তন্ময় চৌধুরী
ভৌগোলিকভাবে মিয়ানমারের অবস্থান কৌশলগত দিক থেকে বেশ গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৪৮ সালে ব্রিটিশদের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভের পর দীর্ঘ সেনাশাসনে পিষ্ট দেশটি। মিয়ানমারের বিভিন্ন আঞ্চলিক নৃগোষ্ঠীর সঙ্গে সামরিক বাহিনী বা সরকারের সংঘাতের ইতিহাস পুরোনো হলেও সাম্প্রতিক সময়ে তা আরও বিস্তৃত হয়েছে। সেনাবাহিনীর অভ্যুত্থান দেশটিতে জাতিগত সম্পর্কের টানাপোড়েন এবং গৃহযুদ্ধের পুনরুত্থানের মাধ্যমে দেশটিকে একটি সংকটজনক অবস্থায় নিয়ে গেছে। ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মিয়ানমারের শাসনব্যবস্থা মূলত তিনটি সত্তার মধ্যে বিভক্ত। প্রথমটি হচ্ছে স্টেট অ্যাডমিনিস্ট্রেশন কাউন্সিল (এসএসি) বা দেশটির শাসনকার্যে নিয়োজিত শীর্ষ কর্মকর্তাদের সত্তা, দ্বিতীয়টি হচ্ছে জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তাদের সত্তা এবং সর্বশেষ মন্ত্রিসভা। তবে সশস্ত্র বাহিনী প্রধান এবং অভ্যুত্থানকারী নেতা হিসাবে মিন অং হ্লাইং এসব সত্তা ছাপিয়ে ক্রমেই ক্ষমতা কুক্ষিগত করে নিয়েছেন। সামরিক আইন জারি করে রাষ্ট্রের একচ্ছত্র ক্ষমতার অধিকারী হয়েছেন। স্বৈরশাসনের নীতি অনুসরণ করে সরকারবিরোধী যে কোনো ভিন্নমত দমন করার জন্য নির্যাতন ও হত্যাকে অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার করছে সামরিক জান্তা। তাছাড়া ক্ষমতার দখলকে সুসংহত করার জন্য একাধিক কঠোর আইন প্রণয়ন করেছে, যা মিয়ানমারের জনগণের আইনি সুরক্ষা এবং মৌলিক অধিকারগুলোকে হুমকির মুখে ফেলেছে। এ ছাড়া ইন্টারনেটের ব্যবহার সীমিত এবং অনলাইন সংবাদপত্র এবং সামাজিক মিডিয়া প্ল্যাটফরমগুলোকে অবরুদ্ধ করে রেখেছে। সম্প্রতি সেখানে নতুন একটি আইন জারি করা হয়েছে, যেখানে সামাজিকমাধ্যমে সরকারবিরোধী কোনো পোস্টে লাইক বা শেয়ার করা হলেও কারাদণ্ডের বিধান করা হয়েছে।
বিপর্যস্ত অর্থনীতি
গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে মিয়ানমারের সেনা সরকার ক্ষমতা দখলের পর প্রথম জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে। আগস্টে জরুরি অবস্থার মেয়াদ আরও ছয় মাস বাড়ানো হয়। জান্তার প্রধান অগ্রাধিকার যে কোনো মূল্যে ক্ষমতায় টিকে থাকা। ফলে বিপর্যস্ত অবস্থায় এখন দেশটির অর্থনীতি, যার মূল্য দিতে হচ্ছে জনগণকে। অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে সামরিক শাসন জারি হওয়ার পর দেশটির ওপর নেমে আসে পশ্চিমাদের অর্থনৈতিক অবরোধ। স্থগিত হয়ে যায় বৈদেশিক সহায়তা ও বিনিয়োগ। ফলে গত এপ্রিল থেকে কমতে থাকে দেশটির রিজার্ভ। অভ্যন্তরীণ সংকট ও ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বাড়তে থাকে নিত্যপণ্যের দাম। অন্যদিকে এনএলডি সরকারের সমর্থনে অহিংস আন্দোলনের অংশ হিসাবে অনেক মানুষ বিদ্যুৎ বিল দিচ্ছেন না, কেউ কর দিচ্ছেন না। এতে সরকারের রাজস্ব সংগ্রহ তলানিতে নেমেছে। গত এক বছরে দেশটির অর্থনীতি প্রায় ২০ শতাংশ সংকুচিত হয়েছে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) গত জানুয়ারিতে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২১ সালের শেষে দেশটির জনসংখ্যার অর্ধেক বা প্রায় আড়াই কোটি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে অবস্থান করছে, ১৬ লাখ জনবল বা মোট জনশক্তির প্রায় আট শতাংশ চাকরি হারিয়েছেন এবং প্রায় ১৩ লাখ মানুষ খাদ্য নিরাপত্তার ঝুঁকিতে রয়েছেন। অন্যদিকে বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ সংকটের পরিপ্রেক্ষিতে ডলারের বিপরীতে মিয়ানমারের মুদ্রা কিয়াটের মূল্য পতন বেড়েই চলেছে। ২০২১ সালের ১ ফেব্রুয়ারি প্রতি ডলারে পাওয়া যেত ১ হাজার ৩৯৫ কিয়াট, যা বর্তমানে ৪০ শতাংশের অধিক বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছে ২ হাজার ১১৩ কিয়াট। ব্রিটিশ ম্যাগাজিন ইকোনমিস্টের তথ্য অনুসারে, কিয়াটের পতন ঠেকাতে সেদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাদের রিজার্ভের ১০ শতাংশ বিক্রির সিদ্ধান্ত নেয়। এ অবস্থায় সামরিক জান্তা মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ ও আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপের মাধ্যমে রিজার্ভ ধরে রাখার চেষ্টা করছে। ফলে ওষুধের মতো প্রয়োজনীয় সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে জনগণ।
ক্ষয়িষ্ণু অবস্থায় জান্তার দাপট
মিয়ানমারের সামরিক জান্তা এখন সংখ্যালঘু বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর তীব্র প্রতিরোধের মুখোমুখি হচ্ছে। তাছাড়া সরকারকে প্রতিহত করতে জাতীয় ঐক্য সরকার (এনইউজি) নামে ছায়া সরকার গঠিত হয়েছে। ইতোমধ্যে ছায়া সরকার সমর্থন আদায়ের জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে আহ্বান জানিয়েছে, যাতে সাড়া দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও আসিয়ানের সদস্য রাষ্ট্রগুলো। তাছাড়া এনইউজি পিপল ডিফেন্স ফোর্স (পিডিএফ) নামে একটি গেরিলা বাহিনী গড়ে তোলে, যা বিক্ষোভকারীদের ওপর সামরিক বাহিনীর নৃশংস দমন-পীড়ন প্রতিরোধে গঠিত হয়েছে। ফলে সরকারকে একদিকে সীমান্ত প্রদেশগুলোয় বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে হচ্ছে, অন্যদিকে দেশের অভ্যন্তরে বিভিন্ন প্রদেশে গণতন্ত্রপন্থি পিডিএফ বাহিনীর মুখোমুখি হতে হচ্ছে। এ কারণে মিয়ানমারে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় সরকার গভীর সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে। অন্যদিকে, স্বৈরাচারী কৌশল এবং নৃশংস দমননীতির কারণে সামরিক জান্তা কূটনৈতিক দিক থেকে বিশ্বের অন্যান্য দেশের কাছে গ্রহণযোগ্যতা হারাচ্ছে। ফলে কূটনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামরিক-এ তিন ফ্রন্টেই তারা প্রায় পরাজিত হয়েছে।
মিয়ানমারে সক্রিয় বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলো আগের তুলনায় শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তারা এখন বেশ সফলতা পাচ্ছে এবং তাদের নিয়ন্ত্রিত এলাকাও বাড়ছে। বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর সশস্ত্র গ্রুপগুলো জান্তা হটাতে নিজেদের মধ্যে সহযোগিতা জোরদার করেছে। নিউজ ওয়েবসাইট দি ইরাওয়াদি জানিয়েছে, সহিংসতা বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে মিয়ানমারের শীর্ষ সাতটি সশস্ত্র জাতিগোষ্ঠীর সদস্যরা ওয়া রাজ্যের পাংসাংয়ে সেপ্টেম্বরে বৈঠকে বসেছে। একইসঙ্গে সামরিক শাসনবিরোধী মিয়ানমারের জনগণ বিভিন্ন বিদ্রোহী ও সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত হয়ে সরকারবিরোধী লড়াই করছে।
মিয়ানমারের স্পেশাল এডভাইসরি কাউন্সিলের বিবৃতি অনুযায়ী, দেশটির ৩৩০টি টাউনশিপের মধ্যে মাত্র ৭২টি এখন জান্তার দখলে রয়েছে; শতকরা হিসাবে যা মোট ভূখণ্ডের মাত্র ১৭ শতাংশ; ৫২ শতাংশ এনইউজি ও বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর অধীনে এবং বাকি অঞ্চলে কোনো দলেরই নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ নেই। তাছাড়া রাখাইনেও বেশ ধরাশায়ী অবস্থায় মিয়ানমার সেনাবাহিনী। রাখাইন রাজ্যের মোট ভূমির দুই-তৃতীয়াংশের বেশি অঞ্চল এখন আরাকান আর্মির দখলে রয়েছে। এনইউজির বিবৃতি অনুযায়ী, ৭ সেপ্টেম্বর, ২০২১ থেকে সেপ্টেম্বর ২০২২ পর্যন্ত সেনাবাহিনীর ২০,১৫০ জনেরও বেশি সৈন্য সংঘর্ষে নিহত হয়েছে। মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীতে বামার জাতিগোষ্ঠীর আধিপত্যই বেশি। কিন্তু সম্প্রতি বামার অধ্যুষিত অঞ্চলে সেনাবাহিনী পরিচালিত অভিযানে তাদের মধ্যে জান্তাবিরোধী মনোভাব তৈরি হয়েছে। পিপলস এমব্রেস গ্রুপ জানিয়েছে, অভ্যুত্থানের পর থেকে এখন পর্যন্ত ২ হাজারের বেশি সৈন্য এবং ৫ হাজার পুলিশ অফিসার পক্ষত্যাগ করেছে। প্রাণহানি ও সৈন্য হারানোর সঙ্গে সঙ্গে সেনাবাহিনী বেশ কয়েকটি সামরিক চৌকির নিয়ন্ত্রণও হারিয়েছে। গত ১৭ মাসে দেশটির বিভিন্ন নৃগোষ্ঠীর সশস্ত্র সংগঠনের কাছে প্রায় ৯০টি সামরিক চৌকির নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে মিয়ানমারের সামরিক জান্তা।
২০২১ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের পর মিয়ানমারের সর্বস্তরের মানুষ জান্তাবিরোধী আন্দোলনে শান্তিপূর্ণভাবে অংশগ্রহণ করে। কিন্তু মিন অং হ্লাইং প্রশাসনের পালটা নৃশংস দমন-নিপীড়নের কারণে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনটি সশস্ত্র প্রতিরোধে রূপ নেয়, যা এখনো অব্যাহত রয়েছে। সংঘাত ক্রমেই বেড়ে চলেছে। এর মধ্যে যুক্ত হয়েছে দেশটির অর্থনৈতিক সংকট এবং সীমান্ত এলাকায় জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিদ্রোহ। সব কিছু মিলে দেশজুড়ে বিরাজ করছে এক নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি। দিন যতই যাচ্ছে, মিয়ানমারের সার্বিক পরিস্থিতির সঙ্গে সঙ্গে জান্তার অবস্থানও দুর্বল হয়ে পড়ছে। এ অবস্থায় মিয়ানমারে শান্তি ফিরিয়ে আনতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের হস্তক্ষেপ জরুরি।
তন্ময় চৌধুরী : গবেষক ও লেখক
ctonmoy555@gmail.com


