বন্দরনগরী চট্টগ্রাম থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে হাটহাজারীর উত্তর ফতেয়াবাদ নন্দীরহাট গ্রামটি লোকমুখে পরিচিত ‘মন্দিরের গ্রাম’ নামে। এ গ্রামেই অবস্থিত দেশের একুশে পদকপ্রাপ্ত খ্যাতিমান সংগীত পরিচালক ও সুরকার সত্য সাহার ঐতিহ্যবাহী জমিদারবাড়ি। যদিও দলিল-দস্তাবেজে এর নাম রয়েছে জমিদার লক্ষ্মীচরণ সাহার বাড়ি, তবে সত্য সাহার নামেই এটি অধিক পরিচিত। শত বছরের পুরোনো এই ঐতিহাসিক বাড়িটি বর্তমানে অবহেলা আর অযত্নে হারাতে বসেছে তার গৌরব ও ঐতিহ্য।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রায় পাঁচ একর জায়গার ওপর ১৮৯০ সালে জমিদার শ্রী লক্ষ্মীচরণ সাহা এই বাড়ি নির্মাণ করেছিলেন। দুই গম্বুজবিশিষ্ট এ জমিদারবাড়ি নির্মাণের মাধ্যমে নন্দীরহাটে জমিদারির সূচনা হয় লক্ষ্মীচরণ সাহা, মাদল সাহা ও নিশিকান্ত সাহার হাত ধরে। জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হওয়ার আগ পর্যন্ত বাড়িটির দেখাশোনা করেন লক্ষ্মীচরণ সাহার বড় ছেলে প্রসন্ন সাহা। ১৯৩৪ সালের ২৫ ডিসেম্বর এ জমিদার পরিবারেই জন্ম হয় বাংলা চলচ্চিত্র জগতের খ্যাতিমান সংগীত পরিচালক সত্য সাহার।
সত্য সাহার জীবনের শুরুর দিকের পড়াশোনা হয়েছিল নারায়ণগঞ্জ রামকৃষ্ণ স্কুলে, যেখানে তিনি ১৯৪৬-৪৮ সালে এসএসসি পাস করেন। পরে কলকাতার এক কলেজ থেকে ১৯৫১ ও ১৯৫২ সালে বিএ সম্পন্ন করেন। সাহা পরিবারে ছিল ১২ ভাই এবং তাদের জমিদারবাড়িতে কর্মচারী ছিল প্রায় ১০০ জন। জমিদারি আমলে বাড়িটির চারপাশজুড়ে নির্মিত হয়েছিল দৃষ্টিনন্দন দালানকোঠা, বাগানবাড়ি ও পূজামণ্ডপ। আজও সেই স্থাপত্যশৈলীর নিদর্শন মানুষকে আকৃষ্ট করে।

বাড়িটির চারদিকে রয়েছে বিস্তীর্ণ ফসলি জমি, গাছগাছালি ও তিনটি বড় পুকুর। রয়েছে দোতলা কাচারিঘর, বিগ্রহ মন্দির ও দুটি আবাসিক ভবন। কাঠের ছাদ আর কারুকাজ করা দেওয়াল-কর্ণিশ আজও এর ঐতিহ্যের সাক্ষী। তবে যথাযথ সংস্কার ও সংরক্ষণের অভাবে বাড়িটির কাঠামো দিন দিন জরাজীর্ণ হয়ে পড়ছে।
ঐতিহাসিক এই বাড়িটিতে একসময় সিনেমার শুটিংও হয়েছে। সত্য সাহার প্রযোজনায় ১৯৭৫ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত অশিক্ষিত চলচ্চিত্রের কিছু দৃশ্য ধারণ করা হয় এখানে। এর আগে ১৯৫৫ সালে সুতরাং সিনেমার শুটিংও এই বাড়িতেই হয়েছিল, যা মাত্র ১৮ দিনে শেষ করেছিলেন তিনি।
১৯৯৯ সালের ২৭ জানুয়ারি সত্য সাহা মৃত্যুবরণ করেন। বর্তমানে তার দুই ছেলে সুমন সাহা ও ইমন সাহা সংগীত জগতে কাজ করছেন। আর জমিদারবাড়িটি দেখাশোনা করছেন জমিদার বংশধর ননী গোপাল সাহা, সাবেক কাস্টমস কর্মকর্তা, এবং রাঙামাটি সরকারি কলেজের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক স্বপন কুমার সাহা।
স্থানীয়রা জানান, নন্দীরহাট গ্রামে ব্রিটিশ আমলে একাধিক জমিদার বসবাস করতেন। তাদের তৈরি বিভিন্ন মন্দির—রাধাকৃষ্ণ মন্দির, লক্ষ্মী মন্দির ও দুর্গা মন্দিরে আজও নানা অনুষ্ঠান হয়ে থাকে। সেই কারণেই এ গ্রামকে বলা হয় ‘মন্দিরের গ্রাম’। সপ্তদশ শতাব্দীতে সাহা বংশের জমিদারির গোড়াপত্তন হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়।
তবে জমিদারি প্রথা বিলুপ্তির পর থেকে বাড়িটির আগের জৌলুস আর নেই। স্থানীয়দের মতে, প্রয়োজনীয় সংস্কার ও সংরক্ষণ ছাড়া এ ঐতিহাসিক জমিদারবাড়িটি একসময় পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যাবে। আর তা হলে হারিয়ে যাবে শুধু একটি ঐতিহ্য নয়, বরং দেশের সংগীত ও সংস্কৃতির ইতিহাসের এক অমূল্য অংশ।


