বুধবার, ১ এপ্রিল ২০২৬
Single Top Banner

৭ জনের বাড়ি চট্টগ্রামের সন্দ্বীপে

ওমানে মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় ৮ বাংলাদেশি নিহত

নিজস্ব প্রতিবেদক :

ওমানের দুকুম এলাকায় ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় আটজন বাংলাদেশি প্রবাসী শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। মাছ ধরার উদ্দেশ্যে সমুদ্রের দিকে যাচ্ছিলেন তারা। গতকাল (মঙ্গলবার) স্থানীয় সময় বিকেল ৩টার দিকে মাস্কাট থেকে প্রায় ৬৫০ কিলোমিটার দূরে দুকুম সিদরার পথে এ দুর্ঘটনা ঘটে। নিহতদের মধ্যে সাতজনের বাড়ি চট্টগ্রামের সন্দ্বীপ উপজেলায়, আর অপর একজনের বাড়ি মীরসরাই উপজেলায় বলে ধারণা করা হচ্ছে। খবরটি ছড়িয়ে পড়তেই সন্দ্বীপজুড়ে নেমে আসে শোকের ছায়া।

বাসসের খবরে জানা যায়, মাস্কাটে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসের প্রথম সচিব (শ্রম) আসাদুল হক বিষয়টি নিশ্চিত করে জানিয়েছেন, মোট নয়জন বাংলাদেশি একটি মাইক্রোবাসে করে মাছ ধরার কাজের উদ্দেশ্যে দুকুম সিদরার দিকে যাচ্ছিলেন। পথে বিপরীত দিক থেকে আসা একটি বড় মাছবাহী কন্টেইনার ট্রাকের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে ঘটনাস্থলেই আটজন নিহত হন এবং মাইক্রোবাসচালক গুরুতর আহত হন। আহত চালককে উদ্ধার করে নিকটবর্তী হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। দুর্ঘটনার পরপরই ওমান পুলিশ ও উদ্ধারকর্মীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে মরদেহগুলো বিভিন্ন হাসপাতালে পাঠায়।

দূতাবাস কর্মকর্তা আসাদুল হক জানান, নিহতদের মরদেহ হাসপাতালগুলোতে রাখা হয়েছে এবং একজন বাংলাদেশি দূতাবাস কর্মকর্তা ইতোমধ্যে দুর্ঘটনাস্থলে পৌঁছেছেন। দূতাবাসের পক্ষ থেকে ওমানের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে নিহতদের মরদেহ দ্রুত দেশে পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, “নিহতদের পরিবারের পাশে দাঁড়াতে এবং প্রবাসে থাকা বাংলাদেশিদের সব ধরনের সহায়তা নিশ্চিত করতে দূতাবাস সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে।”

জানা গেছে, নিহত আটজনের মধ্যে সাতজনের বাড়ি চট্টগ্রামের সন্দ্বীপে। তাদের মধ্যে পাঁচজন সারিকাইত ইউনিয়নের বাসিন্দা— আলী আকবার সেরাংয়ের ছেলে মোহাম্মদ আমিন সওদাগর, শহীদ উল্লার ছেলে আরজু, মনু মিয়ার ছেলে মোহাম্মদ বাবলু, সিদ্দিক আহমেদের ছেলে সাহাব উদ্দিন এবং ইব্রাহিম মিস্ত্রির ছেলে মোহাম্মদ রকি। অপর দুইজন হলেন মাইটভাংগা ইউনিয়নের জামাল উদ্দিনের ছেলে জুয়েল এবং সন্দ্বীপ পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের আবুল হাসেমের ছেলে মোহাম্মদ রনি। নিহতদের মধ্যে একজনের বাড়ি মীরসরাই উপজেলায় বলে জানা গেলেও তার নাম-পরিচয় এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

নিহতদের খবর পৌঁছাতেই সন্দ্বীপের গ্রামগুলোতে শোকের মাতম শুরু হয়। পরিবারের সদস্যরা কান্নায় ভেঙে পড়েন। যাদের মাধ্যমে দেশে খবর পৌঁছায়, তারা জানিয়েছেন, দুর্ঘটনার সময় নিহতরা মাছ ধরার কাজে নতুন মৌসুম শুরু করতে যাচ্ছিলেন। ওমানের দুকুম উপকূলে তারা একটি মাছধরা কোম্পানিতে কাজ করতেন। সেখানেই যাওয়ার পথে ট্র্যাজেডি ঘটে।

নিহত রকি ১০ মাস আগে ওমানে গিয়েছিলেন জীবিকার সন্ধানে। পরিবারে ছোট্ট তিন মাস বয়সী ছেলে নুর— যার মুখ তিনি এখনো দেখতেও পারেননি। প্রবাসে পরিশ্রম করে পরিবারের ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন নিয়ে পাড়ি দিয়েছিলেন মরুভূমির দেশে, কিন্তু সেই স্বপ্ন থেমে গেল দূরদেশের সড়কে। নিহত বাবলুর দুই সন্তান— বড়টির বয়স চার বছর, ছোটটির দুই। এ দুই শিশুর কাছে এখনও কেউ বোঝাতে পারছে না, তাদের বাবা আর ফিরে আসবেন না।

সারিকাইত ইউনিয়নের সিদ্দিক আহমেদের বাড়িতে একসঙ্গে শোক বইছে দুই পরিবারে। সাহাব উদ্দিন ও বাবলু একে অপরের প্রতিবেশী, তাদের বাড়ির মাঝখানে মাত্র ১০ ফুটের রাস্তা। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ছেলেদের হারিয়ে দু’টি পরিবারই এখন নিঃস্ব। একদিকে হাহাকার, অন্যদিকে শোকে কাতর গ্রামের মানুষ। সবাই একই প্রশ্ন করছেন— কেন এমন হলো, কেন তাদেরই যেতে হলো?

মাইটভাংগা ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডে নিহত জুয়েলের বাড়িতে গেলে চোখে পড়ে হৃদয়বিদারক দৃশ্য। ঘরে কান্নার শব্দ, উঠানে প্রতিবেশীদের ভিড়। পিতা জামাল উদ্দিন সাংবাদিকদের দেখে হাউমাউ করে কেঁদে ওঠেন। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, “আমার ছেলেটা পরিশ্রম করে সংসার চালাত। ওর লাশটা যেন তাড়াতাড়ি দেশে আনা হয়, আমি শেষবার একনজর দেখতে চাই।”

স্থানীয় প্রশাসন ও ইউনিয়ন পরিষদের প্রতিনিধিরা নিহতদের বাড়িতে গিয়ে পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়িয়েছেন। সন্দ্বীপ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জানান, নিহতদের পরিবারকে সব ধরনের সহযোগিতা দেওয়া হবে। সরকার ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে দূতাবাসের মাধ্যমে দ্রুত মরদেহগুলো দেশে ফেরত আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

সন্দ্বীপজুড়ে এখন শোকের ছায়া নেমে এসেছে। প্রতিটি বাড়িতে চলছে কান্না আর আর্তনাদ। নিহতদের আত্মীয়স্বজন, বন্ধু ও প্রতিবেশীরা স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বারবার বলছেন, “ওরা সবাই ভালো মানুষ ছিল। কেউ কারও ক্ষতি করতে জানত না, শুধু পরিবারের জন্যই ওমানে গিয়েছিল।”

স্থানীয়রা জানান, সন্দ্বীপ থেকে প্রায় প্রতিদিনই বহু তরুণ জীবিকার সন্ধানে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে যাচ্ছেন। এদের মধ্যে অধিকাংশই নিম্নআয়ের পরিবার থেকে আসা। ওমানের মতো দেশে অনেকেই মাছ ধরার কাজ করেন। সেখানে জীবনের ঝুঁকি থাকলেও তারা পরিবার চালাতে বাধ্য হন। এই দুর্ঘটনা আবারও মনে করিয়ে দিল— প্রবাসজীবন শুধু স্বপ্ন নয়, তা কতটা অনিশ্চিতও হতে পারে।

নিহতদের মরদেহ বর্তমানে ওমানের বিভিন্ন হাসপাতালের হিমঘরে রাখা হয়েছে। দূতাবাস জানিয়েছে, ওমানের আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর মরদেহগুলো বাংলাদেশে পাঠানো হবে। এদিকে সন্দ্বীপের সারিকাইত, মাইটভাংগা ও পৌর এলাকার সাতটি পরিবার এখন অপেক্ষায় আছে, কখন প্রিয়জনদের লাশ ফিরে আসবে।

নিহতদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করে স্থানীয় মসজিদগুলোতে দোয়া অনুষ্ঠিত হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও চলছে শোকবার্তা। অনেকেই লিখছেন— “রিজিকের জন্য ঘর ছেড়ে যাওয়া এসব মানুষই দেশের প্রকৃত নায়কেরা, যারা জীবনের বিনিময়ে পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে চেয়েছিলেন।”

Single Sidebar Banner
  • সর্বশেষ
  • পঠিত