নিজস্ব প্রতিবেদক :
চট্টগ্রামে জুলাই আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের ওপর সশস্ত্র হামলায় জড়িত অন্তত ৪৬ জন অস্ত্রধারীকে শনাক্ত করেছে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি)। গত বছরের ৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের পর সিএমপির ক্রাইম ডিভিশন এদের চিহ্নিত করে। এর মধ্যে র্যাব ও পুলিশের বিভিন্ন অভিযানে এখন পর্যন্ত ১৯ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তবে বাকিরা এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অস্ত্রধারীদের কাছ থেকে দুটি বিদেশি পিস্তল ছাড়া অন্য কোনো অস্ত্র উদ্ধার করতে পারেনি।
এছাড়া আন্দোলন চলাকালে চট্টগ্রাম মহানগরের আটটি থানা থেকে বিপুল পরিমাণ আগ্নেয়াস্ত্র লুট করে দুর্বৃত্তরা। পুলিশের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, মোট ৮১৫টি অস্ত্র লুট হয়, যার মধ্যে ৬১৭টি অস্ত্র এবং ৫৬,৮৫৮ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। এখনও পর্যন্ত ১৯৮টি অস্ত্র এবং প্রায় ২৫,০০০ রাউন্ড গুলি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে পৌঁছেনি। শুধু আকবরশাহ থানা থেকেই লুট হয়েছিল ৮টি পিস্তল, ২টি চায়নিজ রাইফেল, ৩টি এসএমজি, ৬টি শটগান ও আরও বেশ কিছু অস্ত্র ও গুলি। এসবের মধ্যে মাত্র একটি অস্ত্র উদ্ধার হয়েছে। পাহাড়তলী, ডবলমুরিং, চান্দগাঁও, বাকলিয়া, হালিশহর, পাঁচলাইশ ও কোতোয়ালি থানাতেও একাধিক আগ্নেয়াস্ত্র লুট হয়, যার বড় অংশ এখনো নিখোঁজ। অস্ত্র উদ্ধারে পুলিশি তৎপরতা অব্যাহত থাকলেও পুরোপুরি সফলতা আসেনি।

সিএমপি কমিশনার হাসিব আজিজ জানান, বেশ কয়েকজন দুর্ধর্ষ অস্ত্রধারী গ্রেফতার হয়েছে এবং বাকিদের গ্রেফতারেও অভিযান অব্যাহত রয়েছে। অনেকে শহর ছেড়ে আত্মগোপনে থাকলেও পুলিশ তাদের বিভিন্ন জায়গা থেকে ধরে আনছে।
সূত্র জানায়, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় নগরীর ষোলশহর, মুরাদপুর, বহদ্দারহাট ও নিউমার্কেট এলাকায় ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের নেতাকর্মীদের আগ্নেয়াস্ত্র হাতে ছাত্র-জনতার ওপর গুলি করতে দেখা যায়। সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত ছবি-ভিডিও বিশ্লেষণ করে ৪৬ জনের পরিচয় নিশ্চিত করে সিএমপি।
গত বছরের ১৬ জুলাই মুরাদপুরে গুলি চালিয়েছিলেন যুবলীগ নেতা মো. ফিরোজ, স্বেচ্ছাসেবক লীগের মো. দেলোয়ার, ছাত্রলীগকর্মী এনএইচ মিঠু, হাবিবুর রহমান আহনাফ ও যুবলীগকর্মী মো. জাফর। তাদের মধ্যে ফিরোজ ও আহনাফ গ্রেফতার হয়েছেন। ১৮ জুলাই বহদ্দারহাট এলাকায় গুলি চালান মহিউদ্দিন ফরহাদ, ড্রিল জালাল, তৌহিদুল ইসলাম ফরিদ, ঋভু মজুমদার ও মো. জামাল। তৌহিদ, ঋভু ও জামাল পরে গ্রেফতার হন।
এছাড়া আগ্নেয়াস্ত্র হাতে মহড়া দেওয়া অন্যান্যদের মধ্যে রয়েছে স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা মহিউদ্দিন মাহমুদ, কর্মী মো. দেলোয়ার, যুবলীগ নেতা মো. ফরিদ, ছাত্রলীগ নেতা মো. তাহসিন, যুবলীগ নেতা মো. জাফর, এইচএম মিঠু ও সোলেমান বাদশা।
২২ নভেম্বর সাতক্ষীরার কমলনগর থেকে তৌহিদুল ইসলাম ওরফে ফরিদকে গ্রেফতার করে চান্দগাঁও থানা-পুলিশ। ফরিদ স্বীকার করেছে, সে আন্দোলনের সময় শাটারগান দিয়ে ২৮ রাউন্ড গুলি ছুড়েছিল। তবে তার অস্ত্রটি উদ্ধার হয়নি। র্যাব গ্রেফতার করেছিল ফিরোজ, মো. মিজান, মো. ফয়সাল ও বাদশাকে। খুলশী থানা পুলিশ গ্রেফতার করেছিল ছাত্রলীগের হাবিবুর রহমানকে।
সিএমপির এডিসি (পিআর) মাহমুদা বেগম জানান, অস্ত্রধারীদের মধ্যে কোতোয়ালি থানার মামলায় ২৭ জন, পাঁচলাইশে ৪ জন, চান্দগাঁওয়ে ৬ জন, ডবলমুরিংয়ে ৬ জন ও হালিশহরে ৩ জন রয়েছেন। এখন পর্যন্ত ১৯ জন গ্রেফতার এবং ২টি বিদেশি পিস্তল উদ্ধার হয়েছে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মশিউর রহমান সোহাগ বলেন, ১৬ জুলাই মিছিল শুরুর আগেই ছাত্রলীগ কর্মীরা ইটপাটকেল ছোড়ে। পরে দেশীয় অস্ত্র ও পিস্তল নিয়ে হামলা করে। সেই হামলায় ওয়াসিম, শান্ত ও ফারুক শহীদ হন। তিনিও ছররা গুলিতে আহত হন।
তিনি আরও বলেন, ১৫ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত আওয়ামী লীগের নির্দেশে তাদের পেটোয়া বাহিনী একের পর এক হামলা চালায়। ১৮ জুলাই গুলিতে আহত হৃদয় চন্দ্র বড়ুয়া পরে ২৩ জুলাই মারা যান। হামলাকারীরা এখনও গ্রেফতার হয়নি, অস্ত্রও উদ্ধার হয়নি। তিনি অভিযোগ করেন, এই জায়গায় ইন্টারিম সরকার সম্পূর্ণ ব্যর্থ।
সিএমপি সূত্র জানায়, আন্দোলনকারীদের ওপর হামলার ঘটনায় ৮টি থানায় ৬৩টি মামলা হয়েছে, যার মধ্যে ১৪টি হত্যা মামলা। ৬,৬৯৪ জন এজাহারনামীয় ও ১৩,৫৯০ জন অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে। এখন পর্যন্ত ১৪৬ জন এজাহারনামীয় ও ৮৩৭ জন তদন্তে প্রাপ্ত আসামিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তবে কোনো মামলায় চার্জশিট হয়নি, একটি মামলায় কেবল ফাইনাল রিপোর্ট দেওয়া হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, অনেক নিরপরাধ ব্যক্তি রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত প্রতিহিংসার শিকার হয়ে আসামি হয়েছেন।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) চট্টগ্রামের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আখতার কবির চৌধুরী বলেন, হামলাকারীরা গ্রেফতার না হওয়ায় জনমনে আতঙ্ক রয়েছে। লুট হওয়া অস্ত্রধারীরা এখনো প্রকাশ্যে ঘুরছে। পুলিশের উচিত আরও আন্তরিকভাবে কাজ করা।


