সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের আমানতকারীদের ওপর আরোপিত হেয়ারকাট সিদ্ধান্তকে ‘চরম অন্যায়’ আখ্যা দিয়ে অবিলম্বে তা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী আমানতকারীরা। একইসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের পক্ষ থেকে আমানতকারীদের ‘দুষ্কৃতিকারী’ হিসেবে আখ্যায়িত করার মন্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে তারা বলেন, এ ধরনের অপমানজনক বক্তব্য ব্যাংকিং খাতে চরম আস্থার সংকট সৃষ্টি করবে।
বাংলাদেশ ভুক্তভোগী ব্যাংক আমানতকারী অ্যাসোসিয়েশনের উদ্যোগে রবিবার চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন বক্তারা।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিনিধি জাহাঙ্গীর হোসেন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন মোহাম্মদ আবুল কালাম আজাদ, মোহাম্মদ আজম, খালেদ মোশাররফ, নওশিন জাহান, তানভীর আহমেদ চৌধুরীসহ অর্ধশতাধিক ভুক্তভোগী আমানতকারী।
লিখিত বক্তব্যে জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, গত ২১ জানুয়ারি ২০২৬ বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক জারি করা প্রজ্ঞাপনটি আমানতকারীদের সঙ্গে ব্যাংকের লিখিত ও অলিখিত চুক্তির সরাসরি লঙ্ঘন। ২০২৪ ও ২০২৫ সালের আমানতের বিপরীতে মাত্র ৪ শতাংশ মুনাফা দেওয়ার সিদ্ধান্ত পশ্চাৎমুখী এবং অধিকার হরণকারী। তিনি বলেন, ব্যাংকিং ব্যবস্থার মূল ভিত্তি হলো বিশ্বাস—এই সিদ্ধান্ত সেই বিশ্বাসকে ধ্বংস করছে।
বক্তারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, হেয়ারকাট সিদ্ধান্ত শুধু সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; এটি পুরো ব্যাংকিং খাতের জন্য বিপজ্জনক নজির তৈরি করবে। আজ একটি ব্যাংকে হলে, আগামীকাল অন্য ব্যাংকেও একই সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া হতে পারে—যা ব্যাংকিং ব্যবস্থা ধসের দিকে ঠেলে দেবে বলে তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
শরিয়াহ মানদণ্ড (শরিয়াহ স্ট্যান্ডার্ড নং–১৩, মুদারাবাহ ৪/৪) উদ্ধৃত করে বক্তারা বলেন, ব্যাংকের অবহেলা, অসতর্কতা কিংবা দুর্নীতির কারণে লোকসান হলে তার দায় আমানতকারীদের ওপর চাপানো যায় না। এটি সম্পূর্ণভাবে প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব। হেয়ারকাট আরোপ শরিয়াহবিরোধী এবং আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং নীতিমালারও পরিপন্থী বলে তারা উল্লেখ করেন।
সংবাদ সম্মেলনে ভুক্তভোগী আমানতকারীদের জীবনযাত্রার করুণ চিত্র তুলে ধরা হয়। বক্তারা বলেন, শারীরিক ও মানসিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, অবসরপ্রাপ্ত মানুষ, প্রবাসী পরিবার, স্বামীর পেনশননির্ভর নারী এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা এই মুনাফার ওপর নির্ভর করে জীবনযাপন করেন। হঠাৎ দুই বছরের আয় কেটে নেওয়া তাদের জন্য চরম বিপর্যয় ডেকে এনেছে।
এ সময় নওশিন জাহান বলেন, অনেকেই হজের টাকা, সন্তানদের বিয়ের সঞ্চয় কিংবা অবসর জীবনের নিরাপত্তা হারিয়েছেন। এতে পরিবারে অশান্তি ও মানসিক চাপ বেড়েছে।
গভর্নরের মন্তব্যের তীব্র সমালোচনা করে বক্তারা বলেন, জুলাই আন্দোলনের পর অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের আশ্বাস দেওয়া হলেও এখন লুটপাটের দায় আমানতকারীদের ওপর চাপিয়ে ‘দুষ্কৃতিকারী’ তকমা দেওয়া হচ্ছে—যা সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য ও অপমানজনক।
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের প্রায় ৬৭ লাখ গ্রাহক ও তাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রায় তিন কোটি ভোটারের কথা স্মরণ করিয়ে বক্তারা বলেন, আমানতকারীদের চোখের পানি রেখে কোনো গণতান্ত্রিক উৎসব হতে পারে না।
সংবাদ সম্মেলন থেকে ২০২৪ ও ২০২৫ সালের মুনাফা চুক্তি অনুযায়ী পরিশোধ, হেয়ারকাট সিদ্ধান্ত বাতিল এবং সঞ্চয় হিসাব, চলতি হিসাব, এফডিআর, ডিপিএস ও মেয়াদি আমানতসহ সব ধরনের হিসাবের অর্থ মুনাফাসহ দ্রুত ফেরত দেওয়ার দাবি জানানো হয়।
দাবি মানা না হলে সারা দেশের প্রতিটি শাখায় ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি পালনের হুঁশিয়ারিও দেন ভুক্তভোগী আমানতকারীরা।


