নির্মাণ শেষ হয়েছে দুই বছর আগে, কিন্তু এখনো চালু হয়নি সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং (এসপিএম) ও পাইপলাইন প্রকল্প। জাহাজ থেকে সরাসরি পাইপলাইনে জ্বালানি তেল সরবরাহের এই গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পটি চালুর অপেক্ষায় পড়ে আছে কোটি টাকার স্থাপনা।
সম্প্রতি অপারেটর নিয়োগের আন্তর্জাতিক দরপত্র বাতিল করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। কারণ—দর ছিল সম্ভাব্য ব্যয়ের তুলনায় অনেক বেশি। চমক হলো, দরপত্রে অংশ নেওয়া চীন ও ইন্দোনেশিয়ার দুটি প্রতিষ্ঠান আবারও নিজ নিজ দূতাবাসের মাধ্যমে জি টু জি (সরকারে-সরকারে) ভিত্তিতে এসপিএম পরিচালনার সংক্ষিপ্ত কারিগরি প্রস্তাব দিয়েছে। ফলে অপারেটর নিয়োগের প্রক্রিয়ায় নতুন মোড় এসেছে। তবে এখনো কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারছে না, কবে বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার শুরু হবে এই প্রকল্পটির।
২০১৫ সালে ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড প্রকল্পটি গ্রহণ করে। লক্ষ্য ছিল—সাগরের তলদেশ দিয়ে পাইপলাইনের মাধ্যমে জ্বালানি তেল সরাসরি শোধনাগারে সরবরাহ করা, যাতে দ্রুত ও কম খরচে আমদানি তেল খালাস করা যায়। ২০২৩ সালে নির্মাণকাজ শেষ হলেও নানা জটিলতায় কমিশনিং হয় ২০২৪ সালের মার্চে। কিন্তু দেড় বছর পেরিয়ে গেলেও পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণ ঠিকাদার নিয়োগ না হওয়ায় প্রকল্পটি এখনো অচল।
পূর্ববর্তী সরকার প্রকল্প বাস্তবায়নকারী চীনা প্রতিষ্ঠান চায়না পেট্রোলিয়াম পাইপলাইন ইঞ্জিনিয়ারিং-কে জি টু জি ভিত্তিতে পরিচালনার দায়িত্ব দিতে চেয়েছিল। অন্তর্বর্তী সরকারও শুরুতে একই পথে এগোলেও পরে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করে। কিন্তু সেখানে নেদারল্যান্ডের ব্লু ওয়াটার ও চীনের সিপিপিইসি যৌথ প্রস্তাব কারিগরিভাবে অযোগ্য হয়। অপরদিকে, ইন্দোনেশিয়ার পার্টামিনা ট্রান্সকন্টিনেন্টাল লিমিটেডের আর্থিক প্রস্তাব ছিল সম্ভাব্য ব্যয়ের প্রায় দ্বিগুণ, ফলে দরপত্রটি বাতিল করা হয়।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব সাইফুল ইসলাম বলেন,“চুক্তির মেয়াদ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। এরপর আমাদের রক্ষণাবেক্ষণ শুরু করতে হবে। তাদের প্রস্তাব আমাদের ব্যয়ের চেয়ে ৫১ শতাংশ বেশি হওয়ায় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।”
এদিকে ফেব্রুয়ারিতেই এসপিএমের ডিফেক্ট লায়াবিলিটি পিরিয়ড ও প্রকল্প হস্তান্তরের মেয়াদ শেষ হচ্ছে। তাই মাত্র চার মাস হাতে রেখে আবারও জি টু জি প্রক্রিয়ার দিকে ঝুঁকছে বিপিসি।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) চেয়ারম্যান আমিন উল আহসান বলেন,“নতুন করে টেন্ডার ডাকলে প্রক্রিয়া দীর্ঘ হবে। তাই জি টু জি হলে দ্রুত চুক্তি করা সম্ভব। মূল্য কমানোসহ নেগোসিয়েশনের সুযোগও থাকে। তারা যদি আমাদের চাহিদা অনুযায়ী অপারেশনাল সুবিধা দিতে পারে, তবে চুক্তি হবে।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের এসপিএম পরিচালনার অভিজ্ঞতা নেই। তাই প্রকল্প বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠানকে ‘বিল্ট-অপারেট-ট্রান্সফার’ (BOT) পদ্ধতিতে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য পরিচালনার দায়িত্ব দিলে রাষ্ট্রের বড় ক্ষতি হতো না।
বাংলাদেশ মার্চেন্ট মেরিন অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ক্যাপ্টেন মো. আনাম চৌধুরী বলেন,“যারা প্রকল্প করেছে, তাদের এক বছর চালিয়ে দেখার সুযোগ দেওয়া উচিত ছিল। এরপর ট্রান্সফার করলে সমস্যা হতো না।”
বর্তমানে গভীর সমুদ্রে বড় জাহাজ থেকে ক্রুড অয়েল ভাড়া করা ছোট লাইটার জাহাজে করে পতেঙ্গায় ইস্টার্ন রিফাইনারির ট্যাংকে আনা হয়। এতে সময় লাগে ১১ থেকে ১২ দিন। পাইপলাইন চালু হলে সময় লাগবে মাত্র ২ দিন। এতে বছরে অন্তত ৮০০ কোটি টাকা সাশ্রয় সম্ভব হবে।
তবে এখনো নিশ্চিত নয়—কবে চালু হবে দেশের এই বহুল প্রতীক্ষিত জ্বালানি অবকাঠামো প্রকল্প।


