বুধবার, ১ এপ্রিল ২০২৬
Single Top Banner

১১ বছরে ২ কিমি খনন, তবু আরও এক বছর বাড়ল বাড়ইপাড়া–কর্ণফুলী খাল খনন প্রকল্পের মেয়াদ

নিজস্ব প্রতিবেদক : 

নগরবাসীর দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ ‘জলাবদ্ধতা’ নিরসনে চট্টগ্রামের বহদ্দারহাট বাড়ইপাড়া থেকে কর্ণফুলী নদী পর্যন্ত নতুন খাল খনন প্রকল্পের মেয়াদ আরও এক বছর বাড়ানো হয়েছে। পাশাপাশি ব্যয় কমানো হয়েছে ১৯ কোটি ৪৩ লাখ টাকা। রবিবার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় প্রকল্পটির তৃতীয় দফা সংশোধন অনুমোদন পায়। নতুন হিসাব অনুযায়ী, প্রকল্পের মোট ব্যয় দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৩৪৩ কোটি টাকা। এর আগে ব্যয় ছিল ১ হাজার ৩৬২ কোটি টাকা।

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক) ২০১৪ সালে জলাবদ্ধতা নিরসনের লক্ষ্যে এ প্রকল্প হাতে নেয়। লক্ষ্য ছিল, প্রায় তিন কিলোমিটার দীর্ঘ একটি খাল খননের মাধ্যমে নগরীর গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোর পানি কর্ণফুলী নদীতে দ্রুত নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করা। কিন্তু সময় গড়িয়েছে, বেড়েছে ব্যয়—তবু কাজের অগ্রগতি ধীরগতির। ১১ বছরে দুই দশমিক নয় কিলোমিটার খালের মধ্যে খনন হয়েছে মাত্র দুই কিলোমিটার।

চসিকের নির্বাহী প্রকৌশলী ও প্রকল্প পরিচালক মো. ফরহাদুল আলম জানান, একনেক সভায় ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত মেয়াদ বৃদ্ধির পাশাপাশি ব্যয় কিছুটা কমানো হয়েছে। ভূমি অধিগ্রহণে ব্যয় হ্রাস পাওয়ায় মোট ব্যয় কমানো সম্ভব হয়েছে বলে জানান তিনি। প্রকল্পের প্রায় ৮০ শতাংশ কাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে বলে দাবি করেন এই কর্মকর্তা। তাঁর আশা, নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই পুরো প্রকল্প বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে। বাস্তবায়ন শেষ হলে প্রায় দুই হাজার ২৬৪ হেক্টর এলাকার পানি নিষ্কাশন হয়ে কর্ণফুলী নদীতে পৌঁছাবে।

প্রকল্পটির পেছনের ইতিহাস বেশ পুরোনো। ১৯৯৫ সালে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) যে ড্রেনেজ মাস্টারপ্ল্যান তৈরি করে, তাতে এই খাল খননের সুপারিশ ছিল। এরপর ২০১১ সালের শেষ দিকে চসিক প্রকল্প প্রস্তাবনা জমা দেয় স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে। একনেকে প্রকল্পটি প্রথম অনুমোদন পায় ২০১৪ সালের জুনে, ২৮৯ কোটি ৪৪ লাখ টাকা ব্যয়ে। তখন মেয়াদ নির্ধারণ ছিল ২০১৬ সালের জুন পর্যন্ত। কিন্তু শুরুতেই আটকে যায় জমি অধিগ্রহণ ও অর্থ বরাদ্দের জটিলতায়।

পরে ২০১৭ সালে পুনর্গঠন করে আবার অনুমোদন নেয়া হয়, ব্যয় বাড়ে লাফিয়ে—১ হাজার ২৫৬ কোটি টাকা। এরপর ২০২২ সালের সংশোধিত প্রস্তাবনায় ব্যয় গিয়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ৩৬২ কোটি ৬২ লাখ টাকায়। মেয়াদও বাড়িয়ে ২০২৪ সালের জুন করা হয়। কিন্তু সেসময়েও কাজ শেষ করতে পারেনি চসিক। শেষ পর্যন্ত চলতি বছরের একনেক সভায় প্রকল্প ব্যয় কমিয়ে এবং মেয়াদ বাড়িয়ে তৃতীয় দফায় অনুমোদন দেওয়া হলো।

চসিকের তথ্য অনুযায়ী, খালটি হবে ৬৫ ফুট প্রশস্ত। খালের দুই পাশে থাকবে ২০ ফুট চওড়া করে দুইটি সড়ক এবং ছয় ফুট প্রস্থের দুটি ওয়াকওয়ে। এ পর্যন্ত ১৫ দশমিক ১৬ একর ভূমি অধিগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে। সাড়ে পাঁচ কিলোমিটারের মধ্যে পাঁচ কিলোমিটার প্রতিরোধ দেয়াল, চার কিলোমিটার ড্রেন, নয়টি ব্রিজের মধ্যে ছয়টি, প্রায় চার কিলোমিটার সড়ক এবং দুই কিলোমিটার খাল খনন শেষ হয়েছে।

এই খালটি শুরু হবে বাড়ইপাড়া হাইজ্জারপুল থেকে, গিয়ে মিশবে কর্ণফুলী নদীতে। পথে পড়বে নূর নগর হাউজিং, ওয়াইজের পাড়া, বলিরহাটের বলি মসজিদের উত্তর পাশ। প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে অন্তত আটটি ওয়ার্ড—যেমন শুলকবহর, চান্দগাঁও, নাসিরাবাদ, মোহরা, ষোলশহর, বহদ্দারহাট, বাকলিয়া ও চাক্তাই এলাকার প্রায় ১০ লাখ মানুষ জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তি পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।

তবে বাস্তবচিত্র বলছে ভিন্ন কথা। প্রতিবছর বর্ষা এলেই চট্টগ্রাম নগরী রীতিমতো জলাবদ্ধতায় ভোগে। অল্প বৃষ্টিতেই ডুবে যায় সড়ক, গলি ও বাসাবাড়ি। জলাবদ্ধতা নিরসনে বরাদ্দ, প্রকল্প ও আশ্বাসের অভাব নেই—কিন্তু বাস্তবায়নের গতি প্রশ্নবিদ্ধ।

এ মুহূর্তে চট্টগ্রামে জলাবদ্ধতা নিরসনের জন্য ১৪ হাজার ৩৮৭ কোটি টাকার চারটি প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় প্রকল্প ‘চট্টগ্রাম শহরের জলাবদ্ধতা নিরসনকল্পে খাল পুনঃখনন, সম্প্রসারণ, সংস্কার ও উন্নয়ন’ প্রকল্প, যার ব্যয় ৮ হাজার ৬২৬ কোটি টাকা এবং বাস্তবায়ন করছে সেনাবাহিনী। পানি উন্নয়ন বোর্ড বাস্তবায়ন করছে ‘মহানগরের বন্যা নিয়ন্ত্রণ, জলমগ্নতা নিরসন ও নিষ্কাশন উন্নয়ন’ প্রকল্প, যার ব্যয় ১ হাজার ৬২০ কোটি ৭৩ লাখ টাকা। সিডিএ বাস্তবায়ন করছে আরও একটি প্রকল্প, যার আওতায় কালুঘাট সেতু থেকে চাক্তাই খাল পর্যন্ত সড়ক নির্মাণ করা হবে—ব্যয় ২ হাজার ২৪২ কোটি ৩৩ লাখ টাকা। এ ছাড়া চসিকের নিজস্ব উদ্যোগে চলমান বাড়ইপাড়া-কর্ণফুলী খাল খনন প্রকল্পে ব্যয় হচ্ছে ১ হাজার ৩৪৩ কোটি টাকা।

এ বিষয়ে চসিক মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, “আমরা চাই বর্ষার আগেই বাড়ইপাড়া থেকে কর্ণফুলী পর্যন্ত খাল খননের কাজ শেষ করতে। একই সঙ্গে নগরের ৩৬টি খাল সিডিএর প্রকল্পের আওতায় থাকলেও আরও ২১টি খাল আছে, যেগুলো আমরা চসিক থেকে পরিষ্কার করব। যাতে দ্রুত পানি নিষ্কাশন হয় এবং নগরবাসী জলাবদ্ধতা থেকে কিছুটা হলেও স্বস্তি পায়।”

তবে বাস্তবতা বলছে, প্রকল্প, বরাদ্দ আর পরিকল্পনার ফাঁদে পড়ে বছরের পর বছর নগরবাসীকে স্রেফ প্রতিশ্রুতির উপর ভর করে থাকতে হচ্ছে। খাল খননের অগ্রগতি আর জলাবদ্ধতা নিরসনের বাস্তব সুফল—দুটো কবে মিলবে, সেটিই এখন নগরবাসীর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

Single Sidebar Banner
  • সর্বশেষ
  • পঠিত