বুধবার, ১ এপ্রিল ২০২৬
Single Top Banner

সাবেক ভূমি মন্ত্রীর ছক

কর্মচারীকে মালিক সাজিয়ে ১৫ কোটি টাকা আত্মসাত

নিজস্ব প্রতিবেদক :

সাবেক ভূমিমন্ত্রী এবং চট্টগ্রামের প্রভাবশালী রাজনীতিক সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদসহ ২৮ জনের বিরুদ্ধে ১৫ কোটি টাকা আত্মসাৎ ও পাচারের অভিযোগে মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। বৃহস্পতিবার (৩১ জুলাই) দুদকের চট্টগ্রাম জেলা কার্যালয়-১-এ এই মামলা দায়ের করেন সংস্থার প্রধান কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মো. মাইনউদ্দীন। মামলাটি দায়েরের বিষয়টি গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন দুদকের চট্টগ্রাম জেলা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক সুবেল আহমেদ।

মামলায় অভিযোগ আনা হয়েছে, আরামিট গ্রুপভুক্ত একটি প্রতিষ্ঠানের ক্যাশ ম্যানেজার মোহাম্মদ জসিম উদ্দীনকে ব্যবসায়ী হিসেবে সাজিয়ে ‘রিলায়েবল ট্রেডিং’ নামে একটি নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠান গঠন দেখিয়ে ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক (ইউসিবি) থেকে ভুয়া ও মিথ্যা তথ্য-উপাত্ত ব্যবহার করে ১৫ কোটি টাকা ঋণ অনুমোদন করানো হয়। এরপর ওই টাকা বিভিন্ন ভুয়া ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নামে খোলা ব্যাংক হিসাবে স্থানান্তর, হস্তান্তর ও রূপান্তরের মাধ্যমে আত্মসাৎ করা হয়। অভিযোগে আরও বলা হয়, এসব ভুয়া প্রতিষ্ঠান—বিশেষত ‘মডেল ট্রেডিং’ ও ‘ইম্পেরিয়াল ট্রেডিং’—আরামিট গ্রুপের কর্মচারীদের নামে গঠন করা হয়, যার মাধ্যমে পুরো অর্থ লেনদেনের ধোঁয়াশা সৃষ্টি করে পাচার কার্যক্রম চালানো হয়।

দুদকের ভাষ্যমতে, এটি কোনো একক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নয়, বরং একটি সুপরিকল্পিত এবং সংগঠিত দুর্নীতির ঘটনা, যার সঙ্গে একাধিক ব্যাংক কর্মকর্তা, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, ব্যবসায়ী এবং রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তিরা জড়িত। এই ঘটনায় রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক খাত ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়েছে বলেও প্রাথমিকভাবে দুদকের তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।

মামলায় প্রধান আসামি করা হয়েছে সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদকে। তাঁর সঙ্গে রয়েছেন স্ত্রী রুকমীলা জামান (৪৬), ইউসিবি ব্যাংকের সাবেক একাধিক কর্মকর্তা—আবু হেনা মো. ফখরুল ইসলাম (৪০), মো. মোয়াজ্জেম হোসেন চৌধুরী (৫৮), জিয়াউল করিম খান (৪৬), মোহাম্মদ আব্দুল আউয়াল (৫৮), মীর মেসবাহ উদ্দীন হোসাইন (৬২) ও আব্দুল হামিদ চৌধুরী। ব্যাংকের ঋণ প্রক্রিয়া, অনুমোদন ও তহবিল ছাড়ের সঙ্গে সরাসরি জড়িত ছিলেন এই কর্মকর্তারা, যাঁরা তাঁদের পদমর্যাদা ও দায়িত্বের অপব্যবহার করে এই জালিয়াতি কার্যক্রমে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ রয়েছে।

তালিকাভুক্ত অন্যান্য আসামিরা হলেন- মো. আব্দুল আজিজ (৩৯), শাহরিয়ার হোসেন (৪৯), বজল আহমেদ বাবুল, আনিসুজ্জামান চৌধুরী (৫৩), আখতার মতিন চৌধুরী (৭৪), এম এ সবুর (৭৭), ইউনুছ আহমদ (৭৯), নুরুল ইসলাম চৌধুরী (৬২), আসিফুজ্জামান চৌধুরী, রোকসানা জামান চৌধুরী (৫৬), বশির আহমেদ (৩৩), আফরোজা জামান (৪৮), সৈয়দ কামরুজ্জামান (৬১), শাহ আলম (৬২), প্রফেসর ড. মো. জোনাইদ শফিক (৬৪), ড. কনক কান্তি সেন (৬০), ড. অপরূপ চৌধুরী (৬৫) এবং মারিফ কাদরী (৬৪)। এদের কেউ কেউ আরামিট গ্রুপের পরিচালক বা নীতিনির্ধারক, কেউ আবার সরাসরি কোম্পানির অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বা ব্যাংক লেনদেনের সাথে সম্পৃক্ত।

মামলার এজাহারে আরও বলা হয়েছে, ‘রিলায়েবল ট্রেডিং’ নামে যেসব কাগজপত্র ব্যাংকে জমা দেওয়া হয়, সেগুলোর মধ্যে বেশিরভাগই জাল ও ভিত্তিহীন। কোম্পানির নামে উল্লেখ করা ঠিকানা, আয়কর ফাইল, ব্যবসার প্রকৃতি ও আর্থিক বিবরণ সবই ছিল সাজানো ও বিভ্রান্তিকর। অথচ এসব যাচাই না করেই ইউসিবির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ১৫ কোটি টাকার ঋণ অনুমোদন দেন এবং তা পর্যায়ক্রমে ছাড়ও করেন। পরবর্তীতে এই টাকা বিভিন্ন পন্থায় আরামিট গ্রুপভুক্ত প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণাধীন ব্যক্তিদের ব্যাংক হিসাবে স্থানান্তর করা হয় এবং প্রকৃত ব্যবসা বা উদ্দেশ্য ব্যতিরেকে তা ব্যবহার করা হয়।

দুদক কর্মকর্তারা বলছেন, এই ঘটনার সঙ্গে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে ফাঁকি দেওয়া, জনস্বার্থ পরিপন্থী সিদ্ধান্ত গ্রহণ, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং রাষ্ট্রীয় অর্থনৈতিক নিরাপত্তার ঝুঁকি সৃষ্টির মতো গুরুতর অপরাধ সংঘটিত হয়েছে। তদন্তকালে আরও সম্পৃক্ততা কিংবা অর্থের ব্যবহার সংক্রান্ত তথ্য উঠে আসতে পারে বলে সংস্থাটি ইঙ্গিত দিয়েছে।

দুদক মামলাটি দায়ের করেছে দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৫৭ এবং মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২-এর ৮(২)(৩) ধারায়।

Single Sidebar Banner
  • সর্বশেষ
  • পঠিত