বৃহস্পতিবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৬
Single Top Banner

কাওয়ালির জনক ও তবলার আবিষ্কারক কবি আমির খসরু

: মোয়াজ্জেম হোসেন :

শাবানে হিজরা দারায চুঁ যুলফ/ ওয়া রোযে ওয়াসালাত চু উম্রো কোতাহ্/ সখি পিয়া কো জো ম্যায় না দেখুঁ/ তো ক্যায়সে কাটুঁ আন্ধেরি রাতিয়া।-কবি আমির খসরু।

অর্থাৎ বিরহ রাত তোমার কেশের মতো দীর্ঘ/ মিলন দিন জীবনের মতো ছোট/ সখি, যদি প্রিয়কে না দেখি/ কী করে কাটাই এই অন্ধকার রাত।

কাওয়ালির রচয়িতা আধ্যাত্মিক সাধক সংগীত সম্রাট আমির খসরু ছিলেন ভারত বিখ্যাত অলি ও দরবেশ হযরত নিজামুদ্দিন আউলিয়ার অন্যতম শিষ্য।

আমির খসরুর জন্ম বর্তমান ভারতে অবস্থিত উত্তর প্রদেশের ইহাত জেলার পাতিয়ালা গ্রামে। তাঁর জন্মতারিখ সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য জানা যায় না, তবে ১২৫৩-৫৪ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে তাঁর জন্ম হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। তার মূল নাম ছিল আবুল হাসান ইয়ামিন আল-দিন মাহমুদ। বাবা আমির সাইফুদ্দিন মাহমুদ ছিলেন মধ্য এশিয়ার ‘লা চীনা হাজারা গোত্রীয় ও তুর্কি বংশোদ্ভূত’। মঙ্গোলদের আক্রমণের সময় তাঁর বাবা ভারতে চলে আসেন এবং মামলুক রাজবংশের সুলতান শামসুদ্দিন ইলতুতমিশের অধীনে পাতিয়ালা রাজ্যে জায়গিরদারি লাভ করেন।

আমির খসরুকে সেতার ও তবলা বাদ্যযন্ত্রের আবিষ্কারক বলা হয়। তিনি ভারতীয়, ইরানী ও আরবি সঙ্গীতের মধ্যে এমনভাবে সমন্বয় করেছেন যে, তা গানের জগতে উত্তর ভারতীয় উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত হিসেবে খ্যাতি পায়। তাঁর হাত ধরেই ভারতীয় উপমহাদেশে গজল সঙ্গীত ও কাব্যের প্রচার-প্রসার শুরু হয়।
কাওয়ালি সঙ্গীত আমির খসরুর নিজের উদ্ভাবিত সঙ্গীত ধারা। ফলে তাকে ‘কাওয়ালির জনক’ বলা হয়। ভারতীয় উপমহাদেশে কাওয়ালি এখনও অত্যন্ত জনপ্রিয় উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত।

কাওয়ালি, আমির খসরু উদ্ভাবিত একটি সংগীত ধারা। শব্দটি এসেছে আরবি ‘কাওল’ বা ‘কাওলুন’ শব্দ থেকে। যার অর্থ কথা, বাক্য। বহুবচনে শব্দটি ‘কাওয়ালি’। হযরত নিজামউদ্দিন আওলিয়ার দরবারে আমির খসরু কাওয়ালি গাইতেন। এটি সহজ, বোধগম্য ও জনপ্রিয়।

‘তারানা’ সংগীত ধারা আমির খসরুর নিজস্ব আবিস্কার। এটি হলো একপ্রকার শ্রুতিমধুর এবং দ্রুতগতির উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত। এছাড়া সেতার ও তবলা বাদ্যযন্ত্রের আবিষ্কারক খসরু (যদিও এটি বিতর্কিত)। অসাধারণ গান ও কবিতার জন্য তাঁকে ‘ভারতের কণ্ঠস্বর’ বা ‘ভারতের তোতা’ (তুতি-ই-হিন্দ) বলা হয়।
আমির খসরুর লিখিত কয়েকটি গান পরিবেশন করেন উপমহাদেশের কিংবদন্তি কাওয়ালি গায়ক নুসরাত ফাতেহ আলি খান। যা বর্তমানেও আমির খসরুর কাওয়ালি সমান জনপ্রিয়তার শীর্ষে রেখেছে।

‘খেয়াল’ ভারতীয় উপমহাদেশে এখনও বেশ জনপ্রিয় ও পরিচিত সঙ্গীতের একটি ধারা। খেয়ালের পূর্বে ভারতে পরিচিত সঙ্গীত ধারা ছিল ‘ধ্রুপদ’। আমির খসরুর অন্যতম অবদান হলো, তিনি এই মুসলিম সঙ্গীত ধারাকে উপমহাদেশীয় সঙ্গীত অন্তর্ভুক্ত করতে পেরেছেন। পারস্য সংগীতের ‘পরদা’ এবং ভারতীয় ‘রাগ’ সম্পর্কে আমির খসরুর গভীর জ্ঞান ছিল। ভারতীয় এবং পারস্য সংগীতের মিলনে সংগীতে একটি নতুন ধারার সৃষ্টি করেন তিনি। ভারতে পরিচিত সঙ্গীত ধারা ধ্রুপদ, যা একেবারেই শাস্রবদ্ধ। প্রচলিত এই ধারার বাইরে গিয়ে কিছু করা তৎকালীন পণ্ডিতরা মোটেও পছন্দ করতেন না। উত্তর ভারতের জনমানুষের লোকগীতির সাথে ধ্রুপদ মিলিয়ে সঙ্গীতের একটি নতুন ধারার জন্ম দেন আমির খসরু, যার নাম খেয়াল।

কয়েক গবেষকের মতে প্রথম উর্দু লেখক হলেন মাসুদ, মাসুদের পুরো নাম শেখ ফরিদউদ্দিন মাসুদ (১১৭৩-১২৬৫)। তবে তিনি পরিচিত ছিলেন বাবা শেখ ফরিদ বা ফরিদ শকরগঞ্জ নামে। তিনি মূলত একজন সুফি সাধক। আসলে তিনি লিখতেন মুলতানি পাঞ্জাবিতে। প্রাচীন পাঞ্জাবি সাহিত্যের তিনিই অবিসংবাদিত প্রথম লেখক।

শেখ ফরিদের শিষ্য নিজামউদ্দিন আউলিয়া। নিজামউদ্দিন আউলিয়ার শিষ্য হলেন আমির খসরু, প্রাথমিক উর্দু সাহিত্যে যাঁর অবদান কেউই অস্বীকার করতে পারেন না। খসরু লিখতেন মূলত ফারসি ভাষাতেই। তখনও উর্দু পূর্ণাঙ্গ ভাষা হয়ে ওঠেনি। ভাষা হিসেবে উর্দুকে প্রথম সনাক্ত করতে পেরেছিলেন আমির খসরু। উর্দু ভাষা সাহিত্যের ভাষা হয়ে উঠতে বেশ সময় লেগেছে। উর্দু হলো সেই মুখের ভাষা, যা পরবর্তীকালে আমির খসরু ও আরো কয়েকজনের হাত ধরে সাহিত্যের ভাষা হয়ে ওঠে। উর্দু ভাষার প্রথম কবিদের একজন আমির খসরু। ভাষা হিসেবে উর্দুর বয়স খুব বেশি নয়।

ত্রয়োদশ শতাব্দীতে আমির খসরু সাহিত্যকর্মে সর্বপ্রথম ভাষাটি ব্যবহার করেন। তখন এর নাম ছিল ‘হিন্দভী’, মানে হিন্দুস্থানের ভাষা। আজ যাকে আমরা উর্দু নামে চিনি। বহুকাল আগে এটি হিন্দভী, দেহলভী, লস্করী, গুজরি, দকনি এবং রেখতা নামে পরিচিত ছিলো।

মাত্র ৮ বছর বয়সে তিনি কাব্যচর্চা শুরু করেন। ১৬ বছর বয়সে তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘তুহফাতুস সিগার’ প্রকাশিত হয়। এমন এক পরিবেশে তিনি বেড়ে উঠেছিলেন, যাতে শৈশব থেকেই তাঁর মধ্যে দুটি সংস্কৃতির সংযোগ ঘটেছিলো।

যে সময়কালে আমির খসরুর বেড়ে ওঠা তখন দিল্লি সালতানাতের বয়স পঁচাত্তরে পৌঁছে গেছে। শান-শওকত ও বিশালতা এমন পর্যায়ে যে, একে দ্বিতীয় বাগদাদ বলে গন্য করা হতো।

মঙ্গোলীয়দের ধ্বংসজ্ঞের কারণে বহুসংখ্যক কবি, আমির, পণ্ডিত, আলেম, রাজনীতিক মধ্য এশিয়া ছেড়ে ভারতবর্ষের দিল্লিতে এসে আশ্রয় নেয়। দিল্লির সব রঙই অবলোকন করেছেন খসরু।

আমির খসরু তাঁর কালে দিল্লির শাসক হিসেবে এগারো জনকে পেয়েছেন। দিল্লি সালতানাতের সাত শাসকের রাজদরবারের সাথে যুক্ত ছিলেন সংগীতজ্ঞ ও কবি হিসেবে। দিল্লির অন্যতম পরাক্রমশালী সুলতান আলাউদ্দিন খিলজির সভা কবি এবং দরবারের প্রধান সংগীতজ্ঞ হিসেবে কাজ করেছেন আমির খসরু।
আমির খসরু একাধারে একজন ফারসি কবি, সঙ্গীতজ্ঞ, ইতিহাসবিদ, লোক-সংস্কৃতি উপাদান সংগ্রাহক। ভারতের আদি অনথ্রোপলজিস্ট বা নৃতাত্বিকদের একজন তিনি। ভারতীয় জাতীয়তাবাদের অন্যতম উদগাতা ভাবা হয় তাঁকে।

ফারসি কাব্যে আমির খসরুকে হাফিজ সিরাজির সমান হিসেবে গণ্য করা হয়। মসনবী, কাসিদা, গজল, রূবাই প্রত্যেক ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন সিদ্ধহস্ত। সবমিলিয়ে প্রায় তিন লক্ষ পঙক্তি লিখে গেছেন। লিখেছেন পাহালিস (ধাঁ ধাঁ, হেয়ালি) ও দোহা, যা আধুনিক কালেও এসে পৌঁছেছে।

আমির খসরু পারসিয়ান সাহিত্যের একজন শ্রেষ্ঠ কবি হিসেবে খ্যাত। তাঁর রচিত গ্রন্থের সংখ্যা প্রায় ৯২টি, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো: খামসা-ই-খসরু (নেজামী গঞ্জাভীর অনুসরণে রচিত পাঁচটি মহাকাব্য), নুহ সিপাহর ও দেওয়ান-ই-ঘাযাল।

আমির খসরুর জীবন ছিল পরহেজগারি, তাওয়াক্কুল এবং আল্লাহভীতির প্রতিচ্ছবি। তিনি আধ্যাত্মিক সংগীতের মাধ্যমে অসংখ্য মানুষকে ইসলামের পথে আহ্বান করেছেন। তাঁর কবিতা ও গান শুধু হৃদয় জয় করেনি, বরং বহু হৃদয়কে হেদায়াতের আলোয় উদ্ভাসিত করেছে।

হযরত আমির খসরু (রহ.) ছিলেন এক অনন্য প্রতিভার অধিকারী, যিনি সুফিবাদ, সাহিত্য, সংগীত এবং সংস্কৃতির এমন এক মেলবন্ধন তৈরি করেন যা আজও উপমহাদেশের মুসলমানদের অন্তরে গাঁথা। তিনি ছিলেন সত্যিকার অর্থে ‘তরজুমান-ই-হিন্দ’—ভারতের ভাষা ও সংস্কৃতির অনুবাদক। তাঁর অবদান যুগযুগ ধরে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণীয় থাকবে।

১৩২৫ খ্রিষ্টাব্দে হযরত নিজামুদ্দিন আউলিয়া (রহ.)-এর ওফাতের কিছুদিন পর আমির খসরুও ইন্তেকাল করেন। তাঁকে দিল্লির হযরত নিজামুদ্দিন আউলিয়ার দরগার পাশেই দাফন করা হয়।

মোয়াজ্জেম হোসেন, প্রাবন্ধিক ও গবেষক।
moazzamhossain74@gmail.com

Single Sidebar Banner
  • সর্বশেষ
  • পঠিত