চট্টগ্রাম বন্দরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কনটেইনার টার্মিনাল নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) বিদেশি অপারেটরের কাছে ইজারা দেওয়ার প্রক্রিয়া নিয়ে আবারও তৎপরতা শুরু হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ দিকে স্থগিত হয়ে যাওয়া এ উদ্যোগকে সামনে এগিয়ে নিতে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় ও চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ নতুন করে কার্যক্রম শুরু করেছে। তবে বিষয়টি ঘিরে শ্রমিক মহলে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার একদিনেই চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষকে দুটি পৃথক চিঠি পাঠিয়েছে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়। সকালে পাঠানো এক চিঠিতে দুবাইভিত্তিক আন্তর্জাতিক বন্দর পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে এনসিটি ইজারা প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন অথবা বাতিল করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা বলা হয়। তবে একই দিন বিকেলে পাঠানো আরেকটি চিঠিতে ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চলমান আলোচনা ও দর-কষাকষি অব্যাহত রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়।
চিঠি চালাচালির পরদিন শুক্রবার, সাপ্তাহিক ছুটির দিনেও এনসিটি ইজারা প্রক্রিয়ার অগ্রগতি নিশ্চিত করতে সাত সদস্যের একটি মূল্যায়ন কমিটি গঠনের উদ্যোগ নেয় চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। দর-কষাকষি কার্যক্রম পরিচালনার জন্য এ কমিটি গঠনের অনুমোদন চেয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে।
বিষয়টি নিয়ে বন্দর কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তারা সরাসরি মন্তব্য করতে না চাইলেও নৌপরিবহন সচিব মো. জাকারিয়া জানিয়েছেন, প্রথম চিঠিটি পাঠানো হয়েছিল সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব (পিপিপি) কর্তৃপক্ষের একটি চিঠির প্রেক্ষিতে। বন্দর কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে দিকনির্দেশনা চাইলে পরবর্তীতে দ্বিতীয় চিঠি পাঠিয়ে ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়। বর্তমানে এ বিষয়ে নতুন কোনো সিদ্ধান্ত বা উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি বলেও জানান তিনি।
ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে আলোচনা চলমান থাকলেও ২০২৪ সালের ৭ জুলাই থেকে এনসিটির পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয় বাংলাদেশ নৌবাহিনী পরিচালিত প্রতিষ্ঠান চিটাগং ড্রাই ডক লিমিটেড (সিডিডিএল)-কে। দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই টার্মিনালটির কার্যক্রমে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখা গেছে। সর্বশেষ চলতি বছরের মে মাসে ১ লাখ ২৬ হাজার একক কনটেইনার হ্যান্ডলিং করে আগের সব রেকর্ড ভেঙেছে সিডিডিএল। এর আগে দেশীয় বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সাইফ পাওয়ারটেক টার্মিনালটি পরিচালনা করেছিল।
এনসিটি দীর্ঘমেয়াদে ডিপি ওয়ার্ল্ডের কাছে ইজারা দেওয়ার উদ্যোগ প্রথম নেওয়া হয়েছিল আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব (পিপিপি) এবং সরকার-টু-সরকার (জি-টু-জি) কাঠামোর আওতায় এ বিষয়ে আলোচনা শুরু হয়। পরবর্তীতে অন্তর্বর্তী সরকারও এ প্রক্রিয়া এগিয়ে নেয়। তবে শ্রমিকদের তীব্র আপত্তি ও আন্দোলনের মুখে গত ৯ ফেব্রুয়ারি এনসিটি ইজারা প্রক্রিয়া স্থগিত ঘোষণা করা হয়।
বর্তমান সরকার আবারও সেই প্রক্রিয়াকে সামনে এগিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। তবে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে এনসিটির পরিচালনা দায়িত্ব হস্তান্তরের সম্ভাবনায় শ্রমিক নেতারা এখনো তাদের আগের অবস্থানে অনড় রয়েছেন। তাদের দাবি, দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই কনটেইনার টার্মিনাল বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে ইজারা দেওয়া হলে জাতীয় স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
শ্রমিক নেতারা ইতোমধ্যে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, বিদেশি কোনো প্রতিষ্ঠানকে এনসিটির দায়িত্ব দেওয়া হলে তারা আবারও আন্দোলনে নামবেন। ফলে দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই টার্মিনালকে ঘিরে একদিকে যেমন সরকার ও আন্তর্জাতিক অপারেটরের মধ্যে আলোচনা চলছে, অন্যদিকে শ্রমিক অসন্তোষের বিষয়টিও নতুন করে সামনে চলে এসেছে। এখন সরকারের পরবর্তী সিদ্ধান্তের দিকেই তাকিয়ে রয়েছে বন্দরসংশ্লিষ্ট সব মহল।


