চট্টগ্রামে সরকারের ‘ফ্যামিলি কার্ড’ প্রকল্পের আওতায় এখন পর্যন্ত ৫ হাজার ৫৭৫ পরিবার সরাসরি আর্থিক সহায়তা পাচ্ছে। নগরের ৪১ নম্বর দক্ষিণ পতেঙ্গা ওয়ার্ডে পরীক্ষামূলকভাবে (পাইলট প্রকল্প) এই কার্যক্রম শুরু হয় চলতি বছরের ১০ মার্চ থেকে। এরপর থেকে নিয়মিতভাবে নির্বাচিত পরিবারগুলোকে প্রতি মাসে আড়াই হাজার টাকা করে সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দরিদ্র ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। কারণ এর মাধ্যমে প্রকৃত উপকারভোগীদের চিহ্নিত করে সরাসরি আর্থিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে।
গত ১০ মার্চ দক্ষিণ পতেঙ্গা ওয়ার্ডে আনুষ্ঠানিকভাবে ফ্যামিলি কার্ড প্রকল্পের কার্যক্রম উদ্বোধন করেন অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। বর্তমানে চট্টগ্রাম নগরের মধ্যে শুধুমাত্র দক্ষিণ পতেঙ্গা ওয়ার্ডেই এই কার্যক্রম সীমাবদ্ধ রয়েছে। তবে পর্যায়ক্রমে অন্যান্য ওয়ার্ড ও উপজেলাতেও এ কার্যক্রম সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানা গেছে।
জেলা সমাজসেবা কার্যালয় সূত্র জানিয়েছে, মাঠ পর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ, যাচাই-বাছাই ও ডাটা বিশ্লেষণের মাধ্যমে দক্ষিণ পতেঙ্গা ওয়ার্ডে হতদরিদ্র, দরিদ্র ও নিম্নমধ্যবিত্ত ক্যাটাগরিতে মোট ১০ হাজার ১২৪ জন উপকারভোগীকে প্রাথমিকভাবে তালিকাভুক্ত করা হয়। পরে বিস্তারিত যাচাই শেষে চূড়ান্তভাবে ৫ হাজার ৫৭৫ পরিবারকে নির্বাচন করা হয়। নির্বাচিত পরিবারগুলো মার্চ মাস থেকে নিয়মিতভাবে আর্থিক সহায়তা পাচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তথ্য যাচাইয়ের ক্ষেত্রে পরিবারের আয়, বাসস্থান, সামাজিক অবস্থা, পরিবারের সদস্য সংখ্যা এবং সরকারি অন্যান্য সহায়তা পাওয়ার বিষয়গুলো গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
চট্টগ্রাম জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন ও অর্থ) মো. জসীম উদ্দিন বলেন, “বর্তমান সরকারের নেওয়া ‘ফ্যামিলি কার্ড’ প্রকল্পে নগরের ৪১ নম্বর দক্ষিণ পতেঙ্গা ওয়ার্ডে ৫ হাজার ৬০০ পরিবার মার্চ মাস থেকে আড়াই হাজার টাকা করে পাচ্ছেন। বর্তমানে জেলার মধ্যে হাটহাজারী উপজেলার গুমনমর্দন ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডে পাইলট প্রকল্পের আওতায় জরিপ ও ডাটা এন্ট্রি কার্যক্রম শেষ হয়েছে। শিগগিরই প্রাথমিকভাবে ৫০০ থেকে ৬০০ পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ড প্রদান করা হবে।”
তিনি আরও বলেন, প্রকল্পটির আওতা ধীরে ধীরে বাড়ানো হবে। এতে সমাজের পিছিয়ে থাকা পরিবারগুলো আর্থিকভাবে কিছুটা স্বস্তি পাবে।
চট্টগ্রামের ১৫টি উপজেলার মধ্যে প্রথমবারের মতো হাটহাজারী উপজেলার গুমনমর্দন ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডে ফ্যামিলি কার্ড কার্যক্রম চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে সেখানে জরিপ ও ডাটা এন্ট্রির কাজ সম্পন্ন হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন সূত্র জানিয়েছে, প্রাথমিকভাবে ৫০০ থেকে ৬০০ পরিবারকে এ কার্ডের আওতায় আনা হবে। পরবর্তীতে পর্যায়ক্রমে ইউনিয়নের অন্যান্য ওয়ার্ডেও প্রকল্পটি সম্প্রসারণ করা হতে পারে।
দক্ষিণ পতেঙ্গা ওয়ার্ডের একাধিক উপকারভোগী জানান, নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় নিম্নআয়ের পরিবারগুলো কঠিন সময় পার করছে। এমন অবস্থায় সরকারের এই সহায়তা তাদের জন্য বড় ধরনের স্বস্তি এনে দিয়েছে।
ওই ওয়ার্ডের বাসিন্দা মো. বেলার হোসেন বলেন, “গত মার্চ মাস থেকে আমরা ফ্যামিলি কার্ডের আওতায় আড়াই হাজার টাকা করে পাচ্ছি। এই টাকা দিয়ে সংসারের বাজার খরচ ও প্রয়োজনীয় ওষুধ কেনা সম্ভব হচ্ছে। আমাদের মতো নিম্নআয়ের মানুষের জন্য এটি অনেক বড় সহায়তা।”
আরেক উপকারভোগী বলেন, “আগে বিভিন্ন সহায়তা কর্মসূচিতে নাম উঠলেও নিয়মিত সুবিধা পাওয়া যেত না। এখন ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে সরাসরি সহায়তা পাওয়ায় অনেক উপকার হচ্ছে।”
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, প্রকল্পটিতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে ডিজিটাল ডাটাবেজ তৈরি করা হয়েছে। প্রতিটি পরিবারের জাতীয় পরিচয়পত্র, আয়সংক্রান্ত তথ্য, পারিবারিক অবস্থা ও সামাজিক অবস্থান যাচাই করে তথ্য সংরক্ষণ করা হয়েছে। এতে একই ব্যক্তি একাধিক সুবিধা নেওয়ার সুযোগ কমে আসবে এবং প্রকৃত দরিদ্র পরিবারকে সহায়তা নিশ্চিত করা সহজ হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে নিম্নআয়ের মানুষের জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে পড়েছে। এ অবস্থায় ফ্যামিলি কার্ডের মতো কর্মসূচি সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীকে আরও শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। চট্টগ্রামে পরীক্ষামূলকভাবে শুরু হওয়া এ কার্যক্রম সফল হলে পর্যায়ক্রমে পুরো জেলাজুড়ে বাস্তবায়নের সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
এদিকে, চট্টগ্রাম নগরী ও জেলার অন্যান্য উপজেলার দরিদ্র ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারগুলো থাকিয়ে আছে কখন তারা এ প্রকল্পের আওতায় আসবে এবং প্রকল্পের সুবিধা গ্রহণ করবে।
হাটহাজারী উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মুজাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘উপজেলার গুমনমর্দন ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডে পাইলট প্রকল্প হিসেবে ফ্যামিলি কার্ড প্রদানের লক্ষ্যে জরিপ এবং ডাটা এন্ট্রি কার্যক্রম রবিবার সম্পন্ন হয়েছে। পরবর্তীতে পরিবারগুলোর মাঝে কার্ড বিতরণ করা হবে। প্রাথমিকভাবে কত জনকে ফ্যামিলি কার্ড দেওয়া হবে তা এখনো সিদ্ধান্ত হয়নি।’


