বুধবার, ১ এপ্রিল ২০২৬
Single Top Banner

আজ ৫ আগস্ট

আজ স্বৈরশাসকের পালানোর দিন

নিজস্ব প্রতিবেদক :

আজ ৫ আগস্ট ২০২৫। বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় দিন। ঠিক এক বছর আগে এই দিনে ক্ষমতা হারিয়ে গোপনে দেশ ছাড়তে বাধ্য হন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ছাত্র-জনতার তীব্র গণআন্দোলনের মুখে তিনি পদত্যাগ করে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর একটি বিশেষ বিমানে করে গোপনে পাড়ি জমান ভারতের পালিয়ে যায়। এর মধ্য দিয়ে প্রায় ১৬ বছর ধরে একচ্ছত্র ক্ষমতা চর্চা করা একজন বিতর্কিত শাসকের স্বৈরতন্ত্রের অবসান ঘটে। দেশের মানুষের কাছে দিনটি আজ স্বৈরশাসনের পতনের প্রতীক, দ্বিতীয় স্বাধীনতার সূচনা।

সকাল থেকেই ঢাকার রাজপথে জনতার ঢল নামে। ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচিতে অংশ নিতে হাজার হাজার মানুষ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে রাজধানীর দিকে রওনা হন। পুলিশ ও সরকারি বাহিনীর কঠোর কারফিউ উপেক্ষা করে আন্দোলনরত শিক্ষার্থী, পেশাজীবী, শ্রমজীবী মানুষ এবং সাধারণ জনগণ রাজধানীর দিকে ছুটে আসেন। ঢাকার প্রবেশপথগুলোতে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গুলিতে প্রাণহানির ঘটনা ঘটলেও কেউ ফিরে যায়নি। দুপুরের দিকে সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান শেখ হাসিনার পদত্যাগের সংবাদ নিশ্চিত করলে শহরজুড়ে উল্লাস শুরু হয়। রাজধানীর কেন্দ্রস্থল শাহবাগ, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, প্রেসক্লাব, বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউসহ গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলো জনতায় ভরে যায়। লাখ লাখ মানুষ পতাকা হাতে, স্লোগানে, গান-কবিতায়, কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে উদযাপন করে এক স্বৈরতন্ত্রের পতন।

এরপর শুরু হয় জনতার প্রতীকী বিজয়। উত্তেজিত জনতা গণভবনে প্রবেশ করে। অনেকেই ঢুকে পড়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, জাতীয় সংসদ ভবনের বেষ্টনী অতিক্রম করে। কেউ দেয়ালে ছবি নামিয়ে ফেলে, কেউ চিৎকার করে বলে— ‘এই দেশ কারো একার নয়’। মানুষ যেন হঠাৎ করেই দীর্ঘদিনের নিপীড়নের ভার ঘুচিয়ে মুক্ত বাতাসে শ্বাস নিতে শিখে।

এর ঠিক আগের দিন অর্থাৎ ৪ আগস্ট পর্যন্তও শেখ হাসিনা ক্ষমতা ছাড়ার কোনো ইঙ্গিত দেননি। বরং ২২ জুলাই ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠকে তিনি দৃঢ়ভাবে বলেন, “শেখ হাসিনা পালায় না।” অথচ বাস্তবতা ছিল তার বিপরীত। পরদিন সকালে তিনি এবং তার ছোট বোন শেখ রেহানাকে নিয়ে দ্রুত হেলিকপ্টারে করে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সামরিক টার্মিনালে পৌঁছান। পরে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর একটি বিশেষ বিমান ভারতের আকাশে পাড়ি জমায়। গোপনে তাদের আশ্রয় দেওয়া হয় গাজিয়াবাদের হিন্ডন বিমানঘাঁটিতে। আনন্দবাজার অনলাইন এবং এনডিটিভির প্রতিবেদন অনুযায়ী, তার হাতে ছিল মাত্র ৪৫ মিনিট সময়। মাত্র দুটি স্যুটকেসে তিনি নিজের সামান্য পোশাক ও কাগজপত্র নিয়ে দেশ ছাড়েন।

এই পালিয়ে যাওয়া কোনো সাধারণ ঘটনা নয়। কারণ দেশের ইতিহাসে এর আগে ক্ষমতাচ্যুত হলেও কেউ এমনভাবে রাতারাতি দেশ ত্যাগ করেননি। তার শাসনামলে তৈরি হওয়া ‘অপরাজেয় ভাবমূর্তি’র মুখোশ এইদিনই প্রথমবার ভেঙে পড়ে। তার দীর্ঘ শাসনে তিনি বিচার বহির্ভূত হত্যা, গুম, নির্বাচনপ্রক্রিয়ার বিকৃতি, বাকস্বাধীনতার দমন এবং দুর্নীতিকে প্রতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছিলেন বলে অভিযোগ উঠে দেশ-বিদেশে। তার অনুগত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, সরকারি প্রশাসন এবং দলীয় ক্যাডারদের সহিংস দমননীতি ছিল ছাত্র ও তরুণদের তীব্র ঘৃণার কেন্দ্রে। সরকারদলীয় ক্যাডারদের হামলায় বহুবার আন্দোলনকারীরা রক্তাক্ত হয়েছেন। কিন্তু ২০২৪ সালের জুলাই মাসে শুরু হওয়া কোটা সংস্কার আন্দোলন এক ঐতিহাসিক বাঁকে গিয়ে দাঁড়ায়।

২০১৮ সালে প্রথম কোটা আন্দোলনের পর শেখ হাসিনা কোটা বাতিলের ঘোষণা দেন। কিন্তু ২০২৪ সালের জুনে হাইকোর্ট পূর্বের প্রজ্ঞাপনকে অবৈধ ঘোষণা করে ফের ৫৬ শতাংশ কোটা বহাল করেন। এতে শিক্ষার্থীদের মধ্যে চরম ক্ষোভ জন্ম নেয়। তারা এটিকে মেধাবীদের প্রতি চরম অবিচার হিসেবে দেখে এবং শুরু হয় আন্দোলনের দ্বিতীয় ধাপ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু হয়ে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে দেশব্যাপী। ৩ আগস্ট ছাত্র আন্দোলনের ছয়জন শীর্ষ সমন্বয়ক মুক্তি পাওয়ার পর শহীদ মিনার থেকে একদফা ঘোষণা আসে—“শেখ হাসিনার পদত্যাগ ছাড়া আমরা ফিরবো না।” এরপর ৫ আগস্টকে ‘মার্চ টু ঢাকা’ দিবস ঘোষণা করে, যাকে তারা ‘৩৬ জুলাই’ আখ্যায় দেয়। আন্দোলনকারীরা বলেন, “জুলাই শেষ হবে শেখ হাসিনার পতন দিয়ে।”

জাতিসংঘ মানবাধিকার কার্যালয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই আন্দোলনে নিহত হন অন্তত ১,৪০০ জন, যার মধ্যে ১২-১৩ শতাংশ ছিল শিশু। আহত হন প্রায় ২০ হাজার। বাংলাদেশ পুলিশও জানায়, তাদের ৪৪ জন কর্মকর্তা নিহত হন। টিআইবির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, শেখ হাসিনার অনুগত বাহিনী এবং আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠনের হাতে সরাসরি ছাত্র-জনতার রক্ত ঝরেছে। সারা দেশে শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে দায়ের হয় ১,৬০২টি মামলা। যার মধ্যে হত্যা মামলা ৬৩৮টি। তবে মামলাগুলো নিয়েও ওঠে নানা প্রশ্ন। অনেক মামলায় বিরোধী পক্ষকে ফাঁসানো, চাঁদাবাজির মাধ্যমে নাম বাদ দেওয়ার অভিযোগ উঠে।

৫ আগস্টের পরপরই আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব ছিন্নভিন্ন হয়ে পড়ে। অনেকে দেশ ছাড়েন, অনেকে আত্মগোপনে চলে যান। পার্টি অফিস বন্ধ হয়ে যায়। শহর ও গ্রামে জনতা দলীয় কার্যালয়গুলো ঘেরাও করে। পরে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের দাবি ওঠে। নোবেল জয়ী প্রফেসর ড. ইউনূসের নেতৃত্বে দেশে ফের নতুন এক রাজনৈতিক যাত্রার সূচনা ঘটে।

এই দিনটি তাই কেবল একটি সরকারের পতন নয়, এটি হয়ে ওঠে একটি যুগের অবসান ও আরেকটি যুগের শুরু। স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতার এই গণজাগরণ বহু মানুষের প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত। কেউ কেউ ৫ আগস্টকে আখ্যা দিয়েছেন বাংলাদেশের ‘দ্বিতীয় স্বাধীনতা দিবস’ হিসেবে। কারণ এই দিনটি শুধু একটি সরকার পতনের দিন নয়, বরং এটি গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও জনগণের ইচ্ছার জয়ের দিন।

Single Sidebar Banner
  • সর্বশেষ
  • পঠিত