রবিবার, ২৪ মে ২০২৬
Single Top Banner

প্রবাসে আড়াই বছরে চট্টগ্রামের ১০১৬ জনের মৃত্যু

নিজস্ব প্রতিবেদক :

প্রবাস জীবনের স্বপ্ন নিয়ে চট্টগ্রাম থেকে হাজারো তরুণ পাড়ি জমাচ্ছেন মধ্যপ্রাচ্য ও অন্যান্য দেশে। কিন্তু এই স্বপ্ন অনেক সময় রূপ নিচ্ছে শোকে। গত আড়াই বছরে শুধু চট্টগ্রাম জেলার ১ হাজার ১৬ জন প্রবাসীর মৃত্যু হয়েছে বিদেশের মাটিতে। প্রতিদিনকার এই মৃত্যুর মিছিল একদিকে পরিবারগুলোকে নিঃস্ব করছে, অন্যদিকে প্রবাসজীবনের কঠিন বাস্তবতাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে।

গত ২১ জুলাই কাতারের হোমসালাল মোহাম্মদ এলাকায় এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান রাঙ্গুনিয়ার বেতাগী ইউনিয়নের যুবক মো. রায়হান (২০)। তিনি ফুড ডেলিভারির কাজ করতেন। রাতে খাবার পৌঁছে দেওয়ার সময় দ্রুতগামী একটি গাড়ি পেছন থেকে ধাক্কা দিলে তিনি গুরুতর আহত হন। স্থানীয় হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। রায়হানের মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের নয়, বরং প্রবাসে মৃত্যুর দীর্ঘ তালিকার আরেকটি নাম মাত্র।

চট্টগ্রাম জেলা কর্মসংস্থান ও জনশক্তি কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুন পর্যন্ত মারা গেছেন ১৯০ জন প্রবাসী। ২০২৪ সালে মারা গেছেন ৪১৭ জন এবং ২০২৩ সালে মারা গেছেন ৪০৯ জন। ২০২৪ সালের মাসওয়ারি পরিসংখ্যান বলছে—জানুয়ারিতে ৪৩ জন, ফেব্রুয়ারিতে ৩৪ জন, মার্চে ৩৫ জন, এপ্রিলে ৪০ জন, মে মাসে ৩৪ জন, জুনে ৩৪ জন, জুলাইয়ে ৫২ জন, আগস্টে ২৬ জন, সেপ্টেম্বরে ৩০ জন, অক্টোবরে ৩৩ জন, নভেম্বরে ২২ জন এবং ডিসেম্বরে ৩৪ জন মারা গেছেন। এই সংখ্যা প্রমাণ করে যে প্রতি মাসে গড়ে ৩০ থেকে ৪০ জন প্রবাসী মৃত্যুবরণ করছেন। হৃদরোগ, সড়ক দুর্ঘটনা, কর্মক্ষেত্রের দুর্ঘটনা এবং মানসিক চাপজনিত কারণে আত্মহত্যা প্রবাসী মৃত্যুর মূল কারণ বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

একজন প্রবাসীর মরদেহ দেশে পাঠাতে খরচ হয় দুই থেকে আড়াই লাখ টাকা। বিমানে মরদেহ পাঠাতে দিতে হয় দুই যাত্রীর সমপরিমাণ ভাড়া। পাশাপাশি মরদেহ হিমাগারে রাখতে হয়, যা খরচ আরও বাড়িয়ে দেয়। ফলে অসচ্ছল পরিবারের পক্ষে এই অর্থ জোগাড় করা কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রবাসীরা মিলিতভাবে অর্থ সংগ্রহ করে মরদেহ পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। রাঙ্গুনিয়ার প্রবাসী সারোয়ার রানা বলেন, “মরদেহ পাঠাতে কখনও কখনও দীর্ঘ সময় লাগে। বিমানের শিডিউল জটিলতা, খরচের চাপ—সব মিলিয়ে পরিবারগুলো এক অসহনীয় পরিস্থিতির মধ্যে পড়ে।” অন্যদিকে অবৈধপথে যাওয়া প্রবাসীদের মরদেহ দেশে পাঠাতে প্রশাসনিক জটিলতা আরও বেড়ে যায়। ফলে কখনও কখনও মরদেহ দেশে পাঠানো সম্ভব হয় না, তখন প্রবাসের মাটিতেই বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করতে হয়। এটি স্বজনদের জন্য আরও বেদনাদায়ক হয়ে ওঠে।

চট্টগ্রাম জেলা কর্মসংস্থান ও জনশক্তি কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মহেন্দ্র চাকমা জানান, শ্রমিক ভিসায় যাওয়া প্রবাসীর মৃত্যু হলে মরদেহ পরিবহন ও দাফনের জন্য ৩৫ হাজার টাকা এবং বৈধ কর্মীর ওয়ারিশদের তিন লাখ টাকা দেওয়া হয়। ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত এই খাতে দেওয়া হয়েছে ৫৬ লাখ ১০ হাজার টাকা। ২০২৩ সালে দেওয়া হয়েছিল এক কোটি ২৪ লাখ ৯৫ হাজার টাকা। ওয়েজ আনার্স কল্যাণ বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, কোনো প্রবাসী মারা গেলে সংশ্লিষ্ট দেশের কর্তৃপক্ষ মৃত্যুর কারণ জানায়। এরপর দূতাবাস সেটি বোর্ডে পাঠায় এবং সহায়তার প্রক্রিয়া শুরু হয়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রবাসীদের মৃত্যুহার ক্রমেই বাড়ছে, যা দেশের জন্য উদ্বেগজনক। তাদের মতে, বিদেশগামী শ্রমিকদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা, চিকিৎসা সুবিধা, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা গেলে মৃত্যুর সংখ্যা কিছুটা হলেও কমানো সম্ভব হবে। প্রবাসীরা শুধু রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছেন না, বরং নিজেদের জীবন দিয়ে দেশের অর্থনীতিকে টিকিয়ে রাখছেন। কিন্তু মৃত্যুর পর মরদেহ দেশে পাঠানোর ভোগান্তি ও খরচ তাদের স্বজনদের নতুন করে দুঃস্বপ্নে ফেলে দিচ্ছে।

Single Sidebar Banner
  • সর্বশেষ
  • পঠিত