নিজস্ব প্রতিবেদক :
আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন সমাজবিজ্ঞানী, একুশে পদকপ্রাপ্ত শিক্ষাবিদ ও প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটির উপাচার্য প্রফেসর ড. অনুপম সেন বলেন, একটি শিশু জন্মগ্রহণের পর থেকে বিভিন্ন স্তর অতিক্রম করে। তোমরা স্কুলে ও কলেজে ছিলে, তারপর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছো। এখন বিশ্ববিদ্যালয়-জীবন শেষ করে সমাবর্তনে উপনীত হয়েছো। এই দিনটি শিক্ষার্থীদের জন্য গর্বের দিন, আনন্দের দিন। এই দিন কেউ ভোলে না। তিনি উল্লেখ করেন, সমাবর্তনের মধ্য দিয়ে গ্র্যাজুয়েটরা জীবনের বিশাল ক্ষেত্রে প্রবেশ করে।
রবিবার (৩০ অক্টোবর) চট্টগ্রামের নেভি কনভেনশন সেন্টারে প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটির তৃতীয় সমাবর্তন অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
ড. অনুপম সেন ‘আজকের বিশ্বকে জ্ঞানভিত্তিক বিশ্ব’ উল্লেখ করে বলেন, শিক্ষার ক্ষেত্রে যে দেশ যত বেশি এগুচ্ছে, সে দেশই বিশ্বে নেতৃত্বের ভূমিকায় এগিয়ে আসছে। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন অত্যন্ত দূরদর্শি একজন বিশ্ব-নেতা। স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ক্ষমতা গ্রহণের পর তিনিও অনুভব করেছিলেন, বাংলাদেশকে এগিয়ে নিতে হলে জ্ঞান-সমৃদ্ধ করেই এগিয়ে নিতে হবে। তাই তিনি সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছিলেন শিক্ষাকে। এ কারণে প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটিও বাংলাদেশকে জ্ঞান-সমৃদ্ধ করে এগিয়ে নেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে প্রাক্তন মেয়র ও মানবতাবাদী রাজনৈতিক নেতা এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ১৫৫০ খ্রিস্টাব্দের দিকে ইউরোপে সই করতে পারতেন এমন লোকের সংখ্যা ছিল মাত্র ৫ শতাংশ। ১৭৫০ খ্রিস্টাব্দের দিকে এই সংখ্যা হল্যান্ড, ইংল্যান্ড, ফ্রান্স ও জার্মানিতে বিপুল পরিমাণে বেড়ে যায়। এইসব দেশে তা ৩৫ থেকে ৪৫ শতাংশে উন্নীত হয়। ইউরোপে যে দেশে যত বেশি শিক্ষিত সৃষ্টি হয়েছে, দেখা গেছে সে দেশ অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ততই বিপুলভাবে এগিয়ে গেছে। এইসব দেশে নব প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলো জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিস্তার ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির মুখ্য মাধ্যম হিসেবে কাজ করেছে।
এই অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্য রাখেন শিক্ষা উপমন্ত্রী ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল, সমাবর্তন বক্তা ছিলেন ভারতের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও লেখক, রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য প্রফেসর ড. পবিত্র সরকার। বিশেষ অতিথি ছিলেন, বাংলাদেশ অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিলের চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. মেসবাহউদ্দিন আহমেদ, ইউজিসির সদস্য প্রফেসর ড. মোঃ সাজ্জাদ হোসেন, প্রফেসর ড. বিশ্বজিৎ চন্দ ও প্রফেসর ড. মোঃ আবু তাহের। এছাড়া উপস্থিত ছিলেন, প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটির উপ-উপাচার্য প্রফেসর ড. কাজী শামীম সুলতানা ও ট্রেজারার প্রফেসর একেএম তফজল হক।
এতে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিলের চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. মেসবাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, মানুষের বুদ্ধিমত্তা আছে, উদ্ভাবনী ক্ষমতা আছে। মানুষ পরিকল্পনা করতে পারে, চিন্তাকে এগিয়ে নিতে পারে। এ কারণে মানুষ নিজের স্বপ্নকে পূরণ করতে পারে। আজকের গ্র্যাজুয়েটদেরও অনেক স্বপ্ন আছে। দক্ষতার সঙ্গে কাজ করলে তারা অবশ্যই তাদের স্বপ্ন সফল করতে পারবে। তিনি আরও বলেন, আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থার আলোকে বাংলাদেশ এখন উচ্চশিক্ষার পর্যায়ে জবাবদিহিতামূলক পদ্ধতির রূপরেখা সমন্বিত করার চেষ্টায় আছে। বাংলাদেশ অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিল ইতোমধ্যে পড়ানো এবং কী পড়ানো হলো, কতটুকু অগ্রগতি হলো একটি ক্লাস থেকে পরবর্তী ক্লাস পর্যন্ত, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর মধ্যে সম্পর্ক যৌক্তিক ও যথাযথভাবে পালিত হয়েছে কিনা, এইসব তদারকি করার কারণে এক একটি কেন্দ্র হয়ে পড়েছে এক একটি বিশ্ববিদ্যালয়। অবশ্যই, প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটি সরকারি এই প্রচেষ্টার অংশগ্রহণকারী একটি শক্তিশালী মহতী প্রতিষ্ঠান, এবং যেহেতু এটির প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন একজন শিক্ষাদরদী মানবদরদী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব আলহাজ্ব এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী, তাই আমার বিশ্বাস প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটির অগ্রগতি আধুনিক উপায়ে সাধিত হবে।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে ইউজিসির সদস্য প্রফেসর ড. মোঃ সাজ্জাদ হোসেন বলেন, পৃথিবী এখন অদম্য বাংলাদেশের পক্ষে। শিক্ষার্থীদের এটা বুঝতে হবে। বাংলাদেশকে কেউ দাবিয়ে রাখতে পারবে না। আউট অব বক্স চিন্তা, নতুন নতুন ধারণা ও প্রযুক্তিকে ধারণ করতে হবে। বঙ্গবন্ধুর দর্শনকে গ্রহণ করতে হবে। তবেই উদ্ভাবনী বাংলাদেশ আমরা পাবো। প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের উন্নয়নকল্পে যে-রূপরেখা দিয়েছেন তা বাস্তবায়নে শিক্ষার্থীদের কাজ করতে হবে।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে ইউজিসির সদস্য প্রফেসর ড. বিশ্বজিৎ চন্দ বলেন, শিক্ষা জীবনব্যাপী প্রক্রিয়া। গ্র্যাজুয়েটদের লক্ষ্য স্থির করতে হবে এবং বড়ো হওয়ার আকাক্সক্ষা রাখতে হবে। দক্ষ জনবল হয়ে উঠতে হবে। দেশকে এগিয়ে নিতে হলে দক্ষ জনবল খুবই প্রয়োজন। প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটি দক্ষ জনবল তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে। দক্ষ জনবল তৈরি না হলে অর্থ ও প্রযুক্তি কোনো কাজে আসবে না। তিনি সনদপ্রাপ্তদের অসাম্প্রদায়িক চেতনা, সততা ও দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে ইউজিসির সদস্য প্রফেসর ড. মোঃ আবু তাহের বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় জ্ঞান সৃষ্টি, জ্ঞান বিতরণ ও জ্ঞান সংরক্ষণের কেন্দ্র। দেশপ্রেমমূলক শিক্ষায় উদ্বুদ্ধ হয়ে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা শিক্ষাব্যবস্থাকে উচ্চমানে নিয়ে যাবেন, এটাই আমার প্রত্যাশা। তিনি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নে ও চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটির গ্র্যাজুয়েটদের ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান।
সমাবর্তন অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন, প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটির বোর্ড অব ট্রাস্টিজের সম্মানিত সদস্যবৃন্দ, সিন্ডিকেট সদস্যবৃন্দ, একাডেমিক কাউন্সিলের সদস্যবৃন্দ, অর্থ কমিটির সদস্যবৃন্দ, শৃঙ্খলা কমিটির সদস্যবৃন্দ, সকল ডিন, রেজিস্ট্রার, সকল বিভাগীয় চেয়ারম্যান, শিক্ষক-শিক্ষিকামণ্ডলী, কর্মকর্তা-কর্মচারীবৃন্দ ও স্থানীয়-জাতীয় পর্যায়ের গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ।
সমাবর্তনে ৫৬৯৭ জন গ্র্যাজুয়েট তাঁদের শিক্ষা সমাপনী সনদ গ্রহণ করেন। কৃতিত্বপূর্ণ ফলাফল অর্জন করায় সমাবর্তনে তানভীর মাহবুব (ব্যাচেলর অব সোশ্যাল সায়েন্স ইন ইকোনমিক্স), মো. মহিউদ্দিন ইকবাল (ব্যাচেলর অব বিজনেস এডমিনিস্ট্রেশান), সৈয়দা আফরোজা (ব্যাচেলর অব ল’জ), সোহানা সুলতানা (মাস্টার্স অব বিজনেস এডমিনিস্ট্রেশান), নাবিল সাদ (মাস্টার্স অব বিজনেস এডমিনিস্ট্রেশান), রিদওয়ানুল আহসান নাঈম (মাস্টার্স অব বিজনেস এডিমিনিস্ট্রেশান)-কে চ্যান্সেলরস গোল্ড মেডেল, তাহমিনা নাজনীন (ব্যাচেলর অব আর্টস ইন ইংলিশ), ইউসরা আমরিন হুসেইন (ব্যাচেলর অব সোশ্যাল সায়েন্স ইন ইকোনমিক্স), শাহারিয়া জান্নাত সাফা (ব্যাচেলর অব ল’জ), অভিজিৎ পাল (মাস্টার্স অব বিজনেস এডমিনিস্ট্রেশান), রাবিয়া জাহান নিশা (মাস্টার্স অব ল’জ), সুজয় বড়ুয়া (মাস্টার্স অব বিজনেস এডমিনিস্ট্রেশান)-কে এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী গোল্ড মেডেল এবং তূর্ণা দেব (ব্যাচেলর অব ল’জ), মরিয়ম বেগম (ব্যাচেলর অব বিজনেস এডমিনিস্ট্রেশান), মোঃ রিদওয়ান সিদ্দিকী ওয়াদুদ (ব্যাচেলর অব বিজনেস এডমিনিস্ট্রেশান), সুলতানা আফরিন (মাস্টার্স অব বিজনেস এডমিনিস্ট্রেশান), জয়া সাহা (মাস্টার্স অব বিজনেস এডমিনিস্ট্রেশান), মোঃ সাইফুল ইসলাম (মাস্টার্স অব বিজনেস এডমিনিস্ট্রেশান)-কে ভাইস-চ্যান্সেলরস গোল্ড মেডেল প্রদান করা হয়।
এছাড়া ১৮ জন আন্ডার গ্র্যাজুয়েট ও ১৩ জন পোস্ট গ্র্যাজুয়েটকে প্রদান করা হয় ডিন্স অ্যাওয়ার্ড।
পরে মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের পরিবেশনা শুরু হয়। প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটি সাংস্কৃতিক দল এই সাংস্কৃতিক পরিবেশনার মাধ্যমে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, চট্টগ্রামের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি তুলে ধরে।


