।

তদন্ত কর্মকর্তাদের মতে, রাজু হত্যাকাণ্ডও সেই ধারাবাহিকতার অংশ। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে টার্গেট করে একের পর এক হত্যাকাণ্ড এখন রাউজান ছাড়িয়ে নগরীতেও ছড়িয়ে পড়ছে, যা নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে সাধারণ মানুষের মধ্যে।

Single Sidebar Banner
  • সর্বশেষ
  • পঠিত