উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান ও মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, সাবেক মন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগের বর্ষীয়ান নেতা তোফায়েল আহমেদ আর নেই (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। সোমবার (১ জুন) বিকাল সাড়ে ৩টায় রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও পরিবারের সদস্যরা তার মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮২ বছর।
দীর্ঘদিন ধরে প্যারালাইসিসসহ নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন এই প্রবীণ রাজনীতিক। গত বছরের ২৮ সেপ্টেম্বর গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এরপর থেকে তিনি লাইফ সাপোর্টে ছিলেন। এর আগে গত বছরের ২০ নভেম্বর তার স্ত্রী আনোয়ারা আহমেদ মারা যান।
১৯৪৩ সালের ২২ অক্টোবর ভোলা সদর উপজেলার দক্ষিণ দিঘলদী ইউনিয়নের কোড়ালিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তোফায়েল আহমেদ। তার বাবা মৌলভী আজহার আলী এবং মা ফাতেমা বেগম। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি স্ত্রী আনোয়ারা বেগম ও একমাত্র কন্যা ডা. তাসলিমা আহমেদ জামান মুন্নীকে রেখে গেছেন।
শিক্ষাজীবনে ১৯৬০ সালে ভোলা সরকারি হাই স্কুল থেকে মাধ্যমিক এবং ১৯৬২ সালে বরিশাল ব্রজমোহন কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন। ১৯৬৪ সালে বিএসসি সম্পন্ন করার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মৃত্তিকাবিজ্ঞানে এমএসসি ডিগ্রি অর্জন করেন।
ছাত্রলীগের রাজনীতির মাধ্যমে তার রাজনৈতিক জীবনের সূচনা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে ১৯৬৬-৬৭ মেয়াদে ইকবাল হলের (বর্তমান শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল) নির্বাচিত ভিপি ছিলেন। পরে ১৯৬৮-৬৯ সালের গণজাগরণ ও ছাত্র আন্দোলনে ডাকসুর ভিপি হিসেবে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়কের দায়িত্ব পালন করেন।
ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনকারী তোফায়েল আহমেদই ১৯৬৯ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) আয়োজিত জনসভায় শেখ মুজিবুর রহমান-কে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করার ঘোষণা দেন।
১৯৭০ সালে প্রথমবারের মতো আওয়ামী লীগের মনোনয়নে জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি মুজিব বাহিনীর অঞ্চলভিত্তিক চার প্রধানের একজন হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের ১৪ জানুয়ারি প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায় বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক সচিব হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি নয়বার জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৭৩, ১৯৮৬, ১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০৮, ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোলা থেকে বিজয়ী হন। তিনি আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য হিসেবেও দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনা সরকারের শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে ২০১৩ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত দুই মেয়াদে বাণিজ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।
রাজনৈতিক জীবনে নানা সময়ে কারাবরণও করতে হয়েছে তাকে। ১৯৭৫ সালের পর রাজনৈতিক কারণে টানা ৩৩ মাসসহ অসংখ্যবার কারাভোগ করেন এই প্রবীণ নেতা।
বাংলাদেশের রাজনীতি, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস এবং আওয়ামী লীগের দীর্ঘ পথচলার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকা তোফায়েল আহমেদের মৃত্যুতে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।


