স্টাফ রিপোর্টার: নিজস্ব পেট্রলপাম্প বাদ দিয়ে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে তেল কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক)। নগরের নয়াবাজার এলাকার হাককানী ফিলিং স্টেশন নামের ওই প্রতিষ্ঠান থেকে গতকাল বুধবার থেকে তেলা কেনা শুরু হয়। ফলে প্রতি লিটারে অন্তত তিন টাকা বাড়তি অর্থ খরচ হবে।
তবে এভাবে জ্বালানি তেল সংগ্রহের বিষয়টি সাময়িক বলে মন্তব্য করেছেন করপোরেশনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। তাঁরা বলছেন, নিজস্ব পেট্রলপাম্পের ‘ওভারহোলিং’ ও ‘স্টক ভেরিফিকেশন’–এর জন্য এ পদ্ধতিতে তেলা কেনা হচ্ছে। মোট সাত দিন হাককানী ফিলিং স্টেশন থেকে ডিজেল কেনা হবে। এর মাধ্যমে নিজস্ব পেট্রলপাম্পে জ্বালানি ব্যবহার ও ক্রয়ে কোনো অনিয়ম হয়েছে কি না, তা বের করা হবে। এ জন্য তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।
সিটি করপোরেশন সূত্র জানায়, করপোরেশনের নিজস্ব পেট্রলপাম্পের জন্য মেঘনা পেট্রোলিয়াম লিমিটেড থেকে ৬২ টাকায় ডিজেল সংগ্রহ করা হতো। আর এখন হাককানী ফিলিং স্টেশন থেকে কেনা হচ্ছে ৬৫ টাকায়। এ জন্য সিটি করপোরেশনকে চারটি শর্ত বেঁধে দিয়েছে ফিলিং স্টেশনটি। আবার এই ফিলিং স্টেশনের মালিক আবদুল কাদের মেয়র হজ কাফেলার পরিচালক। যেটির নির্বাহী পরিচালক হচ্ছেন কপোরেশনের প্রশাসক খোরশেদ আলম সুজন।
বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে জ্বালানি তেল সংগ্রহের বিষয়ে প্রশাসক খোরশেদ আলম সুজন বলেন, করপোরেশনের দুর্নীতির বড় জায়গা হচ্ছে ‘তেল’। অকেজো গাড়ির জন্যও তেল বরাদ্দ করা হয়। আবার গাড়ি যাবে দুই কিলোমিটার, কিন্তু তেল দেওয়া হয় ১০ কিলোমিটারের জন্য। আর পেট্রলপাম্পের মেশিনের মাধ্যমেও কারসাজির ঘটনা ঘটে। তাই এসব অনিয়ম খুঁজে বের করতে এক সপ্তাহের জন্য বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে তেল সংগ্রহ করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে তেল ব্যবহারের প্রকৃত চিত্র বের হয়ে আসবে।
নিজের প্রতিষ্ঠানের পরিচালকের কাছ থেকে তেল কেনা প্রসঙ্গে খোরশেদ আলম সুজন বলেন, আর্থিক সংকটের কারণে কোনো প্রতিষ্ঠান সিটি করপোরেশনকে বকেয়া দিতে রাজি না। পরিচয়ের সূত্র ধরে ফিলিং স্টেশন মালিককে রাজি করিয়েছেন বাকিতে তেল দিতে। আর মেয়র হজ কাফেলা সম্পূর্ণ অলাভজনক প্রতিষ্ঠান।
সিটি করপোরেশনের যান্ত্রিক শাখার তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে সংস্থাটিতে বিভিন্ন ধরনের গাড়ি আছে ৬৩২টি। এর বাইরে ২১২টি মোটরসাইকেল ও ৩৬টি জেনারেটর রয়েছে। এসব যানবাহন ও জেনারেটরের জন্য গত অর্থবছরে ২৫ কোটি টাকার জ্বালানি (ডিজেল, অকটেন, মোবিল, পেট্রল, হাইড্রোলিক, গ্রিসসহ অন্যান্য) কেনা হয়। জ্বালানিগুলো কেনা হয়েছে সরকারি মালিকানাধীন মেঘনা পেট্রোলিয়াম লিমিটেড থেকে।
যান্ত্রিক শাখায় কর্মরতরা জানান, মেঘনা পেট্রোলিয়াম লিমিটেড থেকে ডিজেল ভাউচারের মাধ্যমে নগরের সাগরিকায় অবস্থিত পেট্রলপাম্পে মজুত করা হয়। তারপর যান্ত্রিক শাখার ইস্যু করা স্লিপের মাধ্যমে গাড়িগুলোতে জ্বালানি দেওয়া হয়। এভাবে জ্বালানি তেলের অপব্যবহার কিংবা চুরির ঘটনা ঘটে বলে অভিযোগ রয়েছে। সিটি করপোরেশনের এই শাখার দায়িত্বে আছেন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী সুদীপ বসাক। মন্তব্য জানতে তাঁর মুঠোফোনে ফোন দেওয়া হলেও তিনি সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
এদিকে ৭ আগস্ট সিটি করপোরেশনে পরিচালিত একটি অ্যাম্বুলেন্স থেকে তেল চুরির বেশ কয়েকটি ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। পরে নতুন প্রশাসক খোরশেদ আলমের নির্দেশে কাজলচন্দ্র সেন নামে ওই চালককে বরখাস্ত করা হয়।
এই ঘটনার পর প্রশাসক খোরশেদ আলম সুজন জ্বালানি তেল সংগ্রহ ও বিতরণ প্রক্রিয়া যাচাই-বাছাইয়ে নির্দেশনা দেন। গত বুধবার তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আবু ছালেহকে আহ্বায়ক, প্রধান হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তার প্রতিনিধিকে সদস্যসচিব ও নির্বাহী প্রকৌশলী আবু সাদাত মো. আবু তৈয়বকে সদস্য করে একটি কমিটি গঠন করা হয়। কমিটিকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত সময় দেওয়া হয়েছে।
জানতে চাইলে কমিটির প্রধান আবু ছালেহ বলেন, এখন তদন্তের জন্য কর্মপরিকল্পনা ঠিক করছেন। পেট্রলপাম্পের নথিপত্র ও স্টক যাচাই-বাছাই করে প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে।
হাককানী ফিলিং স্টেশনের চার শর্ত
হাককানী ফিলিং স্টেশন থেকে জ্বালানি সংগ্রহের বিষয়ে মৌখিক নির্দেশনা দেওয়া হয়। এরপর ফিলিং স্টেশন গত মঙ্গলবার সিটি করপোরেশনের প্রশাসককে একটি চিঠি দেয়। সেখানে সিটি করপোরেশনকে ৪ শর্তে জ্বালানি তেল ও লুব্রিকেন্ট সরবরাহে আগ্রহ প্রকাশ করা হয়।
শর্তগুলো হচ্ছে, বিল থেকে ভ্যাট ও ট্যাক্স কাটা যাবে না, ক্রেডিট মেমোতে স্বাক্ষরকারীর নমুনা স্বাক্ষর ও সিলসহ নির্দিষ্ট গাড়ির নম্বর প্রেরণ, অপব্যবহার এড়াতে ক্রেডিট মেমো বই যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা। এ ছাড়া প্রতিদিন বিল করা হবে এবং ওই বিল তিন দিনের মধ্যে পরিশোধেরও শর্ত দেওয়া হয়।
ফিলিং স্টেশনের ব্যবস্থাপক প্রণব দে বলেন, তেল বিক্রির জন্য দেওয়া চারটি শর্তের ব্যাপারে করপোরেশন রাজি হয়েছে। এখন জ্বালানি তেল দেওয়া হচ্ছে। মূলত ডিজেলই নিচ্ছে বেশি। প্রথম দিন বুধবার প্রায় চার হাজার লিটার বিক্রি করা হয় সংস্থাটির কাছে।


