টানা প্রায় দুই সপ্তাহের ভারী ও অতি ভারী বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল এবং আকস্মিক বন্যায় বিপর্যস্ত রাঙামাটির সার্বিক পরিস্থিতির ধীরে ধীরে উন্নতি হলেও এখনো কাটেনি দুর্গত মানুষের দুর্ভোগ। বৃষ্টি কমে যাওয়ায় বিভিন্ন নিম্নাঞ্চল থেকে বন্যার পানি নামতে শুরু করেছে। তবে পানি সরে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রকাশ পাচ্ছে ক্ষয়ক্ষতির ভয়াবহ চিত্র। জেলার বিভিন্ন উপজেলায় এখনো ৫০টি আশ্রয়কেন্দ্রে ৩ হাজার ৬৩৭ জন মানুষ অবস্থান করছেন বলে জানিয়েছে জেলা প্রশাসন।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বাগাইছড়ি উপজেলা। উপজেলার সবকটি ইউনিয়ন ও পৌরসভার বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে তলিয়ে যায়। কয়েকদিন ধরে বৃষ্টি না থাকায় অনেক এলাকা থেকে পানি নেমে গেলেও উপজেলা প্রশাসনের তথ্যমতে, এখনো বাগাইছড়ির ২৫টি আশ্রয়কেন্দ্রে প্রায় দেড় হাজার মানুষ আশ্রয় নিয়ে আছেন। পানি নামার পর বিভিন্ন গ্রামে বসতঘর, কৃষিজমি, সড়ক ও অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির চিত্র স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
ক্ষয়ক্ষতির দিক থেকে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে বিলাইছড়ি উপজেলার দুর্গম ফারুয়া ইউনিয়ন। বন্যার সময় ফারুয়া বাজার সম্পূর্ণ পানির নিচে চলে যায়। প্রবল স্রোতের কারণে কয়েকদিন সেখানে প্রশাসনের ত্রাণ পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। তবে পানি নেমে যাওয়ায় বর্তমানে ত্রাণ কার্যক্রম চালানো যাচ্ছে।
ফারুয়া বাজার ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ হারুন জানান, বাজারে বন্যার পানির চেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে পলি জমে। প্রায় দেড় থেকে দুই ফুট পর্যন্ত পলি দোকানপাট ও ঘরের ভেতরে জমে আছে। এসব পলি অপসারণ করতেই ব্যবসায়ীরা চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। অনেক দোকানের মালামাল নষ্ট হয়ে গেছে।
জেলা প্রশাসনের সর্বশেষ তথ্যে জানা গেছে, চলমান দুর্যোগে রাঙামাটির বিভিন্ন স্থানে মোট ১৩৫টি পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটেছে। যদিও বড় ধরনের প্রাণহানি এড়াতে প্রশাসনের আগাম সতর্কতা ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে মানুষ সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
এদিকে কয়েকদিন বৃষ্টি না থাকলেও গতকাল মধ্যরাত থেকে আবারও গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি শুরু হয়েছে, যা এখনো অব্যাহত রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, এ বৃষ্টি দীর্ঘায়িত হলে পাহাড়ধস ও বন্যা পরিস্থিতির আবারও অবনতি হতে পারে।
রাঙামাটি জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, জেলার বাঘাইছড়ি, রাজস্থলী, নানিয়ারচর, বিলাইছড়ি, বরকল, জুরাছড়ি, সদর, কাউখালী ও কাপ্তাই উপজেলায় মোট ৫০টি আশ্রয়কেন্দ্রে ৩ হাজার ৬৩৭ জন মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন। এর মধ্যে পানিবন্দি, ক্ষতিগ্রস্ত এবং পাহাড়ধসের ঝুঁকিতে থাকা পরিবারগুলোকে উদ্ধার করে আশ্রয়কেন্দ্রে নেওয়া হয়েছে।
উপজেলাভিত্তিক আশ্রয়কেন্দ্রের মধ্যে রাঙামাটি সদরে ৯টি, কাউখালীতে ২টি, কাপ্তাইয়ে ৪টি, বাগাইছড়িতে ২২টি, রাজস্থলীতে ৩টি, নানিয়ারচরে ১টি, বিলাইছড়িতে ৪টি, বরকলে ৪টি এবং জুরাছড়িতে ১টি আশ্রয়কেন্দ্র চালু রয়েছে।
যদিও সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে, তবুও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর দুর্ভোগ এখনো কাটেনি। জেলার বিস্তীর্ণ এলাকার ফসলি জমি পানিতে তলিয়ে নষ্ট হয়েছে। কৃষকেরা মৌসুমি ফসল হারিয়েছেন। একই সঙ্গে পাহাড়ি অঞ্চলের মানুষের প্রধান জীবিকার উৎস কাঠ ও মাছের ব্যবসাও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সড়ক যোগাযোগ ব্যাহত হওয়ায় পণ্য পরিবহন ও স্বাভাবিক ব্যবসা-বাণিজ্যও স্থবির হয়ে পড়েছে।
অন্যদিকে কাপ্তাই হ্রদে প্রজনন মৌসুম উপলক্ষে গত দুই মাস ধরে সব ধরনের মাছ ধরা বন্ধ রয়েছে, যা আরও এক মাস চলবে। ফলে মৎস্যজীবীদের আয়ও কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। সব মিলিয়ে পাহাড়ের প্রান্তিক জনগোষ্ঠী চরম আর্থিক সংকটে পড়েছে।
দুর্যোগ-পরবর্তী পুনর্বাসনকে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের ঘরবাড়ি পুনর্নির্মাণ, কৃষকদের আর্থিক সহায়তা, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের পুনর্বাসন এবং জীবিকা পুনরুদ্ধারে বিশেষ প্রণোদনা দেওয়ার দাবি উঠেছে।
এরই মধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী এবং রাঙামাটি আসনের সংসদ সদস্য জেলার বিভিন্ন দুর্গত এলাকা পরিদর্শন করেছেন। তারা আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থানরত মানুষের খোঁজখবর নেন, ত্রাণ বিতরণ করেন এবং ক্ষতিগ্রস্তদের দ্রুত পুনর্বাসনের আশ্বাস দেন।
স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানান, পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে ত্রাণ কার্যক্রমের পাশাপাশি ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রস্তুতের কাজ চলছে। সেই তালিকার ভিত্তিতেই পুনর্বাসন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হবে।


