বুধবার, ১ এপ্রিল ২০২৬
Single Top Banner

সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড

শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খাঁন কামালের মৃত্যুদণ্ড

নিজস্ব প্রতিবেদক :

 


মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় চব্বিশের জুলাই-আগস্টের গণহত্যা ও হত্যাকাণ্ডের দায়ে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামালের মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। গণ-অভ্যুত্থানের পটভূমিতে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগে করা মামলাগুলোর মধ্যে এটি প্রথম যার রায় প্রকাশ হলো সোমবার দুপুরে।

একই মামলায় দোষ স্বীকার করে রাজসাক্ষী হিসেবে ট্রাইব্যুনালে গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য দেওয়া সাবেক পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। বছরখানেক কারাগারে থাকা মামুনকে সেদিন সকালে কঠোর নিরাপত্তায় প্রিজনভ্যানে করে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। মাথা নিচু করে আদালতের হাজতখানায় প্রবেশ করেন তিনি।

দুপুর ১২টা ৪০ মিনিটে ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল ৪৫৩ পৃষ্ঠার বিশদ রায় পাঠ শুরু করেন। বিচারিক প্যানেলের অন্য সদস্য ছিলেন বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ ও বিচারপতি মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী। টানা দুই ঘণ্টা দশ মিনিট রায়ের সংক্ষিপ্ত অংশ পাঠ শেষে দুপুর ২টা ৫০ মিনিটে শেখ হাসিনা ও কামালের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের ঘোষণা আসে।

মামলায় পলাতক দুই প্রধান আসামি—শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান কামাল—এখনো গ্রেপ্তার এড়ালেও বিচারের মুখোমুখি হতে হয়েছে মামুনকে। প্রসিকিউশন যুক্তিতর্কে শেখ হাসিনা ও কামালের সর্বোচ্চ দণ্ড এবং মামুনের বিষয়ে ট্রাইব্যুনালের বিবেচনার ওপর সিদ্ধান্ত ছেড়ে দেওয়ার সুপারিশ করে। অন্যদিকে মামুনের আইনজীবী যায়েদ বিন আমজাদ তার খালাস দাবি করেন। রাষ্ট্রনিযুক্ত ডিফেন্স অ্যাডভোকেট আমির হোসেনও আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে শেখ হাসিনা ও কামাল খালাস পাবেন।

প্রসিকিউশনের আনা অভিযোগে আসামিদের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মোট পাঁচটি অভিযোগ গঠন করা হয়—উসকানি, মারণাস্ত্র ব্যবহার, আবু সাঈদ হত্যা, চানখারপুলে হত্যা এবং আশুলিয়ায় লাশ পোড়ানোর মতো ভয়াবহ অপরাধ এতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। বিস্তৃত অভিযোগপত্রটি ছিল মোট আট হাজার ৭৪৭ পৃষ্ঠার—যার মধ্যে তথ্যসূত্র দুই হাজার ১৮ পৃষ্ঠা, জব্দতালিকা ও দালিলিক প্রমাণ চার হাজার পাঁচ পৃষ্ঠা এবং শহীদদের তালিকা দুই হাজার ৭২৪ পৃষ্ঠা। মামলায় সাক্ষ্য দিয়েছেন মোট ৮৪ জন। ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা গত ১২ মে এ প্রতিবেদন চিফ প্রসিকিউটরের কাছে জমা দেয়।

এ রায়ের দিন ঘিরে ট্রাইব্যুনাল ও সুপ্রিম কোর্ট এলাকায় নেওয়া হয় নজিরবিহীন নিরাপত্তাব্যবস্থা। পুলিশ, র‌্যাব, এপিবিএন, বিজিবি এবং সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়। গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরাও ছিলেন বিশেষ তৎপরতায়। নিরাপত্তার স্বার্থে রোববার সন্ধ্যার পর দোয়েল চত্বর থেকে শিক্ষাভবনমুখী সড়কে গাড়ি চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং সীমিত করা হয় সাধারণ মানুষের প্রবেশ।

মামলাটি ২৮ কার্যদিবসে ৫৪ জন সাক্ষীর জেরা-সাক্ষ্য সম্পন্ন হওয়ার পর ৯ কার্যদিবস চলে প্রসিকিউশন ও রাষ্ট্রনিযুক্ত ডিফেন্সের যুক্তিতর্ক। গত ২৩ অক্টোবর অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামানের সমাপনী বক্তব্য এবং রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম ও আমির হোসেনের যুক্তিখণ্ডন শেষে রায়ের জন্য ১৭ নভেম্বর দিন ধার্য হয়।

দীর্ঘ তদন্ত, বিস্তৃত সাক্ষ্যগ্রহণ এবং বহুস্তরীয় যুক্তিতর্ক শেষে ঘোষিত এই রায়কে দেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে সবচেয়ে যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

Single Sidebar Banner
  • সর্বশেষ
  • পঠিত