বৃহস্পতিবার, ৯ এপ্রিল ২০২৬
Single Top Banner

জঙ্গল সলিমপুর যেন সন্ত্রাসীদের আলাদা রাজ্য?  

নিজস্ব প্রতিবেদক :

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুর—নামটি এখন আতঙ্কের। একসময় নির্জন পাহাড়ি এই অঞ্চলটি আজ পরিণত হয়েছে সন্ত্রাসী, ভূমিদস্যু ও অপরাধীদের অভয়ারণ্যে। সরকারি পাহাড় কেটে গড়ে উঠেছে বিশাল অবৈধ সাম্রাজ্য। তিন হাজার একরেরও বেশি খাসজমি দখল করে পাহাড় কেটে গড়ে তোলা হয়েছে বসতি, প্লট ও বাজার। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পলাতক অপরাধীরা এসে এখানে আশ্রয় নেয়। ছিন্নমূল মানুষের নামে সরকারি জায়গা দখল করে এখানে বসবাস শুরু হয়, পরে দখল হয়ে ওঠে সংগঠিত ব্যবসা। স্থানীয়দের বাইরে বাইরের কেউ প্রবেশ করতে পারে না। প্রবেশের জন্য লাগে অনুমতি, আর নিয়ম ভাঙলে শাস্তি দেয় স্থানীয় সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোই।

গত শনিবার রাতে জঙ্গল সলিমপুরের পাহাড়ি এলাকায় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে সীতাকুণ্ড। ইয়াছিন ও রোকন-গফুর নেতৃত্বাধীন দুই সন্ত্রাসী গ্রুপের মধ্যে বন্দুকযুদ্ধে একজন নিহত হয়, আহত হয় আরও অনেকে। এই ঘটনার পরের দিন রবিবার দুপুরে যখন সাংবাদিকরা ঘটনাস্থলে যান, তখন তাদের ওপরও হামলা চালায় দুর্বৃত্তরা। টেলিভিশনের চট্টগ্রাম ব্যুরো প্রধান ও বিশেষ প্রতিনিধি হোসাইন জিয়াদ এবং ক্যামেরাপার্সন মো. পারভেজকে মারধর করে গুরুতর আহত করা হয়। হামলাকারীরা তাদের ক্যামেরা, মোবাইল ও ব্যক্তিগত জিনিসপত্র লুটে নেয়। স্থানীয়রা আহত সাংবাদিকদের উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠান। এ ঘটনায় সারাদেশের সাংবাদিক সমাজ ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। চট্টগ্রাম প্রেসক্লাব ও সিএমইউজে হামলাকারীদের দ্রুত গ্রেফতারের দাবি জানিয়েছে। সীতাকুণ্ড থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মুজিবুর রহমান বলেন, হত্যাকাণ্ড ও সাংবাদিক হামলার ঘটনায় জড়িতদের শনাক্ত করে গ্রেফতারের জন্য অভিযান চলছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জঙ্গল সলিমপুরের ভেতরে গড়ে উঠেছে দুইটি বড় আবাসিক এলাকা। একদিকে ‘চট্টগ্রাম মহানগর ছিন্নমূল বস্তিবাসী সমন্বয় সংগ্রাম পরিষদ’ নামের একটি সংগঠন ৩৪টি পাহাড় কেটে ৫৮৬ দশমিক ৬০ একর সরকারি জায়গা দখল করে প্রায় ১৩ হাজার ৯০০টি প্লট তৈরি করেছে। অপরদিকে ‘আলীনগর সমবায় সমিতি লিমিটেড’ নামের সংগঠন তিনটি পাহাড় কেটে ২৩৬ দশমিক ৩২ একর জায়গা দখল করে বানিয়েছে আড়াই হাজারের মতো প্লট। প্রতিটি প্লট ১০ থেকে ২০ লাখ টাকায় বিক্রি হয়। পাহাড় কাটার জন্য এখানে চালু আছে ‘টোকেন সিস্টেম’। প্রতিদিন ৫০০ টাকা দিয়ে সমিতির টোকেন কিনতে হয়, আর সেই টোকেন থাকলেই নির্দিষ্ট পাহাড়ে একদিনের জন্য মাটি কাটার অনুমতি মেলে। যতদিন না পাহাড় বসবাসযোগ্য হয়, ততদিন টোকেন নবায়ন করতে হয়। বসবাসের উপযোগী হলেই জায়গাটি বায়নামায় বিক্রি করে দেওয়া হয়। এভাবে পাহাড় কাটা, জমি বিক্রি ও টোকেন বাণিজ্য করে কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। ভূমি অফিসের জরিপেও প্রমাণ মিলেছে—জঙ্গল সলিমপুরে ৩৭টি পাহাড় কেটে ফেলা হয়েছে।

৯০-এর দশকে দুর্ধর্ষ ভূমিদস্যু আলী আক্কাস প্রথম এই এলাকায় আশ্রয় নেয়। তার হাত ধরেই শুরু হয় অবৈধ দখল ও পাহাড় কাটা। কম দামে ছিন্নমূল মানুষদের প্লট দেওয়ার নামে তাদের দিয়ে পাহাড় কেটে বসতি গড়ানো হয়। এতে যেমন আলী আক্কাসের সম্পদ বাড়ে, তেমনি তৈরি হয় তার সশস্ত্র বাহিনী। ২০১০ সালে র‌্যাবের ক্রসফায়ারে আক্কাস নিহত হওয়ার পর তার অনুসারী রোকন, মশিউর, ইয়াছিন, ফারুক, গাজী সাদেক, গফুর মেম্বার, রিপন, আল আমিন সাগরসহ অনেকে এলাকাটির নিয়ন্ত্রণ নেয়। বর্তমানে এসব সন্ত্রাসী গ্রুপের মধ্যেই আধিপত্য বিস্তার নিয়ে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে চলেছে নিয়মিত। ইয়াছিনের বিরুদ্ধে নোয়াখালী ও চট্টগ্রামে এক ডজনের বেশি খুন, অস্ত্র, প্রতারণা ও বিস্ফোরক আইনে মামলা রয়েছে।

স্থানীয় প্রশাসনের একাধিক উদ্যোগেও জঙ্গল সলিমপুরে অবৈধ দখল রোধ সম্ভব হয়নি। তৎকালীন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মমিনুর রহমান দায়িত্বে থাকাকালে পাহাড় কেটে বানানো কিছু স্থাপনা উচ্ছেদ করা হলেও, তার বদলির পর সব কার্যক্রম থমকে যায়। পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর দাবি, এখানকার অবৈধ দখলদাররা রাজনৈতিক আশ্রয়ে শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। তারা যে দলই ক্ষমতায় থাকুক না কেন, সেই দলের ব্যানার ব্যবহার করে নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করে এসেছে। চট্টগ্রাম পরিবেশ ফোরামের তথ্যমতে, জঙ্গল সলিমপুর ও আলিনগর মিলিয়ে প্রায় ৩ হাজার ১০০ একর সরকারি খাসজমির মধ্যে ৪০ থেকে ৫০ জন চিহ্নিত ভূমিদস্যু দখল করে নিয়েছে অধিকাংশ এলাকা। এদের সঙ্গে রয়েছে আরও প্রায় তিনশ’ সহযোগী।

এ এলাকার প্রতিটি অংশ ভাগ করে তৈরি করা হয়েছে ১১টি ‘সমাজ’। প্রতিটি সমাজের শীর্ষ ব্যক্তিরা নির্ধারণ করে দেন কোথায় পাহাড় কাটা হবে, কোথায় সড়ক হবে, কে সরকারি সহায়তা পাবে। সমিতির সদস্য না হলে কেউ এখানে থাকতে পারে না। এই সমাজগুলো মশিউর, গাজী সাদেক, রোকন-গফুরদের সহযোগিতায় পরিচালিত হয় বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। পাহাড় কাটা ও দখলের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে ইয়াছিন বাহিনী, আল আমিন বাহিনী, মকবুল শেখ বাহিনী, আক্কাছ বাহিনী, আবছার বাহিনী, জামাল বাহিনী, গাজী সাদেকুর রহমান বাহিনী, মশিউর রহমান বাহিনী ও গোলাম গফুর বাহিনীসহ আরও অনেক চক্র। তাদের নিয়ন্ত্রণেই চলছে পাহাড় কাটা, প্লট বাণিজ্য, অস্ত্র, মাদক ও চোরাচালানের ভয়ঙ্কর সাম্রাজ্য।

চট্টগ্রাম পরিবেশ ফোরাম জানিয়েছে, জঙ্গল সলিমপুরের অন্তত ৪০ শতাংশ পাহাড় কেটে ফেলা হয়েছে। পাহাড় ধসের ঝুঁকি মারাত্মকভাবে বেড়েছে, যা পুরো চট্টগ্রামের জন্য বিপজ্জনক। এখানকার পাহাড় কাটা বন্ধ না হলে চট্টগ্রাম নগরীর পরিবেশ ও ভূগোল ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে পড়বে। এদিকে জঙ্গল সলিমপুরে স্থায়ী উচ্ছেদ কার্যক্রম না থাকায় দখলদাররা নতুন করে ঘর-বসতি ও বাজার নির্মাণ করছে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থা বারবার অভিযান চালালেও অল্প সময়ের মধ্যেই আবার পুরনো চেহারায় ফিরে আসে এলাকা।

গোয়েন্দা সংস্থার তদন্তে জঙ্গল সলিমপুরে অস্থিরতার পেছনে ৭৭ জনকে চিহ্নিত করা হয়েছিল। কিন্তু প্রশাসনিক পরিবর্তনের পর তাদের বিরুদ্ধে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ফলে সেখানে গড়ে উঠেছে এক প্রকার স্বতন্ত্র শাসন ব্যবস্থা, যেখানে আইন নয়—শাসন চলে অস্ত্র ও প্রভাবের। সরকারি পাহাড়ি জমি দখল করে গড়ে ওঠা এই এলাকা এখন পরিণত হয়েছে দেশের ভেতর আরেক দেশে।

চট্টগ্রামের শহর থেকে মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরে থাকা এই জঙ্গল সলিমপুর এখন অপরাধ, ভূমি দখল, হত্যা, অস্ত্র ও মাদকের কেন্দ্রস্থল। প্রশাসনের দৃঢ় পদক্ষেপ না এলে এই ভয়ঙ্কর সাম্রাজ্য আরও বিস্তৃত হবে বলে আশঙ্কা স্থানীয়দের। দেশের ভেতর এই ‘অন্য দেশ’-কে পুনরুদ্ধার করতে হলে প্রয়োজন নিরপেক্ষ ও শক্ত অবস্থানে সরকারের সুসংগঠিত অভিযান।

Single Sidebar Banner
  • সর্বশেষ
  • পঠিত