চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার হাসিব আজিজ জানিয়েছেন, পুলিশের কোনো টহল দল বা অভিযানে অংশ নেওয়া সদস্যদের সামনে কেউ অস্ত্র বের করলে—তা ধারালো অস্ত্র হোক বা আগ্নেয়াস্ত্র—আত্মরক্ষার্থে দেখামাত্র গুলির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। চট্টগ্রাম নগরীর ঈশান মিস্ত্রির ঘাট এলাকায় দুর্বৃত্তদের হামলায় পুলিশের উপপরিদর্শক (এসআই) আবু সাঈদ ওরফে রানা গুরুতর আহত হওয়ার পর মঙ্গলবার দিবাগত রাতে ওয়্যারলেস বার্তায় সিএমপির সব সদস্যদের উদ্দেশে তিনি এই মৌখিক নির্দেশ জারি করেন।

ঘটনার সূত্রপাত সোমবার দিবাগত রাতে। তথ্য পাওয়া যায়, চট্টগ্রাম নগরীর বন্দর থানার সল্টগোলা এলাকায় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা হঠাৎ ঝটিকা মিছিল বের করেছে। খবর পেয়ে এসআই রানা ও আরও দুই পুলিশ সদস্য ঘটনাস্থলে অভিযানে যান। একটি বাসায় তল্লাশি চালানোর সময় দুর্বৃত্তরা অতর্কিতভাবে ধারালো অস্ত্র দিয়ে তাদের ওপর হামলা চালায়। এসময় রানার মাথায় কিরিচের আঘাত লেগে গুরুতর জখম হয় এবং তিনি রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। পরে তাকে দ্রুত উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠানো হয়।
এ ঘটনার পর যৌথবাহিনী রাতেই অভিযান চালিয়ে ওই এলাকা থেকে কিরিচ, ছুরি ও অন্যান্য ধারালো অস্ত্রসহ মোট ১৯ জনকে গ্রেপ্তার করে। ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করা অস্ত্রগুলো আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হেফাজতে নেওয়া হয়।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন এসআই রানা এখন শঙ্কামুক্ত বলে জানিয়েছেন সিএমপির বন্দর জোনের উপকমিশনার (ডিসি) মো. আমিরুল ইসলাম। তিনি বলেন, “তার মাথায় গুরুতর আঘাত লেগেছে, তবে ভাগ্যক্রমে তিনি বেঁচে গেছেন। সিটি স্ক্যান রিপোর্টে বড় কোনো জটিলতা পাওয়া যায়নি, তবে তাকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে এবং চিকিৎসার জন্য সব ধরনের সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।”
পুলিশের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গত বছরের ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় দেশজুড়ে পুলিশের ওপর ব্যাপক আক্রমণ হয়। আন্দোলনের সময় পুলিশ নির্বিচারে গুলি চালানোর অভিযোগ ওঠে, যাতে বহু মানুষ নিহত হন। এর জেরে ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এবং দেশজুড়ে থানা, ফাঁড়ি, পুলিশের যানবাহন ভাঙচুর, অস্ত্র ও গুলি লুট হয়। সে সময় ৪৪ জন পুলিশ সদস্য প্রাণ হারান। এসব ঘটনার পর পুলিশের মনোবল ভেঙে পড়ে এবং সদস্যরা দীর্ঘ সময় সক্রিয় হতে সাহস পাননি। অনেকে অস্ত্র বহন করতেও অনিচ্ছুক হয়ে পড়েন। যদিও বর্তমানে পুলিশিং স্বাভাবিক হলেও হামলার ঝুঁকি সবসময় রয়ে গেছে।
এই প্রেক্ষাপটে কমিশনার হাসিব আজিজ তার নির্দেশনায় বলেন, “২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে যে অস্ত্র বহনের প্রাধিকার ছিল, সেই নিয়ম এখন থেকে পুনরায় কার্যকর করা হবে। থানার মোবাইল পার্টি, পেট্রোল পার্টি, ডিবি টিম, চেকপোস্ট টিম—সবাই আগ্নেয়াস্ত্র ও লাইভ এমুনিশন নিয়ে ডিউটিতে যাবে। শুধুমাত্র রাবার বুলেট দিয়ে কাজ হচ্ছে না। বন্দরে একজন এসআই গুরুতর আহত হয়েছেন, আরেকদিন আরও বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। তাই আত্মরক্ষার জন্য যে কোনো পরিস্থিতিতে লাইভ এমুনিশন ব্যবহার করতে হবে।”
তিনি আরও বলেন, “পুলিশের কোনো টহল পার্টির সামনে যদি কেউ অস্ত্র বের করে, সেটা ধারালো হোক বা আগ্নেয়াস্ত্র—অস্ত্র বের করার মুহূর্তেই গুলি চালাতে হবে, এতে কোনো দ্বিধা নেই। আত্মরক্ষার ব্যক্তিগত অধিকার দণ্ডবিধি ৯৬ থেকে ১০৬ ধারায় স্পষ্টভাবে দেওয়া আছে। সরকারি গুলির সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।”
পুলিশ সূত্র জানিয়েছে, হামলার সময় এসআই রানার সঙ্গে থাকা দুই কনস্টেবল শটগান বহন করলেও তারা গুলি চালাননি। এ কারণে কমিশনার তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করার নির্দেশ দিয়েছেন। এই বিষয়ে কমিশনার বলেন, “আমার অফিসারের মাথা প্রায় দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেত, আল্লাহ তাকে বাঁচিয়েছেন। পেনাল কোড অনুযায়ী আমার ফোর্স আত্মরক্ষায় যা প্রয়োজন করবে। কেউ কোপ খাওয়ার জন্য দাঁড়িয়ে থাকবে না।”
নির্দেশনার পর পুলিশ সদস্যদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন সদস্য জানান, গুলি চালানোর নির্দেশ থাকলেও অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু ঘটলে পরবর্তীতে সেই পুলিশ সদস্যকে নানা আইনি জটিলতার মুখোমুখি হতে হয়। অভিযানে গেলে দলগত জনতার হামলার সম্ভাবনাও থাকে। তাই পরিস্থিতি বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি। তবুও কমিশনারের বার্তা স্পষ্ট—আত্মরক্ষার প্রয়োজনে সর্বোচ্চ শক্তি প্রয়োগে দ্বিধা করা যাবে না।


