বুধবার, ১ এপ্রিল ২০২৬
Single Top Banner

দুর্নীতির টাকায় কানাডার বেগমপাড়ায় রাজকীয় জীবন 

নিজস্ব প্রতিবেদক :

কানাডার ‘বেগমপাড়া’ নিয়ে প্রথম বড় আলোচনা শুরু হয় ২০২০ সালে। তখনই সামনে আসে ভয়াবহ তথ্য—বাংলাদেশের বহু প্রভাবশালী ব্যক্তি, বিশেষ করে সরকারি কর্মকর্তা, রাজনীতিক ও ব্যবসায়ীরা দুর্নীতির অর্থ পাচার করে স্ত্রী-সন্তানদের কানাডায় পাঠিয়েছেন। তারা সেখানে কিনেছেন ফ্ল্যাট, গড়েছেন বাড়ি, আর চালাচ্ছেন বিলাসবহুল জীবনযাপন।

২০২০ সালের ১৮ নভেম্বর এক অনুষ্ঠানে তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন প্রকাশ্যে জানান, রাজনৈতিক ব্যক্তির চেয়ে বেশি সম্পদ পাচার করেছেন সরকারি কর্মকর্তারা। পাশাপাশি কিছু প্রভাবশালী ব্যবসায়ীও ছিলেন এ চক্রের অংশ। এই তথ্য প্রকাশের পর দেশজুড়ে শুরু হয় তোলপাড়।

দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) পরবর্তীতে সরকারের কাছে ২৮ জনের একটি তালিকা চায়। ওই বছরের ২৩ নভেম্বর মন্ত্রিপরিষদের বৈঠক শেষে তৎকালীন মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম জানান, দেশের বাইরে অর্থ পাচারে জড়িতদের বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট তদন্ত সংস্থা কাজ করছে। এর পরপরই বিদেশে অর্থ পাচারকারীদের যাবতীয় তথ্য চায় হাইকোর্ট।

দুদকের তদন্তে উঠে আসে, শতাধিক ব্যক্তি প্রায় ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা পাচার করেছেন কানাডাসহ বিভিন্ন দেশে। কিন্তু অচিরেই এ তদন্ত কার্যত স্থগিত হয়ে যায় তৎকালীন সরকারের চাপের মুখে।

তালিকাভুক্ত ২৮ জনের বেশিরভাগই সাবেক সচিব ও উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা। এদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব ড. আহমদ কায়কাউস, যার কানাডার মন্ট্রিল ও টরন্টোয় রয়েছে চারটি বাড়ি। বিসিএস ৮২ ব্যাচের কর্মকর্তা আবু আলম শহীদ খান, যিনি স্থানীয় সরকার সচিব হিসেবে অবসরে যান এবং বর্তমানে কারাবন্দি—তারও রয়েছে টরন্টোয় বাড়ি।

আরও রয়েছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব আবুল কালাম আজাদ, যার টরন্টোয় তিনটি ফ্ল্যাট; সাবেক মুখ্য সচিব নজিবুর রহমান, বর্তমানে কারাগারে থাকা এ কর্মকর্তা এনবিআরের চেয়ারম্যানও ছিলেন, মিসিসাগায় তার দুটি বিলাসবহুল বাড়ি রয়েছে।

দুদকের সাবেক চেয়ারম্যান ড. ইকবাল মাহমুদের রয়েছে তিনটি বাড়ি; সাবেক বিমান সচিব মহিবুল হকের তিনটি অ্যাপার্টমেন্ট; বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ফজলে কবিরের মন্ট্রিলে দুটি ফ্ল্যাট; আরেক সাবেক গভর্নর আবদুর রউফ তালুকদারের টরন্টোয় পাঁচটি বাড়ি ও ফ্ল্যাট রয়েছে।

সাবেক সচিব সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের তিনটি বাড়ি, জাহাংগীর আলমের দুটি বাড়ি, এম. নিয়াজ উদ্দিনের দুটি বাড়ি ও একটি খামারবাড়ি রয়েছে কানাডায়। প্রশান্ত কুমার হালদার, যিনি আর্থিক খাতে কেলেঙ্কারির কারণে কুখ্যাত, তিনটি ফ্ল্যাটের মালিক। নাফিস সরাফতের রয়েছে চারটি ফ্ল্যাট ও বিনিয়োগ, শহীদ ইসলাম পাপলুর রয়েছে তিনটি বাড়ি ও বিনিয়োগ।

এ ছাড়া সাবেক এমপি তানভীর ইমামের দুটি ফ্ল্যাট, এনবিআর কর্মকর্তা মতিউর রহমানের তিনটি বাড়ি, সাবেক প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব নাইমুল ইসলাম খানের একটি ফ্ল্যাট, নাসা গ্রুপের চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদারের চারটি বাড়ি ও বিনিয়োগ, শামীম ওসমানের একটি বাড়ি, পুলিশের সাবেক আইজি বেনজীর আহমেদের মেয়ের নামে দুটি বাড়ি, সাবেক প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার মেয়ের নামে একটি ফ্ল্যাট এবং সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলমের তিনটি বাড়ি ও বিনিয়োগ রয়েছে বলে জানা যায়।

তালিকায় ব্যবসায়ী শ্রেণির বেশ কিছু নামও আছে। তাদের পরিবারের কেউ না কেউ কানাডায় থাকেন এবং সেখানেই গড়ে তুলেছেন বিপুল সম্পদ। একজন বিতর্কিত ব্যবসায়ীর পরিবারের নামে কানাডায় রয়েছে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকার সম্পদ।

প্রবাসী বাংলাদেশিরা জানিয়েছেন, এসব প্রভাবশালী ব্যক্তি কানাডায় রাজকীয় জীবনযাপন করছেন, যদিও তাদের বৈধ আয়ের উৎস নেই। এতে স্থানীয় বাংলাদেশি কমিউনিটিতে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে।

Single Sidebar Banner
  • সর্বশেষ
  • পঠিত