রবিবার, ২৪ মে ২০২৬
Single Top Banner

ভোটকেন্দ্র দখলকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ

সাতকানিয়ায় স্কুলছাত্র তাসিফ হত্যায় জড়িতরা তিন বছরেও গ্রেফতার হয়নি

নিজস্ব প্রতিবেদক :

চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলায় ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে ভোটকেন্দ্র দখলকে কেন্দ্র করে নিহত স্কুলছাত্র মো. ইয়াছিন ওরফে তাসিফ (১৩) হত্যার তিন বছর পার হলেও বিচারপ্রক্রিয়ায় তেমন অগ্রগতি নেই। অধিকাংশ আসামি আজও ধরাছোঁয়ার বাইরে। ২০২২ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি নলুয়া ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের ইউনিয়ন পরিষদ ভবন কেন্দ্রের পাশে এ হত্যাকাণ্ড ঘটে। এ সময় সন্ত্রাসীরা প্রকাশ্যে ধারালো অস্ত্র নিয়ে ভোটকেন্দ্র দখলের চেষ্টা চালালে নিরীহ স্কুল ছাত্র তাসিফকে নির্মমভাবে কুপিয়ে হত্যা করা হয়।

তাসিফ স্থানীয় মরফলা আর.এন.এম উচ্চ বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির ছাত্র ছিলেন। স্থানীয় রিকশাচালক মো. জসিম উদ্দিনের একমাত্র সন্তান তিনি। পড়াশোনার পাশাপাশি ধর্মীয় শিক্ষায়ও ছিল তার গভীর আগ্রহ ছিল। পরিবারের দাবি, ২০২১ সালের ডিসেম্বরে তিনি পবিত্র আল-কোরআন হেফজ শেষ করেছিলেন। মাত্র ১৩ বছর বয়সেই তাসিফ পরিবার ও শিক্ষকদের প্রত্যাশার প্রতীক হয়ে উঠেছিল। কিন্তু আওয়ামী লীগের ভোটকেন্দ্র দখলের হিংস্র রাজনীতির বলি হয়ে অকালেই প্রাণ হারাতে হয় তাকে।

ঘটনার দিন সকাল থেকেই নলুয়া ইউনিয়নে উত্তেজনা বিরাজ করছিল। ভোর থেকে বিভিন্ন কেন্দ্রে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের সমর্থকদের মধ্যে দফায় দফায় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া চলে। বেলা বাড়ার সাথে সাথে ৮ নম্বর ওয়ার্ডে ইউনিয়ন পরিষদ ভবন কেন্দ্রের আশপাশে শতাধিক অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী অবস্থান নেয়। তাদের হাতে ছিল কিরিচ, ছোরা, হকিস্টিক, ক্রিকেট স্ট্যাম্পসহ দেশীয় অস্ত্র। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে তারা ‘খেলা হবে, খেলা হবে’ স্লোগান দিয়ে কেন্দ্র দখলের চেষ্টা চালায়।

আতঙ্কে ভোটাররা পালাতে শুরু করলে বাড়ির দিকে ফিরছিল তাসিফ। সে সময় রিপন মজুমদার নামে এক দুর্বৃত্ত ধারালো অস্ত্র দিয়ে তার ঘাড়ে কোপ দেয়। সঙ্গে থাকা অন্যরা তাকে ঘিরে ফেলে আরও আঘাত করে। মুহূর্তেই রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে লুটিয়ে পড়ে তাসিফ। স্থানীয়রা উদ্ধার করে দোহাজারী স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

এ ঘটনায় নিহতের বাবা জসিম উদ্দিন বাদী হয়ে সাতকানিয়া থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। প্রথমে অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করা হয়। তদন্ত শেষে পুলিশ ১৭ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেয়। চার্জশিটে রিপন মজুমদার (২০), মো. এমরান আহমদ (২৫), ইমন দত্ত অভি (২৩), শাহরিয়ার সাদেক নিলয় (২৮) এর নাম-ঠিকানা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হলেও বাকি ১৩ আসামির পূর্ণাঙ্গ পরিচয় দেওয়া হয়নি। তাদের শুধু ডাকনাম উল্লেখ করা হয়- ইমাম, ইয়ামিন, সজল, হাসান, জনি, মোশারফ, মাসুদ, আরিফ, ফারাবি, জীবন, সোহেল, ডালিম ও বাপ্পি।

এ ঘটনায় নিহতের আত্মীয় মিজানুর রহমান এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘পুলিশ অভিযোগপত্রে যাদের নাম-ঠিকানা পায়নি বলেছে তারা এলাকায় পরিচিত। আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। আওয়ামী লীগের চেয়ারম্যান লিয়াকত আলী এ মামলাকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করতে চেয়েছিল। তাদের চাপেই পুলিশ আসামীদের নাম-ঠিকানা উল্লেখ করেনি।’

গ্রেফতার দুই আসামি-শাহরিয়ার সাদেক নিলয় ও মো. এমরান আহমদ আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করে। তারা বিস্তারিতভাবে জানায়, কীভাবে রিপন মজুমদার তাসিফকে কোপ দেয় এবং বাকিরা কেন্দ্র দখলের কাজে অংশ নেয়। জবানবন্দিতে আরও উঠে আসে নলুয়া ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান লিয়াকত আলীর ভাতিজা দিদারুল ইসলাম মাসুদের নাম। অভিযোগ রয়েছে, মাসুদ ছিলেন এ হত্যাকাণ্ডের অন্যতম হোতা। নিহতের পরিবার ও স্থানীয়রা দাবি করেন, তৎকালীন চেয়ারম্যান লিয়াকত আলীও ঘটনাটির মূল নির্দেশদাতা ছিলেন।

কিন্তু অভিযোগপত্রে তাদের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। নিহত তাসিফের বাবা অভিযোগ করেন, আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতাদের রক্ষায় তদন্তকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করা হয়েছে। তার দাবি, প্রকৃত আসামিদের আড়াল করে মামলাকে দুর্বল করা হয়েছে। তিনি বলেন, “আমার একমাত্র ছেলেকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। অথচ মূল আসামিদের বাদ দিয়ে শুধু কিছু নামমাত্র আসামির বিরুদ্ধে চার্জশিট দেওয়া হয়েছে। এতে আমি সন্তুষ্ট নই। আমি প্রকৃত খুনিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।”

স্থানীয়রা জানান, মামলার চার্জশিটে নাম থাকা সত্ত্বেও অনেক আসামি প্রকাশ্যে এলাকায় ঘুরে বেড়াচ্ছে। এতে নিহতের পরিবার আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। তাছাড়া মামলার দীর্ঘসূত্রতায় তাদের ন্যায়বিচারের আশা ক্ষীণ হয়ে আসছে।

Single Sidebar Banner
  • সর্বশেষ
  • পঠিত