৩ আগস্ট কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারের গণজমায়েতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-আন্দোলনের সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম ঘোষণা করেন, শেখ হাসিনার পদত্যাগের এক দফা দাবিতে ৬ আগস্ট ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি পালিত হবে। সেই সঙ্গে আন্দোলনকারীরা সরকারের প্রতি দুইদিনের আল্টিমেটাম (৪ ও ৫ আগস্ট) ঘোষণা করে জানিয়ে দেয়, দাবি না মানা হলে ৬ আগস্ট সারা দেশ থেকে ঢাকামুখী যাত্রা শুরু হবে।
কিন্তু ৪ আগস্ট দেশের বিভিন্ন স্থানে এবং রাজধানীতে ভয়াবহ সংঘর্ষ ঘটে। প্রাণহানির ঘটনাও ঘটে। ছাত্র-জনতার আন্দোলন নতুন মাত্রা পায়। অনেক এলাকায় সেনাবাহিনীর সদস্যরা ছাত্র-জনতার পাশে অবস্থান নেয়। এর ফলে পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যেতে থাকে। ঠিক এই সন্ধিক্ষণে রাত ৮টার দিকে আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক আসিফ মাহমুদ এক ভিডিও বার্তায় ঘোষণা দেন— কর্মসূচি একদিন এগিয়ে আনা হয়েছে, অর্থাৎ ‘মার্চ টু ঢাকা’ হবে ৫ আগস্ট। তিনি বলেন, “জরুরি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ‘লং মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি একদিন এগিয়ে এনে আগামীকাল ৫ আগস্ট পালন করা হবে। মুক্তিকামী জনগণকে ঢাকার পথে রওনা হওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি। আমরা শাহবাগে জড়ো হয়ে গণভবনের দিকে যাত্রা করব। চূড়ান্ত বিজয় খুবই কাছে চলে এসেছে।”
আসিফ মাহমুদের এই ঘোষণার পর বিভিন্ন মহলে আলোচনা শুরু হয়— আন্দোলনের নেতৃত্বে কি দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে? কেউ কেউ বলেছিলেন, ভিডিওটি ভুয়া এবং আন্দোলনের মধ্যে বিভাজন তৈরি হয়েছে। এমনও বলা হতে থাকে, একদল সরকারের সঙ্গে সমঝোতায় গেছে। কিন্তু কিছু সময় পর আন্দোলনের অন্য দুই সমন্বয়ক সারজিস আলম ও হাসনাত আবদুল্লাহও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একই ঘোষণা দেন— ‘লং মার্চ টু ঢাকা’ একদিন এগিয়ে ৫ আগস্টেই পালিত হবে। এই ঘোষণার মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয়ে যায়, এটি নেতৃত্বের ঐকমত্য থেকেই নেওয়া সিদ্ধান্ত।
এরই মধ্যে সেনাবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তারা বিবৃতি দিয়ে সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের আহ্বান জানান, তারা যেন ছাত্র-জনতার মুখোমুখি না হয়। একইসঙ্গে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ফলকার তুর্ক বাংলাদেশের চলমান সহিংসতা বন্ধে আহ্বান জানান এবং সেনাপ্রধান বরাবর একটি চিঠিও পাঠান।
‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি একদিন এগিয়ে আনার পেছনের কারণ নিয়ে তখন নানা প্রশ্ন দেখা দিলেও, বাস্তবতা হলো— সরকারের পরিকল্পনা বুঝতে পেরেই এটি করা হয়েছিল। গত ৩ আগস্ট যখন ৬ আগস্ট কর্মসূচির ঘোষণা আসে, তখন থেকেই সরকার তড়িঘড়ি করে প্রতিরোধের নকশা তৈরি করে। প্রতিটি জেলা থেকে পুলিশ ঢাকায় আনার সিদ্ধান্ত হয়। র্যাব, পুলিশ, বিজিবি, আনসার ও সেনাবাহিনীর দায়িত্ব বণ্টন করা হয়। এমনকি আকাশপথে নজরদারির পরিকল্পনাও নেওয়া হয়। আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, যুবলীগের নেতাকর্মীদের ঢাকায় এনে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তায় আন্দোলন দমন করার পরিকল্পনা হয়।
এই গোটা পরিকল্পনা সরকারের ভেতরে থাকা কিছু বিরোধী কর্মকর্তা আন্দোলনের নেতৃত্বকে জানিয়ে দেন। আন্দোলনকারীরা বুঝতে পারেন, ৫ আগস্ট ঢাকামুখী যাত্রা শুরু না করলে সরকার ঢাকামুখী রাস্তা বন্ধ করে দিতে পারে, যানবাহন চলাচল বন্ধ করে দিতে পারে। এমনকি শহরে ঢোকার আগেই গণগ্রেপ্তার শুরু করতে পারে। ফলে ৩ আগস্ট রাত থেকেই শিক্ষার্থীরা ঢাকায় প্রবেশ শুরু করে। ৪ আগস্ট সন্ধ্যার আগেই বেশিরভাগ আন্দোলনকারী ঢাকায় পৌঁছে যায় অথবা ঢাকার প্রবেশপথে অবস্থান নেয়। নেতৃত্ব যখন দেখে যে প্রয়োজনীয় জনসমাগম এবং প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে, তখনই একদিন এগিয়ে ‘মার্চ টু ঢাকা’ ৫ আগস্ট করার চূড়ান্ত ঘোষণা আসে।
এই ঘোষণাকে ঘিরে ছড়ানো বিভ্রান্তির পেছনে ছিল সরকারের গোয়েন্দা সংস্থার পরিকল্পনা। তৎকালীন সমন্বয়ক সারজিস আলম বলেন, “গোয়েন্দারা ইচ্ছাকৃতভাবে ‘বিভক্তি’ প্রচার করে। তারা সমন্বয়কদের নাম ব্যবহার করে বিভ্রান্তিমূলক বার্তা ছড়ায়, যাতে আন্দোলনের ভেতর বিভ্রান্তি তৈরি হয়। কিছু সাংবাদিকও এর সঙ্গে যুক্ত ছিল, যারা সবসময় সরকারপন্থী ছিলেন।”
৫ আগস্ট সকাল ১০টার দিকে খবর আসে শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে ভারতে পালিয়েছে। এরপর দুপুর ১টার দিকে ঘোষণা আসে, সেনাপ্রধান জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেবেন। এতে অনেকের ধারণা হয়, ২০০৭ সালের মতো আবারও সেনাশাসন আসছে। তবে বাস্তবে সেনাকুঞ্জে এক ভিন্ন চিত্র তৈরি হয়— সব রাজনৈতিক দলকে ডেকে আনা হয়, আলোচনার মাধ্যমে ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ঘোষণা দেওয়া হয়। এর আগেই ৫ আগস্ট দুপুর থেকে ঢাকায় জনস্রোত নেমে আসে। উত্তরা ও যাত্রাবাড়ী দিয়ে লাখো মানুষ ঢাকায় প্রবেশ করে। শেখ হাসিনার দেশত্যাগের খবরে রাজধানীবাসী রাস্তায় নেমে আসে। কেউ গণভবনে গিয়ে সিজদায় পড়ে যায়, কেউ আনন্দে উল্লাসে মেতে ওঠে। স্বৈরাচার পতনের আনন্দে মানুষ গণভবনের ভেতর ঢুকে পড়ে, কেউ কেউ স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে বিভিন্ন সামগ্রী নিয়ে যায়— পরে অবশ্য অনেকেই সেসব ফেরতও দিয়ে দেন।
৫ আগস্ট শেখ হাসিনার দেশত্যাগের মধ্য দিয়ে দীর্ঘ ১৫ বছরের একনায়কতন্ত্রের অবসান ঘটে। তবে এই চূড়ান্ত বিজয়ের মূল্য ছিল অনেক রক্ত। প্রাণ হারান সহস্রাধিক মানুষ, আহত হন অন্তত ত্রিশ হাজার। ১ জুন ২০২৪ সালে শুরু হওয়া এই বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন শেষ হয় ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পতনের মধ্য দিয়ে। মাত্র ৩৬ দিনের এই আন্দোলন-সংগ্রামই বাংলাদেশকে ফ্যাসিবাদমুক্ত করে নতুন একটি অন্তর্বর্তী সময়ের দিকে নিয়ে যায়।


