ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে গত বছরের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলেও বন্দরনগরী চট্টগ্রামে এখনো পুরোপুরি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার আওতায় আসেনি ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি)।
অভিযোগ রয়েছে, সংস্থাটির চট্টগ্রাম অঞ্চলের অধিকাংশ ডিলার এখনো পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে নিয়োগপ্রাপ্ত। সরকার পরিবর্তনের দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও অদৃশ্য কারণে থমকে আছে নতুন ডিলার নিয়োগ কার্যক্রম। আবেদন গ্রহণের ছয় মাস পার হলেও পুরো প্রক্রিয়া শেষ না হওয়ায় আবেদনকারীদের মধ্যে চরম ক্ষোভ ও হতাশা বিরাজ করছে।
সরকার পতনের পরপরই টিসিবির ডিলার পরিবর্তনের দাবি জোরালো হয়ে ওঠে। বিশেষ করে ছাত্র-জনতার পক্ষ থেকে এই দাবি সামনে আসে। অভিযোগ করা হয়, চট্টগ্রামে বর্তমানে যেসব ডিলার টিসিবির কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত, তাদের বড় একটি অংশ আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে নিয়োগপ্রাপ্ত। এসব ডিলারের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে পণ্য বিতরণে অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি ও ভোক্তাদের হয়রানির অভিযোগ রয়েছে। ফলে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় টিসিবিকে ‘দলীয় প্রভাবমুক্ত’ করার দাবি ওঠে বিভিন্ন মহল থেকে।
এই প্রেক্ষাপটে গত বছরের ১৫ মে চট্টগ্রামে নতুন ডিলার নিয়োগের লক্ষ্যে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে টিসিবি। এতে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন ও জেলার ১৫টি উপজেলার নির্দিষ্ট ওয়ার্ড ও ইউনিয়নের মুদি ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে আবেদন আহ্বান করা হয়। বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, ওই বছরের ২১ মে থেকে ৪ জুন রাত ১২টা পর্যন্ত অনলাইনে আবেদন গ্রহণ করা হয়। আবেদনকারীদের অফেরতযোগ্য ৫ হাজার টাকা জমা দিতে হয়। বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন ও ১৫টি উপজেলা মিলিয়ে মোট ৩৪০ জন নতুন ডিলার নিয়োগ দেওয়া হবে এবং সর্বোচ্চ ৬৮০ জন আবেদন করতে পারবেন।
চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের কার্যালয় সূত্র জানায়, টিসিবির ডিলার পদের জন্য চট্টগ্রাম থেকে মোট ৪৭২টি আবেদন জমা পড়ে। এসব আবেদন যাচাই-বাছাই শেষে তদন্ত প্রতিবেদনসহ ঢাকায় টিসিবির প্রধান কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে। চূড়ান্ত নিয়োগ কার্যক্রম সেখান থেকেই সম্পন্ন হওয়ার কথা।
তবে নির্ধারিত সময় পার হয়ে গেলেও ডিলার নিয়োগ কার্যক্রম শেষ হয়নি। টিসিবি চট্টগ্রাম অফিস সূত্রে জানা গেছে, নতুন আবেদনকারীদের মধ্য থেকে এখন পর্যন্ত মাত্র ৩০ থেকে ৩৫ জনকে ডিলার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। যেসব আবেদনের তদন্ত আগে সম্পন্ন হয়েছে, সেগুলোর ভিত্তিতেই এই নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। একই বিজ্ঞপ্তির আওতায় একযোগে আবেদন করেও অল্পসংখ্যক নিয়োগ হওয়ায় পুরো প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন আবেদনকারীরা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক আবেদনকারী বলেন, “সবাই একই সময়ে আবেদন করলেও বাস্তবে সবাই সমান সুযোগ পাচ্ছেন না। কেউ কেউ ঢাকায় গিয়ে তদবির করে ডিলার নিয়োগ নিয়ে এসেছে। যারা ঢাকায় তদবির করতে পারেনি, তাদের আবেদনগুলো আটকে আছে। নিয়ম অনুযায়ী একই বিজ্ঞপ্তির আওতায় সব ডিলারের অনুমোদন একসঙ্গে হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে তা হচ্ছে না।” তার অভিযোগ, ঢাকার টিসিবি প্রধান কার্যালয় এখনো ‘ফ্যাসিস্টমুক্ত’ হয়নি এবং টাকা ছাড়া নতুন ডিলার অনুমোদন পাওয়া যাচ্ছে না—এমন কথাও বিভিন্ন জায়গায় শোনা যাচ্ছে।
আরও অভিযোগ রয়েছে, টিসিবির প্রধান ভবনে কর্মরত পতিত আওয়ামী লীগপন্থী কর্মকর্তা-কর্মচারীরাই ইচ্ছাকৃতভাবে নতুন ডিলার নিয়োগ কার্যক্রম দীর্ঘায়িত করছেন। এর ফলে পুরনো ডিলাররা এখনো বহাল তবিয়তে টিসিবির কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। এতে করে ভোক্তারা আগের মতোই পণ্য বিতরণে অনিয়ম ও ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
এ বিষয়ে টিসিবির চট্টগ্রাম আঞ্চলিক কার্যালয়ের যুগ্ম পরিচালক (অফিস প্রধান) মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, বর্তমানে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের ৪১টি ওয়ার্ডে ১৮০ জন টিসিবির ডিলার রয়েছে। একইভাবে জেলার ১৫টি উপজেলায় রয়েছে ৬৫ জন ডিলার। এর মধ্যে নতুন আবেদনকারীদের মধ্য থেকে ৩০ থেকে ৩৫ জনকে ইতোমধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। যেসব আবেদনের তদন্ত আগে শেষ হয়েছে, সেগুলোর অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। বাকি আবেদনগুলোও পর্যায়ক্রমে অনুমোদন দেওয়া হবে বলে তিনি জানান।
তবে এই ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট নন আবেদনকারীদের একটি বড় অংশ। তাদের প্রশ্ন, যদি তদন্তই মূল বিষয় হয়, তাহলে একই সময়ে জমা দেওয়া আবেদনের তদন্ত ভিন্ন ভিন্ন সময়ে শেষ হওয়ার কারণ কী। এই প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর না পাওয়ায় পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, ডিলার নিয়োগ কার্যক্রম দীর্ঘায়িত হওয়ায় শুধু আবেদনকারীরাই নয়, সাধারণ ভোক্তারাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ও স্বচ্ছভাবে নতুন ডিলার নিয়োগ না হলে টিসিবির মাধ্যমে ন্যায্যমূল্যে পণ্য বিতরণের মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হবে। সরকার পরিবর্তনের পরও যদি পুরনো রাজনৈতিক বলয়ের প্রভাব থেকে যায়, তাহলে টিসিবির সংস্কার কার্যক্রমই প্রশ্নের মুখে পড়বে বলে মনে করছেন তারা।


