চট্টগ্রামে ডেঙ্গুর পাশাপাশি ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে চিকুনগুনিয়া। শহরের বহু মানুষ জ্বরে কাতর, গিঁটে ব্যথা, শরীর ফুলে যাওয়া আর অজানা দুর্বলতায় দিন কাটাচ্ছেন। কিন্তু তাদের কষ্ট আরও বাড়িয়ে তুলছে সরকারি হাসপাতালগুলোতে চিকুনগুনিয়া শনাক্তের পরীক্ষার কিট না থাকা। ফলে নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত রোগীদের দুশ্চিন্তার যেন শেষ নেই।
ডেঙ্গু পরীক্ষার জন্য ৩০০ টাকায় পরীক্ষা করা গেলেও চিকুনগুনিয়া পরীক্ষায় বেসরকারি হাসপাতালে গুণতে হচ্ছে ৫ থেকে ৬ হাজার টাকা পর্যন্ত। যে অর্থ ব্যয় করা অনেকের পক্ষেই সম্ভব নয়। অনেকে বাধ্য হয়ে পরীক্ষা না করেই কষ্ট সহ্য করে বাড়িতে বসে আছেন।
চকবাজারের চন্দনপুরা এলাকার বাসিন্দা আবু হোসাইন খান এক সপ্তাহ জ্বরে ভুগেছেন। তিনি বলেন, ‘প্রথমে জ্বর, তারপর মাথা ও গিঁটে ব্যথা শুরু হলো। ডেঙ্গু নেগেটিভ আসে। পরে চিকুনগুনিয়া ধরা পড়ে। জ্বর সেরে গেলেও এখনো শরীর দুর্বল আর জয়েন্টে ব্যথা রয়ে গেছে। সংসার চালানোই যেখানে কষ্ট, সেখানে কয়েক হাজার টাকা দিয়ে পরীক্ষা করানো সত্যিই কঠিন।’
চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের হিসাব বলছে, চলতি বছর ২৯ জুলাই পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন ৮৬৫ জন, আর চিকুনগুনিয়ায় ৯৮৪ জন। অর্থাৎ আক্রান্তের সংখ্যায় চিকুনগুনিয়াই এগিয়ে।
চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন ডা. মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেন, ‘চিকুনগুনিয়ার টেস্ট কিট সরকারি পর্যায়ে নেই, তবে আমরা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে চিঠি দিয়েছি। আশাকরি দ্রুত ব্যবস্থা হবে।’
চট্টগ্রাম মেডিকেল, জেনারেল হাসপাতাল ও বিআইটিআইডি-তে ল্যাব সুবিধা থাকলেও কিট না থাকায় পরীক্ষা হচ্ছে না। উপজেলার সরকারি হাসপাতালগুলোতে পরীক্ষা করানোই অসম্ভব।
এ অবস্থায় গত সোমবার জেলা সিভিল সার্জনের উদ্যোগে বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও হাসপাতালের প্রতিনিধিদের নিয়ে এক বৈঠকে চিকুনগুনিয়ার সর্বোচ্চ টেস্ট ফি ৪ হাজার ৫০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু এতেও অনেক রোগীর কষ্ট লাঘব হচ্ছে না।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. আবুল ফয়সাল মো. নুরুদ্দিন চৌধুরী জানান, ‘এই মৌসুমে প্রচুর ভাইরাস জ্বর হচ্ছে। কিন্তু অধিকাংশ রোগীই শেষ পর্যন্ত চিকুনগুনিয়া পজিটিভ প্রমাণিত হচ্ছেন। পরীক্ষা করাতে না পারায় অনেকেই সঠিক চিকিৎসা পাচ্ছেন না।’
চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. এইচএম হামিদুল্লাহ মেহেদী জানান, ‘আমাদের কাছে আসা রোগীদের প্রায় ৮০ শতাংশেরই চিকুনগুনিয়ার উপসর্গ আছে। কিন্তু টেস্ট খরচ বেশি হওয়ায় অনেকে পরীক্ষা করাতে পারছেন না।’
অন্যদিকে, নগরবাসীর অভিযোগ—জ্বর আর ব্যথার জ্বালায় যখন মানুষ ছটফট করছে, তখন মশক নিধনে নেই তেমন কার্যকর উদ্যোগ। বিভিন্ন এলাকায় জমে থাকা পানিতে মশার উপদ্রব বাড়লেও ওষুধ ছিটানোর কাজ সেভাবে দেখা যাচ্ছে না।
সিটি করপোরেশনের মশক নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তা শরফুল ইসলাম মাহী জানান, ‘মশার হটস্পট ধরে ক্রাশ কর্মসূচি চলছে। আমাদের ২১০ জন কর্মী ও ৬টি স্পেশাল টিম কাজ করছে।’
তবুও বাস্তবে মশার কামড়ে জর্জরিত নগরবাসীর জীবন। অনেক পরিবারেই একাধিক সদস্য চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত। জ্বর শেষে যে ব্যথা শরীরে রেখে যায়, তা মানুষের কর্মক্ষমতা কেড়ে নিচ্ছে। দিনমজুর, রিকশাচালক, দোকানদারদের আয় বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।
সীতাকুণ্ডের বিআইটিআইডির অধ্যাপক ডা. মো. মামুনুর রশীদ বলেন, ‘চিকুনগুনিয়া, ডেঙ্গু, ভাইরাস ফ্লু-সবই এখন প্রকট। কিন্তু ডেঙ্গুর তুলনায় চিকুনগুনিয়ায় বেশি মানুষ আক্রান্ত হচ্ছেন। মশা নিধন না হলে এই পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে।’
স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষ থেকে সচেতনতামূলক লিফলেট বিতরণ চলছে জানিয়ে সিভিল সার্জন বলেন, ‘আমরা পরিস্থিতি মোকাবেলায় প্রস্তুত। তবে মানুষকে সচেতন হতে হবে। মশা দমন ও চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ সেবন এড়িয়ে চলতে হবে।’
চট্টগ্রামের চিকিৎসকেরা বারবার বলছেন-চিকুনগুনিয়া কোনো হালকা জ্বর নয়। সঠিক সময়ে পরীক্ষা ও চিকিৎসা না হলে এর প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে শরীরে থেকে যেতে পারে। তাই সরকারকে জরুরি ভিত্তিতে কিট সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং স্থানীয় পর্যায়ে মশক নিধন কার্যক্রম আরও জোরদার করার দাবি জানানো হয়।


