চট্টগ্রামের ‘ফুসফুস’ খ্যাত সিআরবি এলাকায় আবারও হাসপাতাল নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে আজ রোববার বিকেলে প্রস্তাবিত স্থান পরিদর্শনে আসছেন রেলমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম। এর আগে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে একই স্থানে হাসপাতাল নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হলে ব্যাপক জনবিরোধ ও আন্দোলনের মুখে তা স্থগিত করতে বাধ্য হয়েছিল সরকার। তবে বিএনপি সরকার দায়িত্ব গ্রহণের দুই মাসের মধ্যেই প্রকল্পটি পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা শুরু হওয়ায় নতুন করে উদ্বেগ ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে বিভিন্ন মহলে।
জানা গেছে, পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) ভিত্তিতে সিআরবিতে ৫০০ শয্যার একটি হাসপাতাল ও ১০০ আসনের মেডিক্যাল কলেজ নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয় আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে। এ লক্ষ্যে ইউনাইটেড হাসপাতাল পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ইউনাইটেড এন্টারপ্রাইজ অ্যান্ড কোম্পানির সঙ্গে ২০২০ সালের ১৮ মার্চ রেলওয়ের চুক্তি সম্পন্ন হয়। চুক্তি অনুযায়ী, বিদ্যমান রেলওয়ে হাসপাতালকে আধুনিকায়ন করে ৫০০ শয্যায় উন্নীত করা, পাশাপাশি ১০০ আসনের মেডিক্যাল কলেজ ও ৫০ আসনের নার্সিং ইনস্টিটিউট স্থাপনের পরিকল্পনা ছিল।
তবে প্রকল্পটি শুরু হওয়ার পরপরই চট্টগ্রামের বিভিন্ন সামাজিক, রাজনৈতিক ও পরিবেশবাদী সংগঠন এর বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়। ব্যাপক আন্দোলন ও জনমতের চাপে শেষ পর্যন্ত প্রকল্পটি স্থগিত রাখতে বাধ্য হয় তৎকালীন সরকার। প্রায় চার বছর পর আবারও একই প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়ায় নতুন করে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে।
ইফেক্টিভ ক্রিয়েশন অন হিউম্যান অপিনিয়নের (ইকো) গবেষণায় পাওয়া গেছে, সিআরবিতে ২২৩ প্রজাতির উদ্ভিদ পাওয়া যায়। এর মধ্যে ১৮৩টি ঔষধি গাছ। গুল্মজাতীয় উদ্ভিদ ৩৪ প্রজাতির। লতাজাতীয় উদ্ভিদ ৩৪ প্রজাতির। বিপন্ন প্রজাতির উদ্ভিদ ৯টি। এখানে রয়েছে ৮৮টি বৃক্ষ। যার মধ্যে শতবর্ষী গর্জন ও শিরীষগাছ। এসব বৃক্ষ ও উদ্ভিদের কারণে সিআরবি এলাকাকে চট্টগ্রামের ফুসফুস বলে থাকেন পরিবেশবিদেরা।
সিআরবি এলাকায় হাসপাতাল নির্মাণ কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণার দাবিতে বিবৃতি দিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ, একুশে পদকপ্রাপ্ত কবি ও সাংবাদিক আবুল মোমেন, চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) সাবেক উপাচার্য মোজাম্মেল হক, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) বোর্ড সদস্য ও নগর পরিকল্পনাবিদ জেরিনা হোসেন, প্রকৌশলী সুভাষ বড়ুয়া, মুক্তিযুদ্ধ গবেষক সিআরবি রক্ষা মঞ্চের আহ্বায়ক মাহফুজুর রহমান, সুশাসনের জন্য নাগরিক চট্টগ্রামের সম্পাদক আখতার কবীর চৌধুরী, প্রকৌশলী দেলোয়ার মজুমদার, কবি ও সাংবাদিক রাশেদ রউফ ও ওমর কায়সার, চট্টগ্রাম রিপোর্টার্স ফোরামের সাধারণ সম্পাদক কাজী আবুল মনসুর, চট্টগ্রাম ইতিহাস সংস্কৃতি গবেষণা কেন্দ্রের চেয়ারম্যান ও বেলা নেটওয়ার্ক সদস্য আলীউর রহমান, বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির চট্টগ্রাম সমন্বয়ক মনিরা পারভীন, পরিবেশ সংগঠন গ্রিন ফিঙ্গার্সের প্রতিষ্ঠাতা আবু সুফিয়ান ও রিতু পারভী।
শনিবার সন্ধ্যায় গণমাধ্যমে পাঠানো বিবৃতিতে তারা সিআরবি এলাকায় আবারও হাসপাতাল প্রকল্প স্থাপন নিয়ে উদ্যোগ নেওয়ায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তারা এই প্রকল্প স্থায়ীভাবে বাতিল করার দাবি জানান।
বিবৃতিতে বলা হয়, ২০০৮ সালে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনায় (ড্যাপ) সিআরবিকে কালচারাল হেরিটেজ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। যা ২০০৯ সালের ২৯ জানুয়ারি গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়। ড্যাপের নির্দেশনা অনুযায়ী, বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে সিআরবির কোনো অংশকে ব্যবহার করা যাবে না এবং কোনো বহুতল ভবন নির্মাণ করা যাবে না। শুধু পর্যটকদের আকর্ষণ করতে পাখির অভয়ারণ্য, জাদুঘর, প্রজাপতি উদ্যান প্রতিষ্ঠা করা যাবে।
এদিকে, মানবাধিকার সংগঠন বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশন (বিএইচআরএফ) সিআরবিতে হাসপাতাল নির্মাণের উদ্যোগের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। সংস্থার মহাসচিব এডভোকেট জিয়া হাবীব আহসান, চট্টগ্রাম মহানগর সভাপতি ড. শফিকুল ইসলাম, সেক্রেটারি এডভোকেট সৈয়দ মোহাম্মদ হারুন,চট্টগ্রাম জেলা সহ সভাপতি এড সুনীল কুমার সরকার,সেক্রেটারি এড এ এইচ এম জসিম উদ্দিন, সাংগঠনিক সম্পাদক আহসান হাবীব বাবু প্রমুখ প্রদত্ত এক যৌথ বিবৃতিতে এ ঘোষণা প্রদান করেন।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, সিডিএর মাস্টার প্ল্যানে সিআরবিতে এ ধরনের স্থাপনা নির্মাণের অনুমোদন নেই। ২০০৮ সালে প্রণীত ডিটেইল এরিয়া প্ল্যান (ড্যাপ)-এ এলাকাটিকে ‘কালচারাল হেরিটেজ’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। ফলে এখানে বাণিজ্যিক কার্যক্রম বা বহুতল ভবন নির্মাণের সুযোগ নেই। সংগঠনটি হুঁশিয়ারি দিয়ে জানায়, পরিবেশবিরোধী এ ধরনের উদ্যোগ প্রতিহত করতে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
পরিবেশবাদী সংগঠন বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা)-এর নেতারাও এ উদ্যোগের তীব্র সমালোচনা করেছেন। বাপা’র সভাপতি প্রফেসর মু. সিকান্দর খানের সভাপতিত্বে শনিবার অনুষ্ঠিত মতবিনিময় সভা এ সমালোচনা করা হয়।
মতবিনিময় সভায় সিআরবিতে হাসপাতাল নির্মাণের বিষয়টি গুরুত্বসহকারে উপস্থাপন হয়। সভায় উপস্থিত বক্তারা বলেন, তৎকালীন সরকারের সময় সিআরবিতে হাসপাতাল নির্মাণের অপপ্রয়াসের বিরুদ্ধে দলমত নির্বিশেষে সর্বস্তরের জনগণ আন্দোলন করে তৎকালীন সরকারকে বোঝাতে সক্ষম হয়েছিলো যে, হাসপাতাল নির্মাণের পরিকল্পনা একটি আত্মঘাতী পদক্ষেপ এবং তৎকালীন সরকার জনগনের যৌক্তিক দাবীকে মেনে নিয়ে হাসপাতাল নির্মাণের কার্যক্রম স্থগিত করেছিলো কিন্তু দুঃখজনক ব্যাপার হলো, বর্তমান সরকারের রেলমন্ত্রী মহোদয় নাকি আজ রোববার বিকাল ৪টায় সিআরবিতে আবারও প্রস্তাবিত হাসপাতালের স্থান পরিদর্শন করতে আসবেন। সিডিএর মাস্টার প্ল্যানের সাথে এখানে হাসপাতালসহ যে কোনো স্থাপনা নির্মাণের অনুমোদন সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক। স্থপতি জেরিনা হোসেন ও ইঞ্জিনিয়ার সুভাষ চন্দ্র বড়ুয়া বলেন, নগরীর ফুসফুস খ্যাত সিআরবি এলাকায় হাসপাতাল নির্মাণের চেষ্টা বা উদ্যোগ হবে জেনোসাইডের সামিল।
একই সুরে প্রতিবাদ জানিয়েছে বাসদ (মার্কসবাদী)। সংগঠনটির চট্টগ্রাম জেলা সমন্বয়ক এডভোকেট শফি উদ্দিন কবির আবিদ বলেন, “বিগত সরকারের সময় জনগণের তীব্র আন্দোলনের মুখে এই প্রকল্প বাতিল হয়েছিল। এখন নতুন সরকার একই প্রকল্প পুনরায় বাস্তবায়নের চেষ্টা করছে, যা জনগণের মতামতকে উপেক্ষা করার শামিল।”
তিনি আরও জানান, ইতোমধ্যে প্রস্তাবিত প্রকল্প এলাকার আশপাশে উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়েছে, যা উদ্বেগজনক। এ ধরনের উদ্যোগ বন্ধ না হলে কঠোর আন্দোলনের কর্মসূচি দেওয়া হবে।
এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য) ডা. সেখ ফজলে রাব্বি বলেন, ‘রেলমন্ত্রী মহোদয় রোববার বিকেল ৪টায় সিআরবি এলাকায় হাসপাতালের জমি পরিদর্শনে আসবেন বলে জেনেছি। তবে হাসপাতাল নির্মাণ সংক্রান্ত কোনো আনুষ্ঠানিক চিঠি আমি এখনো পাননি। যে কারনে বিষয়টি নিয়ে আমি বিস্তারিত বলতে পারছি না।’


