কক্সবাজারের ঈদগাঁও উপজেলার ঐতিহ্যবাহী ঈদগাঁও বাজারের কোটি টাকার ড্রেনেজ প্রকল্প নির্মাণে ব্যাপক অনিয়ম এবং কাজ ফেলে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান উধাও হয়ে যাওয়ার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। তিন বছর আগে শুরু হওয়া এই প্রকল্প এখনও সম্পন্ন না হওয়ায় ব্যবসায়ী ও সাধারণ পথচারীরা চরম দুর্ভোগে রয়েছেন।
প্রকল্পের পটভূমি ও ধীরগতি
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের বাস্তবায়নে ২ কোটি ৩০ লাখ টাকা ব্যয়ে ঈদগাঁও স্টেশন থেকে বঙ্কিম বাজার পর্যন্ত প্রায় দুই কিলোমিটার ড্রেনেজ নির্মাণ কাজ শুরু হয় ২০২২ সালে। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর এ প্রকল্পের কাজ শুরু হলে বাজারের ব্যবসায়ী ও বাসিন্দারা স্বস্তির শ্বাস নিয়েছিলেন। তারা আশা করেছিলেন, বৃষ্টির পানি জমে থাকা, দুর্গন্ধ ও সড়কের ক্ষয়ক্ষতির মতো দীর্ঘদিনের সমস্যার সমাধান হবে।
কিন্তু কাজ শুরু হওয়ার পর থেকেই নিম্নমানের নির্মাণ সামগ্রী ব্যবহার, সঠিক পরিমাপ না মানা, উপকরণ কম দেওয়া এবং রাতের আঁধারে গোপনে ঢালাই করার মতো অভিযোগ ওঠে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘উইমার্ক ইন্টারন্যাশনাল’ -এর বিরুদ্ধে।

অনিয়মের চিত্র
সরেজমিনে দেখা যায়, ড্রেনেজের ঢালাই কাজে মাটি মিশ্রিত বালি, নিম্নমানের ইট ও কংক্রিট ব্যবহার করা হয়েছে। পাশাপাশি ঢালাইয়ের সময় মাটির পাশে সুরক্ষা টিন বসানো হয়নি, যার ফলে ঢালাইয়ের রস মাটির মধ্যে মিশে গিয়ে কাঠামোর স্থায়িত্ব প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। এসব অনিয়মের কারণে স্থানীয় ইউপি সদস্য নুরুল হুদা একাধিকবার কাজ বন্ধ করতে বাধ্য হন।
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, প্রকল্পের শিডিউলে ড্রেনেজের সঙ্গে টয়লেট লাইন সংযোগের কোনো বিধান না থাকলেও দায়িত্বরত প্রকৌশলী এস. এম. আবির গোপনে অর্থের বিনিময়ে কয়েকটি স্থাপনার সঙ্গে টয়লেটের অবৈধ সংযোগ দিয়েছেন। এর ফলে ড্রেনেজের ভেতর পচা দুর্গন্ধযুক্ত পানি জমে বাজার এলাকার পরিবেশ মারাত্মকভাবে দূষিত হচ্ছে।
বৈদ্যুতিক খুঁটি রেখে ঢালাই
সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর অনিয়ম হলো – ড্রেনেজের মাঝখানে ডজনাধিক বৈদ্যুতিক খুঁটি রেখে ঢালাই সম্পন্ন করা হয়েছে। বৃষ্টির সময় এসব খুঁটির চারপাশে পানি জমে প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়ছে।
বাজার ব্যবসায়ী পরিচালনা পরিষদ ও জুয়েলার্স সমিতির সাবেক সভাপতি সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘শিডিউল অনুযায়ী কাজ হচ্ছে না। নানা অনিয়মের পরও তড়িঘড়ি করে কাজ বুঝিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানটি। আমরা সঠিক তদন্ত এবং দায়ীদের শাস্তি দাবি করছি।’
ঠিকাদার ও বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের অবস্থান
অভিযোগের বিষয়ে দায়িত্বরত প্রকৌশলী এস. এম. আবির এ প্রতিবেদককে বলেন, বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ খুঁটি সরাতে সহযোগিতা করেনি। তবে কক্সবাজার পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির ঈদগাঁও জোনাল অফিসের ডিজিএম রাজন পাল বলেন, ‘খুঁটি সরানোর আবেদন দেওয়ার পর ঠিকাদার আর আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেননি। তারা নিজ দায়িত্বে কাজ চালিয়ে গেছেন।’
কর্তৃপক্ষের নীরবতা
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের ঈদগাঁও উপজেলা উপপ্রকৌশলী মাহমুদুল হাসান উজ্জ্বল বলেন, অনিয়মের বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বিমল চাকমা বলেন, প্রকল্পের বিস্তারিত জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরই জানাতে পারবে। কক্সবাজারের নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ ইবনে মায়াজ প্রামাণিকের সঙ্গে একাধিকবার ফোন ও হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগের চেষ্টা করেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
ব্যবসায়ী ও পথচারীদের ভোগান্তি
ঈদগাঁও বাজারে ছোট-বড় তিন সহস্রাধিক বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে। স্থায়ী পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার অভাবে এলাকাবাসী দীর্ঘদিন ধরে দুর্ভোগে ভুগছিলেন। ড্রেনেজ প্রকল্পের কাজ শুরু হলে অনেকে আশাবাদী হয়েছিলেন যে সমস্যা কেটে যাবে। কিন্তু প্রকল্পের অর্ধেক কাজ অসম্পূর্ণ থেকে যাওয়ায় এখনো বাজারের বিভিন্ন সড়কে নোংরা ও দুর্গন্ধযুক্ত পানি জমে থাকে।
এ কারণে ব্যবসায়ীদের দোকানে ক্রেতাদের আনাগোনা কমে যাচ্ছে এবং পচা দুর্গন্ধের কারণে বাজারের পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। পাশাপাশি রাস্তা ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে খানাখন্দে পরিণত হয়েছে।
তদন্তের দাবি
ব্যবসায়ী ও পথচারীরা প্রকল্পে অনিয়মের জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে তদন্ত ও কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন। তারা বলেন, সঠিকভাবে প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন না হলে ঈদগাঁও বাজারের দীর্ঘদিনের পানি নিষ্কাশন সমস্যার সমাধান হবে না।


