কিডনি রোগ মোকাবিলায় শুধু ডায়ালাইসিস মেশিন বাড়ানো বা নতুন হাসপাতাল নির্মাণই যথেষ্ট নয়; রোগ প্রতিরোধে ব্যাপক জনসচেতনতা সৃষ্টি, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতকরণ, ভেজাল ওষুধ নিয়ন্ত্রণ এবং স্বাস্থ্যসম্মত জীবনযাপনের বিকল্প নেই বলে মন্তব্য করেছেন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা। তিনি বলেছেন, কিডনি রোগ এখন শুধু একটি স্বাস্থ্য সমস্যা নয়, এটি দেশের মানবসম্পদ, অর্থনীতি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ক্রমবর্ধমান হুমকিতে পরিণত হচ্ছে। তাই প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।
রবিবার (৭ জুন) চট্টগ্রাম সার্কিট হাউস সম্মেলন কক্ষে জেলা প্রশাসন, চট্টগ্রাম এবং সিভিল সার্জনের কার্যালয়ের উদ্যোগে আয়োজিত ‘কিডনি রোগ প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিষয়ক সচেতনতামূলক সেমিনার’-এ সভাপতির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
অনুষ্ঠানের শুরুতে স্বাগত বক্তব্য দেন চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলম। তিনি বলেন, দেশে অসংক্রামক রোগগুলোর মধ্যে কিডনি রোগ অন্যতম বড় স্বাস্থ্যঝুঁকি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। সময়মতো রোগ শনাক্তকরণ এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে এ সংকট অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব।
পরে ডেপুটি সিভিল সার্জন কিডনি রোগের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। সেখানে জানানো হয়, দেশের প্রাপ্তবয়স্ক জনগোষ্ঠীর প্রায় ১৬ থেকে ২২ দশমিক ৫ শতাংশ মানুষ কোনো না কোনোভাবে কিডনি রোগে আক্রান্ত। বর্তমানে দেশে প্রায় দুই কোটি মানুষ কিডনি রোগে ভুগছেন এবং প্রতি বছর ৩৫ থেকে ৪০ হাজার রোগী কিডনি বিকলের শেষ পর্যায়ে পৌঁছান।
উপস্থাপনায় আরও জানানো হয়, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, অনিয়ন্ত্রিত ওষুধ সেবন, কিডনির প্রদাহ, সংক্রমণ এবং অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপন কিডনি রোগ বৃদ্ধির প্রধান কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম।
সভাপতির বক্তব্যে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, চট্টগ্রামে যোগদানের পর থেকেই কিডনি রোগ-সংক্রান্ত অসংখ্য আবেদন, অভিযোগ ও মানবিক সংকটের ঘটনা তার সামনে এসেছে। বিষয়টি তাকে গভীরভাবে ভাবিয়েছে এবং তিনি নিজেও এ নিয়ে অধ্যয়ন করেছেন।
তিনি বলেন, “আমি জেলা প্রশাসক সম্মেলনে বিষয়টি উত্থাপন করেছি এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে লিখিতভাবে জানিয়েছি যে কিডনি রোগ আগামী দিনে একটি বড় জাতীয় হুমকিতে পরিণত হতে পারে।”
তিনি বলেন, “১৯৯০ সালে কিডনি রোগে মৃত্যুঝুঁকির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল বিশ্বে ১৯তম। বর্তমানে তা সপ্তম স্থানে উঠে এসেছে। কিন্তু এরপরও আমাদের বিবেকের চোখ পুরোপুরি খুলেনি।”
ডিসি জাহিদ বলেন, “আমরা ভেজাল খাদ্য, ফলে রং মেশানো কিংবা দুধে পানি মেশানোর বিষয়ে কথা বলি। কিন্তু সংকটের সময়ে মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ও সমাজের জন্য বড় হুমকি। মাইলস্টোন স্কুলের বিমান দুর্ঘটনার দিন আহত মানুষের দুর্ভোগ দেখে আমি উপলব্ধি করেছি, শুধু অবকাঠামো নয়, আমাদের সামাজিক সচেতনতাও বাড়াতে হবে।”
তিনি বলেন, “আজ আমরা এখানে হয়তো সব সমস্যার সমাধান করতে পারব না। কিন্তু সমাধানের পথ খুঁজে বের করার দৃঢ় প্রত্যয় নিয়েই একত্রিত হয়েছি। শুধু আরও হাসপাতাল নির্মাণ বা আরও ডায়ালাইসিস মেশিন স্থাপন করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। কিডনি রোগে আক্রান্ত মানুষের কষ্ট কমাতে হলে প্রতিরোধ ও সচেতনতাকেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।”
জেলা প্রশাসক বলেন, কিডনি রোগের সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো, কিডনির প্রায় ৫০ শতাংশ ক্ষতি না হওয়া পর্যন্ত অনেক মানুষ বুঝতেই পারেন না যে তিনি আক্রান্ত হয়েছেন। ফলে রোগ শনাক্ত হওয়ার আগেই অনেক ক্ষেত্রে পরিস্থিতি জটিল হয়ে যায়।
তিনি বলেন, “আমরা সবাই জীবনের নানা লক্ষ্য অর্জনের প্রতিযোগিতায় ব্যস্ত। কিন্তু কখন কোন রোগ আমাদের আঘাত করবে, সে বিষয়ে আমাদের প্রস্তুতি প্রায় নেই। তাই নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং সচেতনতা অত্যন্ত জরুরি।”
ডিসি জাহিদ বলেন, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, ভেজাল খাদ্য, মাদকাসক্তি এবং নকল ওষুধ কিডনি রোগের অন্যতম কারণ। বিশেষ করে নকল ওষুধের বিষয়টি অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
তিনি জানান, ভেজাল ওষুধ ও স্বাস্থ্যঝুঁকিপূর্ণ পণ্যের বিরুদ্ধে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হবে।
তিনি আরও বলেন, “আমরা একটি কার্যকর কমিটি গঠন করব। প্রশাসন, চিকিৎসক, গণমাধ্যম, নাগরিক সমাজ এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের নিয়ে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে। আমরা পৃথিবীতে কেউ চিরদিন থাকব না, কিন্তু আগামী প্রজন্মের জন্য একটি সুস্থ সমাজ রেখে যেতে চাই।”
কিডনি রোগীদের দুর্ভোগের প্রসঙ্গ তুলে ধরে জেলা প্রশাসক বলেন, “একজন কিডনি রোগী একটি কিডনির জন্য চাতক পাখির মতো অপেক্ষা করেন। একটি কিডনি পেলে হয়তো তিনি বেঁচে যেতে পারেন। কিন্তু অনেক সময় সেই সুযোগ তিনি পান না। একজন মানুষের বেঁচে থাকার আকুতি আমাকে গভীরভাবে নাড়া দেয়।”
তিনি বলেন, “একজন মানুষ যখন নিয়মিত ডায়ালাইসিসের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন, তখন শুধু তিনি নন, পুরো পরিবারই অনিশ্চয়তা ও সংকটের মধ্যে পড়ে যায়। যদি দেশে প্রায় দুই কোটি মানুষ কিডনি রোগে আক্রান্ত হয়ে থাকে, তাহলে দুই কোটি পরিবারের স্বপ্নও এই চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে।”
জেলা প্রশাসক বলেন, “এত বিপুলসংখ্যক পরিবারকে সংকটে রেখে আমরা একটি শক্তিশালী ও সমৃদ্ধ জাতি হিসেবে খুব বেশি দূর এগোতে পারব না। তাই আমাদের ভাবতে হবে—এই পরিস্থিতি থেকে কীভাবে বের হয়ে আসা যায়।”
তিনি বিশেষভাবে নারীস্বাস্থ্যের প্রসঙ্গ তুলে ধরে বলেন, তার কাছে আসা কিডনি রোগীদের বড় একটি অংশ নারী। অনেক নারী পর্যাপ্ত পানি পান করেন না কিংবা দীর্ঘ সময় প্রস্রাব চেপে রাখেন, কারণ নিরাপদ ও ব্যবহারযোগ্য শৌচাগারের অভাব রয়েছে।
তিনি প্রশ্ন রাখেন, “ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত মহাসড়কে কি পর্যাপ্ত মানসম্পন্ন ওয়াশ ব্লক রয়েছে? আমাদের শহরগুলোতে কি নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত গণশৌচাগারের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা আছে?”
তিনি জানান, চট্টগ্রাম জেলার মধ্যে মানসম্মত ওয়াশ ব্লক, গণশৌচাগার এবং স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন ব্যবস্থার উন্নয়নে জেলা প্রশাসন গুরুত্বের সঙ্গে কাজ করবে।
সেমিনারে কিডনি রোগের কারণ, প্রতিরোধ ও চিকিৎসা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের কিডনি রোগ বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. নুরুল হুদা। তিনি বলেন, কিডনি রোগের অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব।
তিনি প্রত্যেক নাগরিককে বছরে অন্তত দুইবার রক্ত ও প্রস্রাবের সাধারণ পরীক্ষা করানোর আহ্বান জানান এবং গণমাধ্যমে ব্যাপক সচেতনতামূলক প্রচারণা চালানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
আলোচনায় অংশ নিয়ে অধ্যাপক ইমরান বিন ইউসুফ, অধ্যাপক প্রবীর কুমার দত্ত, অধ্যাপক এম এ কাশেমসহ অন্যান্য বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নিরাপদ খাদ্য গ্রহণ, পর্যাপ্ত বিশুদ্ধ পানি পান, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং জীবনযাত্রায় ইতিবাচক পরিবর্তনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
সচেতনতা কার্যক্রমকে আরও কার্যকর করার লক্ষ্যে একটি সমন্বিত কোর কমিটি গঠনের প্রস্তাব দেন অধ্যাপক মইনুল ইসলাম মাহমুদ এবং চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার এ বি সিদ্দিক। তারা প্রশাসন, স্বাস্থ্য বিভাগ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, গণমাধ্যম এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের সম্পৃক্ত করে একটি স্থায়ী সচেতনতামূলক প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলার আহ্বান জানান।
এ বি সিদ্দিক বলেন, “সচেতনতার সূচনা হোক নিজের ঘর থেকে। নিরাপদ পানি ব্যবহার এবং নিয়মিত পানির ট্যাংক পরিষ্কার রাখার মতো ছোট ছোট অভ্যাসও অনেক রোগ প্রতিরোধে ভূমিকা রাখতে পারে।”
চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের সভাপতি জাহিদুল ইসলাম কচি এবং দৈনিক আজাদীর সম্পাদক মোহাম্মদ আবদুল মালেক গণমাধ্যমের মাধ্যমে কিডনি রোগ প্রতিরোধে ধারাবাহিক সচেতনতামূলক প্রচারণা চালানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
সেমিনারে উপস্থাপিত তথ্যে জানানো হয়, বৃহত্তর চট্টগ্রাম অঞ্চলে প্রতিবছর প্রায় এক লাখ নতুন কিডনি রোগী শনাক্ত হচ্ছেন। অথচ চিকিৎসা অবকাঠামো, ডায়ালাইসিস সুবিধা এবং বিশেষজ্ঞ সেবার ক্ষেত্রে এখনও উল্লেখযোগ্য ঘাটতি রয়েছে।
অনুষ্ঠানে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক), স্বাস্থ্য বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, কিডনি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি এবং কিডনি রোগীরা অংশগ্রহণ করেন।
বক্তারা আশাবাদ ব্যক্ত করেন, চট্টগ্রাম থেকে শুরু হওয়া এই উদ্যোগ ভবিষ্যতে কিডনি রোগ প্রতিরোধে একটি সমন্বিত সামাজিক আন্দোলনে রূপ নেবে।
সেমিনার থেকে একটি বার্তাই স্পষ্ট হয়ে ওঠে— “কিডনি রোগ প্রতিরোধ সম্ভব; সচেতনতাই হতে পারে সবচেয়ে বড় ওষুধ।”


