শনিবার, ২ মে ২০২৬
Single Top Banner

অবহেলায় হারাতে বসেছে ঐতিহাসিক ‘হাতির বাংলো’

নাজিম উদ্দীন :

পাহাড়ঘেরা প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা প্রায় দেড়শ বছরের পুরোনো ঐতিহাসিক স্থাপনা ‘হাতির বাংলো’ আজ অবহেলা ও অযত্নে জীর্ণশীর্ণ হয়ে পড়েছে। নগরের ঐতিহ্য ও ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে পরিচিত এই স্থাপনাটি দ্রুত সংরক্ষণের দাবি জানিয়েছেন সচেতন মহল।

হাতির বাংলো চট্টগ্রামের একটি অনন্য স্থাপত্য নিদর্শন, যা অবিকল হাতির আদলে নির্মিত একটি ডুপ্লেক্স ভবন। প্রায় ১৩১ বছর আগে ব্রিটিশ শাসনামলে নির্মিত এই বাংলো শুধু একটি ভবন নয়, বরং নগরের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের জীবন্ত সাক্ষী।

ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, ১৮৯৩ সালে চট্টগ্রাম থেকে ফেনী পর্যন্ত রেলপথ নির্মাণকাজ শুরু হলে ব্রিটিশ প্রকৌশলী ব্রাউনজারের তত্ত্বাবধানে রেলওয়ে কর্মকর্তাদের আবাসন হিসেবে এই বাংলো নির্মাণ করা হয়। সে সময় এটি ব্রিটিশ প্রশাসনিক কার্যক্রম ও বিনোদনের কেন্দ্র হিসেবেও ব্যবহৃত হতো। দেশভাগের পর এটি স্থানীয় প্রশাসনের অধীনে আসে।

হাতির বাংলোর নামকরণ নিয়েও রয়েছে নানা লোককথা। জনশ্রুতি রয়েছে, একসময় এ এলাকায় ব্রিটিশদের হাতি প্রশিক্ষণের ঘাঁটি ছিল। হাতির ব্যাপক উপস্থিতির কারণে স্থানীয়দের মুখে মুখে এর নাম হয়ে ওঠে ‘হাতির বাংলো’।

স্থাপনাটির স্থাপত্যশৈলীতে ব্রিটিশ ও স্থানীয় নকশার চমৎকার সংমিশ্রণ দেখা যায়। লাল ইটের দেয়াল, উঁচু ছাদ, প্রশস্ত কক্ষ ও বড় বারান্দা এখনো সেই সময়ের নান্দনিকতার সাক্ষ্য বহন করছে। ভবনের সামনে ও পেছনে রয়েছে মোট ১২টি গোলাকৃতির জানালা। এছাড়া হাতির শুঁড়ের আদলে নির্মিত বারান্দার দু’পাশে রয়েছে গোলাকার ছিদ্র, যা দেখতে হাতির চোখের মতো।

ডুপ্লেক্স এই ভবনের নিচতলায় চারটি এবং ওপরতলায় একটি শয়নকক্ষ রয়েছে। উনিশ শতকের মাঝামাঝিতে ‘ফেরো’ সিমেন্ট দিয়ে নির্মিত হওয়ায় দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও কাঠামো এখনো বেশ মজবুত।

তবে বর্তমানে ভবনটির অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। দরজা-জানালার অধিকাংশই ভেঙে গেছে, লোহার অংশে মরিচা ধরেছে। দেয়ালে শ্যাওলা জমেছে, পলেস্তারা খসে পড়ছে। চারপাশে ময়লা-আবর্জনা ও শুকনো পাতায় ভরে গেছে পরিবেশ। বর্তমানে একজন রেলওয়ে কর্মচারী ভবনের একটি কক্ষে বসবাস করছেন।

অবহেলার মধ্যেও প্রতিদিন বিকেলে অনেক দর্শনার্থী এখানে ভিড় করেন। ছবি তোলা, ঘোরাঘুরির পাশাপাশি বিভিন্ন শর্টফিল্মের শুটিংয়ের জন্যও স্থানটি ব্যবহৃত হচ্ছে। বিশেষ করে বর্ষাকালে এর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আরও বৃদ্ধি পায়, যা পর্যটকদের আকৃষ্ট করে।
স্থানীয়দের মতে, যথাযথ সংরক্ষণ ও সংস্কার করা হলে এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটি দেশি-বিদেশি পর্যটকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ আকর্ষণে পরিণত হতে পারে।

সচেতন মহল বলছেন, চট্টগ্রামের সমৃদ্ধ ইতিহাসের অংশ এই হাতির বাংলো সংরক্ষণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জরুরি উদ্যোগ প্রয়োজন। তা না হলে অচিরেই হারিয়ে যেতে পারে এই অনন্য ঐতিহ্য।

Single Sidebar Banner
  • সর্বশেষ
  • পঠিত