চট্টগ্রাম নগরীর চেরাগী পাহাড় মোড়ে নকশা অনুমোদন ছাড়াই ২২ তলাবিশিষ্ট ভবন নির্মাণ করেছে দেশের আলোচিত শিল্প গ্রুপ এস আলম। নিয়মবহির্ভূতভাবে নির্মিত ভবনটির নির্মাণকাজ ইতোমধ্যেই শেষ করা হয়েছে। যদিও পরে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) নগর উন্নয়ন কমিটি ও বিশেষ প্রকল্প অনুমোদন কমিটি কিছু শর্ত দিয়ে নকশা অনুমোদনের বিষয়টি বিবেচনায় নেয়, তবে সেসব শর্ত আজও পূরণ করেনি এস আলম গ্রুপ। বিষয়টি নজরে থাকার পরও রহস্যজনকভাবে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করছে না সিডিএ।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে নিয়ম-কানুন উপেক্ষা করে এস আলম এ ভবন নির্মাণ করেছে। সরকার পরিবর্তনের এক বছর পরও এ বিষয়ে সিডিএ নিরব ভূমিকা পালন করছে। অথচ ভবনটি সম্পূর্ণ অবৈধ এবং নগরবাসীর জন্য বড় ধরনের ঝুঁকির কারণ।
এমন অনিয়ম শুধু এস আলমের ভবনেই সীমাবদ্ধ নয়। তথ্য বলছে, আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ ১৫ বছরের শাসনামলে সিডিএ ২৯ হাজার ৭০টি বহুতল ভবনের নকশা অনুমোদন দিয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এসব অনুমোদনের বড় একটি অংশে মানা হয়নি ইমারত নির্মাণ বিধিমালা। ফলে এসব ভবন এখন চট্টগ্রাম নগরবাসীর জন্য ভয়াবহ বিপদের আশঙ্কা তৈরি করেছে। এই অনিয়মের মধ্যে আছে আওয়ামী লীগের সাবেক মন্ত্রী, এমপি, সংসদ সদস্য, ব্যবসায়ীসহ অনেক প্রভাবশালীর বাড়ি।
নগর পরিকল্পনাবিদ ও বিশেষজ্ঞদের মতে, নকশা অনুমোদনের নামে ‘এক ধরনের প্রহসন’ চালানো হয়েছে। অনুমোদন পেলে সেটিকে কাগজে-কলমে বৈধতার মোড়ক দেওয়া হলেও নির্মাণকালে অধিকাংশ ভবন মালিক ইচ্ছামতো তলা বৃদ্ধি, সীমানা লঙ্ঘন, পার্কিং ঘর দখল, কিংবা অগ্নি নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছাড়াই ভবন নির্মাণ করেছেন। এতে কাঠামোগত দুর্বলতা যেমন বাড়ছে, তেমনি আশপাশের মানুষের চলাচল, পরিবেশ ও নিরাপত্তাও প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে।
চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের প্রধান প্রকৌশলী কাজী হাসান বিন শামস বলেন, ‘আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে যেসব ভবনের নকশা অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল, তার ৯০ শতাংশই নিয়ম না মেনে নির্মিত হয়েছে। তখন রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক নানা কারণে ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়নি। এখন যেসব ভবনে অনিয়ম রয়েছে, সেগুলোর বিরুদ্ধে অ্যাকশন নেওয়া হবে। অগ্নি নিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকলে ফায়ার সার্ভিসের সহায়তায় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
সিডিএ সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, বিগত এক যুগে নকশা অনুমোদনের ক্ষেত্রে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতি হয়েছে। ক্ষমতাসীনদের আশীর্বাদে অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তি সরকারি খাস জমি, পুকুর ভরাট, এমনকি পাহাড় কেটেও ভবন নির্মাণের অনুমোদন পেয়েছেন। এসব নির্মাণের ফলে আশপাশের পরিবেশ ও জনজীবনে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
নগরীর আশকার দীঘিপাড় এলাকায় এক প্রকল্পে ৫০ ফুট উচ্চতা বিশিষ্ট পাহাড় কেটে ১৭ তলা ভবনের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। সিডিএ কর্মকর্তা বিষয়টি জেনেও অনুমোদন দিয়েছেন। আবার চেরাগি পাহাড়ের হেমসেম লাইন এলাকায় ৫ ফুট রাস্তাকে ১২ ফুট দেখিয়ে ১০ তলা ভবনের অনুমোদন দেওয়া হয়। প্রতিবাদ এলে ভবন নির্মাণ বন্ধে নোটিশ দেওয়া হলেও ভবন মালিক আদালতে রিট করলে স্থগিতাদেশ আসে। বছরের পর বছর এসব মামলা পরিচালনা করতে গিয়ে সিডিএর অর্থ ও মানবসম্পদ অপচয় হচ্ছে।
বিশেষ করে ২০০৯ সালে রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগ পাওয়া সাবেক চেয়ারম্যান আবদুচ ছালামের সময় নকশা অনুমোদনে সবচেয়ে বেশি নয়ছয় হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তিনি একইসঙ্গে ছিলেন চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের অর্থ সম্পাদক। তার সময়কালে নীতিগত যাচাইয়ের চেয়ে দলীয় ও ব্যক্তিগত সুবিধা গুরুত্ব পেয়েছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সিডিএর অথরাইজড বিভাগের দায়িত্ব ছিল অনুমোদিত ভবনের নির্মাণ কাজ নিয়মিত তদারকি করা। কিন্তু তদারকির ঘাটতি, ক্ষমতাসীনদের চাপ ও কর্মকর্তাদের নিষ্ক্রিয়তায় এই দায়িত্ব প্রায় অনুপস্থিত ছিল। ফলে ভবন মালিকরা অনায়াসে নিয়ম লঙ্ঘন করে ভবন নির্মাণের সুযোগ পেয়েছেন।
সরেজমিনে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, অনুমোদিত নকশার বাইরে গিয়ে ভবনের অতিরিক্ত তলা নির্মাণ, পার্কিং এলাকা দখল, অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা ছাড়া ব্যবহারের মতো অনিয়ম অহরহ। এসব ভবনের ব্যবহারকারীরা নিজেদের জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কায় আছেন।
একটি বেসরকারি জরিপ বলছে, চট্টগ্রামের ৯৭ শতাংশ বহুতল ভবনে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি রয়েছে। এর মধ্যে ৯৩ শতাংশ ভবনে অগ্নি নিরাপত্তা ব্যবস্থা সংক্রান্ত কোনো অনাপত্তিপত্র নেই, আবার ৯৭ শতাংশ ভবনে নেই ফায়ার সার্ভিসের ছাড়পত্রও। ফলে যে কোনো সময় ঘটতে পারে বড় ধরনের প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা।
সিডিএর বর্তমান চেয়ারম্যান প্রকৌশলী নুরুল করিম বলেন, ‘পরিকল্পিত নগরী গড়তে হলে অনুমোদনহীন ও নকশা বহির্ভূত ভবনের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। আমরা ভবন নির্মাণের সময় নিয়মিত তদারকি করবো। নতুন করে কেউ যেন আইন ভেঙে নির্মাণ করতে না পারে, তা নিশ্চিত করা হবে।’


