বুধবার, ৮ এপ্রিল ২০২৬
Single Top Banner

বিদেশে শ্রমিক, তবু আদালতে হাজির! চট্টগ্রামে ভুয়া হাজিরা নিয়ে তোলপাড়

নিজস্ব প্রতিবেদক :

আদালতের কাঠগড়ায় যিনি দাঁড়ানোর কথা, তিনি আসলে হাজার মাইল দূরে সৌদি আরবে প্রবাসী শ্রমিক। অথচ চট্টগ্রাম আদালতের রেকর্ডে দেখা যাচ্ছে, সেই আসামি নিয়মিত হাজিরা দিচ্ছেন। শুনতে অবিশ্বাস্য হলেও নথি বলছে—চট্টগ্রামে এক বছরের বেশি সময় ধরে চলছে ভুয়া হাজিরার নাটক। আদালতপাড়ায় এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু এই রহস্য।

চট্টগ্রামের পাথরঘাটার সাইফুল ইসলাম সানি (২২), মো. ইউসুফের ছেলে। তিনি ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে নতুন পাসপোর্ট পান এবং ওই বছরের আগস্টে চট্টগ্রাম থেকে ওমান হয়ে সৌদি আরব যান। বর্তমানে রিয়াদের এক প্রতিষ্ঠানে শ্রমিক হিসেবে কাজ করছেন। অথচ তার নামে ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে কোতোয়ালি থানায় চোরাই মালপত্র কেনাবেচার অভিযোগে মামলা হয়।

গোয়েন্দা পুলিশের এজাহারে বলা হয়, সানি ও নকিব মোস্তফা চোরাই মাল কেনাবেচার সঙ্গে জড়িত। তদন্ত শেষে ওই বছরের মে মাসে অভিযোগপত্র জমা পড়ে এবং আদালত ধারা ৪১১-এর অধীনে বিচার শুরু করেন, যা সর্বোচ্চ তিন বছরের সাজাযোগ্য অপরাধ।

আদালতের নথি বলছে, ২০২৪ সালের এপ্রিল থেকে সানিকে নিয়মিত হাজির দেখানো হচ্ছে। গত বছরের সেপ্টেম্বর, ডিসেম্বর এবং চলতি বছরের বিভিন্ন তারিখেও তাকে আদালতে হাজির হিসেবে রেকর্ডে দেখানো হয়েছে। অথচ পাসপোর্ট ও ভ্রমণ নথি প্রমাণ করছে, সানি তখন সৌদি আরবেই ছিলেন। বাদীপক্ষের অভিযোগ—সানির ছোট ভাই তাহসান ইসলাম সোহাম বড় ভাইয়ের ছদ্মবেশে আদালতে হাজির হচ্ছেন। সোহামের ছাত্রলীগের সঙ্গেও সম্পৃক্ততা রয়েছে বলে জানা গেছে।

বাদীপক্ষের আইনজীবী মোহাম্মদ শাহজাহান বলেন, “সানি বিদেশে থাকার পরও আদালতে হাজির দেখানো হচ্ছে।” আদালত ইতোমধ্যে সানিকে আগামী ২০২৬ সালের ৭ জানুয়ারি পাসপোর্টসহ হাজির হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। তবে রাষ্ট্রপক্ষ বিষয়টি উপস্থাপনের আগেই আসামিপক্ষ সময়ের আবেদন করে।

চট্টগ্রাম মহানগর প্রসিকিউশনের পরিদর্শক আমিনুর রশিদ জানান, অভিযোগ প্রমাণিত হলে এটি ফৌজদারি অপরাধ এবং আদালতের সঙ্গে প্রতারণা। সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটর মো. তাজ উদ্দীন বলেন, জাল হাজিরার শাস্তি রয়েছে, আদালত চাইলে আইনজীবীকেও নোটিশ দিতে পারেন। মহানগর পিপি মফিজুল হক ভূঁইয়া বলেন, আসামি হাজির না হলে ওয়ারেন্ট জারি হতে পারে, এতদিনের হাজিরার জন্যও শোকজ হতে পারে।

আইনজীবীদের মতে, মিথ্যা হাজিরা আদালত অবমাননা নয়, সরাসরি অপরাধ। নাগরিক সংগঠন সুজনের সাধারণ সম্পাদক আকতার কবির চৌধুরী বলেন, “তদন্ত করে দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।” মানবাধিকার ফাউন্ডেশনের মহাসচিব জিয়া হাবিব আহসান বলেন, “আদালতের প্রতারণা রোধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।” চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর সাখাওয়াত হোসেন মনে করেন, এটি ন্যায়বিচারের অন্তরায়, দায়ীদের শাস্তি দিতে হবে। আর প্রফেসর আবদুল্লাহ আল ফারুকির মতে, এ ধরনের অনিয়ম আদালতের প্রতি মানুষের আস্থা নষ্ট করে।

ইতিমধ্যে আদালত সাক্ষ্য গ্রহণ স্থগিত করে আগামী বছরের জানুয়ারিতে নতুন তারিখ দিয়েছে। ওই দিন সানিকে পাসপোর্টসহ হাজির হওয়ার নির্দেশ রয়েছে। এখন সবার দৃষ্টি সেই তারিখে, যখন প্রকাশ পেতে পারে বছরের পর বছর ধরে চলা ভুয়া হাজিরার রহস্য।

Single Sidebar Banner
  • সর্বশেষ
  • পঠিত