মঙ্গলবার, ১২ মে ২০২৬
Single Top Banner

সওজের জমিতে অবৈধ মার্কেট, লাখ টাকায় ভাড়া-বাণিজ্য; নীরব কর্তৃপক্ষ

কাপ্তাই সড়ক জুড়ে দখলের মহোৎসব

নিজস্ব প্রতিবেদক :

চট্টগ্রাম-কাপ্তাই সড়কের দুই পাশ যেন এখন দখলদারদের স্বর্গরাজ্য। সড়ক ও জনপদ (সওজ) বিভাগের অধিগ্রহণ করা সরকারি জমি দখল করে গড়ে উঠছে একের পর এক দোকান, মার্কেট ও আধাপাকা স্থাপনা। এসব স্থাপনা আবার মোটা অঙ্কের অগ্রিম নিয়ে ভাড়াও দেওয়া হচ্ছে। অথচ বছরের পর বছর ধরে এমন অবৈধ দখল চললেও রহস্যজনক কারণে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। স্থানীয়দের অভিযোগ, সওজের অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যোগসাজশেই দখল ও ভাড়া-বাণিজ্য চলছে প্রকাশ্যে।

রাউজান উপজেলার পাহাড়তলী চৌমুহনী বাজার এলাকায় সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, কাপ্তাই সড়কের পশ্চিম পাশের দক্ষিণ অংশে সরকারি জায়গা দখল করে বিশাল আকৃতির দুটি দোকানঘর নির্মাণ করেছেন মো. দিদারুল আলম (৫০)। তিনি উপজেলার কদলপুর ইউনিয়নের মৃত দেলা মিয়ার ছেলে। এর মধ্যে একটি দোকানে নিজেই ‘করিম ব্রাদার্স’ নামে তেল ও গ্যাস সিলিন্ডারের ব্যবসা করছেন। অন্য দোকানটি ভাড়া দিয়েছেন স্থানীয় এক ব্যবসায়ীর কাছে। শুধু ভাড়া নয়, ওই দোকানের জন্য অগ্রিম বাবদ নেওয়া হয়েছে এক লাখ টাকা।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, দিদারুল আলম একা নন। মহরা রাস্তার মাথা থেকে কাপ্তাই পর্যন্ত প্রায় ৫২ কিলোমিটার দীর্ঘ সড়কের দুই পাশেই অসংখ্য ব্যক্তি সরকারি জমি দখল করে স্থাপনা নির্মাণ করেছেন। কোথাও পাকা ভবন, কোথাও আধাপাকা দোকানঘর। অনেকেই আবার কয়েক লাখ টাকা অগ্রিম নিয়ে দোকান ভাড়া দিচ্ছেন। ফলে সরকারি জমি এখন ব্যক্তিগত আয়ের উৎসে পরিণত হয়েছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, পাহাড়তলী চৌমুহনী বাজারে দিদারুল আলমের ‘করিম ব্রাদার্স’ নামের দোকানটিতে খোলা অবস্থায় তেল ও গ্যাস সিলিন্ডার রাখা হয়েছে। কিন্তু সেখানে নেই কোনো অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা। গ্যাস সিলিন্ডার ও দাহ্য পদার্থ বিক্রির ক্ষেত্রে যেসব নিরাপত্তা ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক, তার কোনো কিছুই মানা হচ্ছে না। ব্যস্ত সড়কের একেবারে পাশে এমন ঝুঁকিপূর্ণ ব্যবসা চললেও নজরদারির কোনো চিহ্ন নেই।

এদিকে দিদারুল আলমের কাছ থেকে অবৈধ দোকান ভাড়া নিয়ে বিপাকে পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা মো. গিয়াস উদ্দিন। তিনি অভিযোগ করেন, গত বছরের ১ ডিসেম্বর এক লাখ টাকা জামানত দিয়ে দিদারুল আলমের কাছ থেকে দোকানটি ভাড়া নেন। ৩০০ টাকার স্ট্যাম্পে তাদের মধ্যে চুক্তিও হয়। কিন্তু দোকান নেওয়ার পর তিনি বুঝতে পারেন, এটি সওজের জায়গা দখল করে অপরিকল্পিতভাবে নির্মাণ করা হয়েছে। দোকানের অবস্থান ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় যে কোনো সময় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। এছাড়া ব্যবসা পরিচালনার মতো পরিবেশও সেখানে ছিল না।

গিয়াস উদ্দিন বলেন, “দোকান নেওয়ার কিছুদিন পরই আমি বুঝতে পারি এটি ঝুঁকিপূর্ণ। এরপর ডিসেম্বরেই দোকান ছেড়ে দেওয়ার কথা জানাই। পরে জানুয়ারিতে মালামাল সরিয়ে অন্যত্র চলে যাই। কিন্তু দোকান ছেড়ে দেওয়ার পরও আমার এক লাখ টাকার জামানত ফেরত দেওয়া হয়নি।”

জামানতের টাকা ফেরত না পেয়ে গত ২২ এপ্রিল রাউজান থানায় লিখিত অভিযোগ করেন গিয়াস উদ্দিন। অভিযোগটি তদন্ত করছেন থানার এসআই মোহাম্মদ আলী। তিনি বলেন, “বিষয়টি তদন্তাধীন রয়েছে।”

পাহাড়তলী বাজার সমিতির নেতারা জানান, কাপ্তাই সড়কের দুই পাশে অবৈধ স্থাপনা গড়ে ওঠায় প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে। কোথাও দোকান সড়কের গা ঘেঁষে নির্মাণ করা হয়েছে, কোথাও আবার ফুটপাত পর্যন্ত দখল হয়ে গেছে। এতে যানজটও লেগেই থাকছে। কিন্তু সওজের কর্মকর্তারা কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় দখলদাররা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, সওজের কিছু দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারীর ছত্রছায়ায় এসব অবৈধ স্থাপনা গড়ে উঠছে। দখলদারদের কাছ থেকে নিয়মিত আর্থিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। ফলে সরকারি জায়গা উদ্ধারের উদ্যোগ কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থাকলেও বাস্তবে দখল বাড়ছেই।

এ বিষয়ে সওজের উপ-সহকারী প্রকৌশলী আবু মো. ভুট্টু বলেন, “মহরা রাস্তার মাথা থেকে কাপ্তাই পর্যন্ত সড়কটির দৈর্ঘ্য প্রায় ৫২ কিলোমিটার। কাপ্তাইমুখী সড়কের ডান পাশে ১০৫ ফুট এবং বাঁ পাশে ৭৫ ফুট জমি অধিগ্রহণ করা আছে। ফলে ভবিষ্যতে সড়ক প্রশস্ত করতে নতুন করে জমি অধিগ্রহণের প্রয়োজন হবে না। তবে বর্তমানে সড়কের দুই পাশেই অবৈধ দখলদার রয়েছে। তাদের তালিকা করা হচ্ছে। শিগগিরই নোটিশ দিয়ে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হবে।”

সড়ক ও জনপদ বিভাগের চট্টগ্রাম জেলার নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ মোসলেহ্ উদ্দীন চৌধুরী বলেন, “সওজের জমি দখল করে স্থাপনা নির্মাণ সম্পূর্ণ অবৈধ। সেখানে দোকান ভাড়া দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। পাহাড়তলী বাজারসহ কাপ্তাই সড়কের সব অবৈধ দখলদারের তালিকা প্রস্তুত করে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

Single Sidebar Banner
  • সর্বশেষ
  • পঠিত