বুধবার, ১ এপ্রিল ২০২৬
Single Top Banner

চট্টগ্রামের দর্শনীয় বিনোদন কেন্দ্র

একদিনের ভ্রমণের জন্য আদর্শ স্থানগুলো

নিজস্ব প্রতিবেদক :

সাগর, নদী ও পাহাড়ে আচ্ছাদিত চট্টগ্রাম বাংলাদেশের এক অতি সুন্দর এবং দর্শনীয় এলাকা। এই অঞ্চলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য যেমন অপূর্ব, তেমনি এখানকার মানুষের মনও উদার, মহৎ এবং সৌন্দর্য পিপাসু। প্রকৃতি ও পরিবেশ যদি স্বাভাবিক থাকে, তবে চট্টগ্রামের মানুষ কোনো বিশেষ উপলক্ষে বা অবকাশে বেরিয়ে পড়েন নতুন নতুন জায়গা খুঁজতে, যেখানে তারা প্রকৃতির মধ্যে প্রশান্তি ও সজীবতা লাভ করতে পারেন।

এখানকার কিছু দর্শনীয় স্থানের মধ্যে রয়েছে ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় গুরুত্বও, যা স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। এই সুন্দর ভূমিতে রয়েছে অনেক দর্শনীয় স্থান, যা প্রকৃতি প্রেমী ও ইতিহাস অনুরাগীদের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে থাকে।

পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকত : 
চট্টগ্রামবাসীর প্রধান বিনোদন কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকত শহরের দক্ষিণ অংশে অবস্থিত। এটি কর্ণফুলী নদীর মোহনায় এবং চট্টগ্রাম শহর থেকে প্রায় ১৪ কিলোমিটার দূরে। একদিকে সমুদ্রের আছড়ে পড়া বিশাল জলরাশি, অন্যদিকে কৃত্রিমভাবে তৈরি করা মনোমুগ্ধকর সৌন্দর্য—এই দুটি মিলেই এখানে এক অসাধারণ প্রাকৃতিক দৃশ্য সৃষ্টি হয়েছে।

পতেঙ্গায় রয়েছে নান্দনিক ফুল বাগান, সুসজ্জিত বসার স্থান, সাগরপাড়ের বিস্তৃত ওয়াকওয়ে এবং এক চমৎকার পরিবেশ। দিনের বেলা সমুদ্রের প্রশান্তি, আর রাতের বেলায় সমুদ্রপাড়ের আলো এবং শীতল বাতাস—এই সৈকত সত্যিই যেকোনো দর্শনার্থীর মনকে শান্তি ও তৃপ্তি দেয়।

১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়ে এই সৈকতটি ক্ষতিগ্রস্ত হলেও বর্তমানে সিমেন্ট দিয়ে বাঁধ দিয়ে নিরাপদ করা হয়েছে। এছাড়া, শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং বাংলাদেশ নৌ বাহিনীর ঘাঁটি বিএনএস ঈসা খান পতেঙ্গার কাছেই অবস্থিত।

ফয়’স লেক : 
চট্টগ্রামের আরেক জনপ্রিয় স্থান হলো ফয়’স লেক, যা পূর্বে পাহাড়তলী লেক নামে পরিচিত ছিল। এই কৃত্রিম হ্রদটি পাহাড়তলীর খুলশী এলাকার প্রধান সড়কের পাশেই অবস্থিত। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, পাখি দেখা এবং নৌকা ভ্রমণের জন্য এটি একটি আকর্ষণীয় স্থান। এখানে পাহাড়ির মধ্যে ঘুরতে এবং নৌকায় সওয়ারি হওয়া উপভোগ্য।

ফয়’স লেকের প্রধান আকর্ষণ হলো এর পাহাড়ি পরিবেশ, যেখানে আপনি বন্ধুবান্ধব বা পরিবার নিয়ে সময় কাটাতে পারবেন। লেকের পাড়ে অবস্থান করে এখানে নৌকায় ভ্রমণ করা এক দারুণ অভিজ্ঞতা। এছাড়া, এখানে রয়েছে একটি পানির ফোয়ারা, আধুনিক রাইডের অ্যামিউজমেন্ট পার্ক এবং পর্যবেক্ষণ টাওয়ার থেকে চট্টগ্রাম শহরের বার্ডস আই ভিউ দেখার সুযোগ।

নেভাল সমুদ্র সৈকত : 
নেভাল সমুদ্র সৈকত, পতেঙ্গার পূর্ব দিকে অবস্থিত, কর্ণফুলী নদী এবং বঙ্গোপসাগরের মোহনাতে সুন্দরভাবে মিশে আছে। এখানে সাগরের শান্ত পরিবেশ এবং শীতল বাতাস মুগ্ধ করে। এটি চট্টগ্রামবাসীর কাছে একটি জনপ্রিয় স্থানে পরিণত হয়েছে। শহরের যান্ত্রিকতা থেকে মুক্তি পেতে মানুষ এখানে আসে। এর পাশাপাশি কাঁকড়া ভাজা এবং পেঁয়াজু মজাদার খাবারগুলোও এই স্থানটির অন্যতম আকর্ষণ।

স্বাধীনতা কমপ্লেক্স (মিনি বাংলাদেশ) : 
চট্টগ্রাম শহরের চান্দগাঁও থানায় অবস্থিত স্বাধীনতা কমপ্লেক্স একটি থিম পার্ক, যা বাংলাদেশের বিভিন্ন ঐতিহাসিক স্থাপনা এবং দৃষ্টিনন্দন স্থানের পুনর্নির্মাণ করে তৈরি করা হয়েছে। এখানকার প্রধান আকর্ষণ হলো বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ ভবন, আহসান মঞ্জিল, সুপ্রিম কোর্ট, কার্জন হল, কান্তজীর মন্দির, দরবার হল, পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহার ইত্যাদি।

এই থিম পার্কটির একটি বিশেষ অংশ হলো স্বাধীনতা টাওয়ার, যার উচ্চতা ২৩ তলা (৭১ মিটার) এবং এখানে একটি ঘূর্ণায়মান রেস্তোরাঁও রয়েছে। রেস্তোরাঁ থেকে চট্টগ্রাম শহর, কর্ণফুলী নদী এবং বঙ্গোপসাগরের দৃশ্য দেখা যায়, যা সত্যিই অসাধারণ।

সিআরবি : 
চট্টগ্রাম শহরের একটি অন্যতম প্রাচীন এবং ঐতিহাসিক স্থাপনা হলো সিআরবি (Central Railway Building), যা বর্তমানে একটি শান্তিপূর্ণ এবং প্রাকৃতিক পরিবেশের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এখানে আসলে আপনি পাবেন চট্টগ্রামের নাগরিক জীবনের কোলাহল থেকে একটু দূরে নিরিবিলি পরিবেশ, যেখানে প্রকৃতি এবং শান্তি মিলে এক অভূতপূর্ব পরিবেশ তৈরি করেছে। সিআরবির পুরো এলাকা আচ্ছাদিত পাহাড়, বন-বনানী, এবং দৃষ্টিনন্দন আঁকা-বাঁকা রাস্তা দ্বারা ঘেরা।

সিআরবির সাত রাস্তার মোড় থেকে গড়ে তোলা হয়েছে একটি সুন্দর ওয়াকওয়ে যেখানে আপনি হাঁটতে হাঁটতে প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারেন। এখানকার মনোরম পরিবেশে নির্মিত হয়েছে শিরীষতলা—যেখানে বসে আড্ডা দিতে, খেলা করতে এবং প্রকৃতির মাঝে অবসর কাটাতে পারেন। এখানে মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের স্মৃতিফলক এবং ১৮৯৯ সালের তৈরি একটি বাষ্পীয় রেল ইঞ্জিনের মডেলও দর্শনার্থীদের নজর কাড়ে।

চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানা : 
নগরবাসীর জন্য একটি অন্যতম বিনোদন কেন্দ্র হলো চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানা, যা ১৯৮৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং এটি ফয়’স লেকের পাশে সবুজে ঘেরা একটি বনাঞ্চলে অবস্থিত। চট্টগ্রামের পাহাড়তলী এলাকায়, ইউএসটিসি মেডিকেল কলেজের বিপরীতে, ১০ দশমিক ২ একর জমির ওপর এই চিড়িয়াখানা গড়ে উঠেছে।

এখানে বর্তমানে ৭২ প্রজাতির প্রায় ৩৫০টি প্রাণী রয়েছে, যার মধ্যে ৩০ প্রজাতির স্তন্যপায়ী, ৩৮ প্রজাতির পাখি, এবং ৪ প্রজাতির সরীসৃপ রয়েছে। চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানা একটি আদর্শ জায়গা, যেখানে শিশুরা প্রাণীজগৎ সম্পর্কে জানার পাশাপাশি পরিবারসহ বিশ্রাম নিতে এবং আনন্দ করতে পারেন।

জাম্বুরি পার্ক : 
চট্টগ্রামের জাম্বুরি পার্ক একটি উন্মুক্ত উদ্যান, যা আগ্রাবাদের এস এম মোরশেদ সড়কে অবস্থিত। এটি একটি সুন্দর স্থান যেখানে দর্শনার্থীরা প্রকৃতির মাঝে ঘুরতে এবং বিশ্রাম নিতে পারেন। পার্কটির বিশেষত্ব হলো এর চক্রাকার হাঁটার পথ, যা উদ্যানের চারপাশে অবস্থিত, এবং ৮,০০০ রানিং ফুট দীর্ঘ জলাধার। এই জলাধারের পাশে তিনটি বিশাল গ্যালারি রয়েছে যেখানে বসে বিশ্রাম নিতে পারেন।

পার্কটিতে রয়েছে দুটি পাম্প হাউস এবং প্রায় ৫৫০টি আলোক বাতি, যা রাতের বেলাতেও পার্কটিকে আলো করে তোলে। বর্ণিল ফোয়ারা তার সৌন্দর্য আরও বৃদ্ধি করে। উদ্যানের চারপাশে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাও রয়েছে, যেমন দুটি টয়লেট ব্লক, একটি গণপূর্ত রক্ষণাবেক্ষণ অফিস এবং একটি বৈদ্যুতিক উপকেন্দ্র।

এখানে রোপণ করা হয়েছে নানা ধরনের গাছ, যেমন সোনালু, নাগেশ্বর, চাঁপা, রাধাচূড়ার মতো ৬৫ প্রজাতির প্রায় ১০ হাজার গাছের চারা, যা পার্কটিকে আরও সবুজ ও রঙিন করে তোলে।

চট্টগ্রাম ওয়ার সিমেট্রি : 
চট্টগ্রাম ওয়ার সিমেট্রি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নিহত সৈনিকদের স্মরণে একটি সমাধিক্ষেত্র। এটি চট্টগ্রাম মহানগরের বাদশা মিঞা সড়ক (জয়নগর মৌজা) এলাকায় অবস্থিত এবং চট্টগ্রাম শহর থেকে প্রায় ৪ কিলোমিটার দূরে এক পাহাড়ি অঞ্চলে সুশৃঙ্খলভাবে প্রতিষ্ঠিত।

এই সমাধিক্ষেত্রটি মূলত কমনওয়েলথ ওয়ার গ্রেভস কমিশন দ্বারা রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়। এখানে মোট ৭৫৫টি সৈনিকের কবর রয়েছে, যারা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পূর্ব রণাঙ্গনে নিহত হয়েছিলেন। যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে এখানে ছিল মিত্র শক্তির চতুর্দশ বাহিনীর অগ্রবর্তী শিবির এবং ব্রিটিশ জেনারেল হাসপাতাল নম্বর ১৫২। ১৯৪৪ থেকে ১৯৪৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত এই হাসপাতালটি সক্রিয় ছিল।

যুদ্ধ শেষে এখানে আনুষ্ঠানিকভাবে অন্যান্য অস্থায়ী সমাধি স্থান থেকে সৈনিকদের মৃতদেহ আনা হয়। এর মধ্যে লুসাই, ঢাকা, খুলনা, যশোর, কক্সবাজার, রাঙ্গামাটি সহ বিভিন্ন স্থান থেকে কবরের স্থানান্তরিত মৃতদেহগুলো এখানে সমাধিস্থ করা হয়। এছাড়া, সমাধিক্ষেত্রের একটি স্থাপনায় রাখা রয়েছে রেজিস্টারে ৬,৫০০ জন যুদ্ধে নিহত নাবিক ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নাম এবং ১৫টি ডুবে যাওয়া জাহাজের নাম।

বাটালি হিল : 
চট্টগ্রাম শহরের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত বাটালি হিল চট্টগ্রামের সবচেয়ে উঁচু পাহাড়, যা টাইগার পাস এলাকায় অবস্থিত। এর উচ্চতা প্রায় ২৮০ ফুট, এবং এটি শতায়ু অঙ্গন নামক স্থানে পৌঁছানোর মাধ্যমে চট্টগ্রাম শহরের এক অবিস্মরণীয় দৃশ্য উপভোগ করতে সক্ষম। এখান থেকে বঙ্গোপসাগর এবং শহরের বেশিরভাগ এলাকা এক নজরে দেখা যায়।

বাটালি হিলের চূড়ায় পৌঁছানোর রাস্তাটি অত্যন্ত আকর্ষণীয়, কারণ এটি জিলাপির প্যাঁচের মতো ঘুরে-ঘুরে উঠে গেছে, যা হাঁটতে হাঁটতে এক নতুন অভিজ্ঞতা তৈরি করে। এখানে আপনি পাবেন এক রকমের জঙ্গলের মুগ্ধতা, যা প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য এক পরিপূর্ণ অভিজ্ঞতা।

২০০৩ থেকে ২০০৫ সালের মধ্যে বাংলাদেশ পুলিশ এখানে প্রায় ১২,৫০০ গাছের চারা রোপণ করেছে, যার মধ্যে রয়েছে জলপাই, কাঁঠাল, আম, লিচু, কমলা সহ আরও অনেক প্রজাতির গাছ।

প্রজাপতি পার্ক : 
প্রজাপতি পার্ক (বা বাটারফ্লাই পার্ক) চট্টগ্রামের পতেঙ্গা নেভাল একাডেমি সড়কে অবস্থিত, এবং এটি ভারতীয় উপমহাদেশের প্রথম প্রজাপতি পার্ক হিসেবে পরিচিত। প্রায় ৬ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত এই পার্কে ৬০০ প্রজাতির প্রজাপতি রয়েছে। পার্কের মধ্যে রয়েছে একাধিক সেবা অঞ্চল, যেমন বাটারফ্লাই জোন, বাটারফ্লাই মিউজিয়াম, কৃত্রিম হ্রদ ও ঝর্ণা, ফিশফিডিং জোন, এবং বাটারফ্লাই ফিডিং জোন।

এই পার্কের বিশেষত্ব হলো প্রজাপতিদের উড়ন্ত দৃশ্য। সাধারণত, সকাল ৯টা থেকে ১১টা এবং বিকেলের দিকে প্রজাপতিরা উড়ে বেড়ায়। তবে, সন্ধ্যার আগে থেকেই তারা ঝোপের মধ্যে চলে যায়। প্রতিদিন পার্কটি সকাল ৯টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত খোলা থাকে।

ভাটিয়াড়ী : 
চট্টগ্রামের ভাটিয়াড়ী এলাকা এক অপূর্ব প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের মিলনস্থল, যেখানে সমুদ্র এবং পাহাড়ের সমন্বয় দেখতে পাওয়া যায়। এটি ভাটিয়াড়ী ইউনিয়নে অবস্থিত, এবং চট্টগ্রাম শহর থেকে ১৫ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত।

ভাটিয়াড়ী তার শান্ত পরিবেশ, প্রাচীন ঝরনা এবং সবুজ প্রকৃতির জন্য পরিচিত। এখানে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর গলফ কোর্স রয়েছে, যেখানে আপনি গলফ খেলার পাশাপাশি পরিবেশের শান্তি উপভোগ করতে পারেন। ভাটিয়াড়ীর বিশেষ আকর্ষণ হলো সানসেট পয়েন্ট, যেখানে আপনি চমৎকার সূর্যাস্ত দেখতে পারবেন।

এটি পিকনিকের জন্যও একটি আদর্শ স্থান, যেখানে সবুজ প্রকৃতি এবং বিশুদ্ধ বাতাস মনকে প্রশান্তি দেয়।

মহামায়া লেক : 
চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার মহামায়া লেক বাংলাদেশে দ্বিতীয় বৃহত্তম কৃত্রিম হ্রদ হিসেবে পরিচিত। এর আয়তন প্রায় ১১ বর্গ কিলোমিটার, এবং এটি দুর্গাপুর ইউনিয়নের ঠাকুদিঘী বাজার থেকে মাত্র দুই কিলোমিটার পূর্বে অবস্থিত। এই মহামায়া লেকে রয়েছে নানা প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, যেমন পাহাড়ি গুহা, রাবার ড্যাম, এবং ঝর্ণা।
লেকের ঝর্ণার পানিতে গোসল করা এক অদ্ভুত অনুভূতি, যা প্রকৃতি প্রেমীদের জন্য এক বিশেষ অভিজ্ঞতা। এখানে আসলে মন ও শরীর উভয়ই প্রশান্তি লাভ করে।

বোটানিক্যাল গার্ডেন ও ইকোপার্ক : 
সীতাকুণ্ড উপজেলার চন্দ্রনাথ রিজার্ভ ফরেস্ট ব্লক এ অবস্থিত এই বোটানিক্যাল গার্ডেন এবং ইকোপার্ক প্রকৃতি প্রেমীদের জন্য এক আদর্শ স্থান। এটি চন্দ্রনাথ মন্দিরের পাদদেশে এবং সীতাকুণ্ড উপজেলা সদর থেকে দুই কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত। 
এই পার্কে উঁচুনিচু পাহাড়, বন্যপ্রাণী এবং অর্কিডসহ ৫০ প্রজাতির অর্কিড দেখতে পাওয়া যায়। সহস্রধারা এবং সুপ্তধারা নামক দুটি ঝর্ণা, যা এই পার্কে অবস্থান করছে, সত্যিই মনোমুগ্ধকর। এখানে প্রায় ১৫০ প্রজাতির ফুল এবং দেশি-বিদেশি নানা ধরনের ঔষধি গাছও রয়েছে। এই স্থানটি প্রকৃতির নানা রূপ দেখতে চান এমন পর্যটকদের জন্য এক স্বর্গ।

সহস্রধারা ঝরনা : 
সহস্রধারা ঝরনা চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড ইকোপার্কে অবস্থিত, যা চন্দ্রনাথ রিজার্ভ ফরেস্ট এর অংশ। এই ঝর্ণার সৌন্দর্য বর্ষাকালে সবচেয়ে বেশি প্রকাশ পায়, যখন পানি উচ্ছলভাবে ঝরে পড়ে।
চট্টগ্রাম শহর থেকে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার উত্তর অবস্থান করা এই ঝর্ণা, ইকোপার্কের মূল গেট থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার হেঁটে গিয়ে পৌঁছানো যায়। প্রকৃতির সাথে একাত্ম হয়ে এই ঝর্ণা দেখতে আসলে এক অদ্ভুত শান্তি অনুভূত হয়।

সুপ্তধারা ঝরনা : 
সুপ্তধারা ঝরনা আরও একটি মনোমুগ্ধকর ঝর্ণা যা সীতাকুণ্ড ইকোপার্কে অবস্থিত। এই ঝর্ণার রূপ বর্ষাকালে বিশেষভাবে আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। পার্কের ভেতরে কিছুটা ভেতরে গেলে সবুজ পরিবেশে ঘেরা এই ঝর্ণার অসাধারণ দৃশ্য দেখতে পাওয়া যায়।
এই ঝর্ণাটি সহস্রধারা ঝর্ণার তুলনায় সহজেই পৌঁছানো যায় এবং এর সৌন্দর্য অন্যরকম।

খৈয়াছড়া ঝর্ণা : 
চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার খৈয়াছড়া ইউনিয়নে অবস্থিত খৈয়াছড়া ঝর্ণা প্রকৃতির এক অসাধারণ সৃষ্টি। এই ঝর্ণাটির মধ্যে রয়েছে ৯টি বড় ধাপ (ক্যাসকেড) এবং অনেক ছোট ছোট বিচ্ছিন্ন ধাপ। এখানে আসলে আপনি উপভোগ করতে পারবেন দুর্গম পাহাড়ি পথে হাঁটা, ঝিরিপথ পেরিয়ে ঝর্ণার কাছে পৌঁছানো, যা এক বিশাল রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা।
ঝর্ণাটি ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ৪.২ কিলোমিটার পূর্বে অবস্থিত বড়তাকিয়া বাজারের উত্তর পাশে। পুরো এলাকা ঘিরে আছে প্রকৃতির অপূর্ব সৌন্দর্য এবং শান্ত পরিবেশ, যা প্রাকৃতিক সৌন্দর্য প্রেমীদের জন্য এক স্বর্গ।

গুলিয়াখালী সমুদ্র সৈকত : 
গুলিয়াখালী সমুদ্র সৈকত চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড বাজার থেকে ৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত, এবং এটি অন্যান্য সমুদ্র সৈকতের তুলনায় একদম ভিন্ন ধরনের পরিবেশ তৈরি করে। সৈকতের চারপাশে রয়েছে কেওড়া বন, যেখানে ছোট ছোট খাল এবং কেওড়া গাছের শ্বাসমূল সমুদ্রের মধ্যে বিস্তৃত। এই বনটি সোয়াম্প ফরেস্ট ও ম্যানগ্রোভ বনের মতো, যা সৈকতের সৌন্দর্যকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলে।
এখানে এসে আপনি একদিকে বিস্তীর্ণ সমুদ্র দেখতে পাবেন, অন্যদিকে ঘেরা থাকবে সবুজ গালিচা। গুলিয়াখালীর এই দৃষ্টিনন্দন সৌন্দর্য একেবারে আলাদা, এবং এখানে আসলে আপনি প্রকৃতির সান্নিধ্যে সত্যিই বিশ্রাম পেতে পারবেন।

চন্দ্রনাথ পাহাড় : 
চন্দ্রনাথ পাহাড় সীতাকুণ্ডের ৪ কিলোমিটার পূর্বে অবস্থিত। এই পাহাড়টির উচ্চতা প্রায় ১,২০৬ ফুট, এবং এটি চট্টগ্রামের ট্রেকিং প্রেমীদের জন্য অত্যন্ত জনপ্রিয় গন্তব্য। পাহাড়ের চূড়ায় উঠে আপনি একদিকে সাগর আর অন্যদিকে সবুজ পাহাড় দেখতে পাবেন।
এই পাহাড়টি শান্তিপূর্ণ, দুর্গম পথ এবং সবুজ গাছপালা দ্বারা ঘেরা, যা মনকে প্রশান্তি দেয়। চন্দ্রনাথের চূড়ায় দাঁড়িয়ে আপনি পুরো সীতাকুণ্ড উপজেলা এক নজরে দেখতে পাবেন, যা অনেকটা স্বপ্নের মতো অনুভূতি। যদি আপনি প্রকৃতির মাঝে হারিয়ে যেতে চান, তবে চন্দ্রনাথ পাহাড় আপনাকে সে সুযোগ দেবে।

বাড়ৈয়াঢালা জাতীয় উদ্যান : 
চট্টগ্রামের সীতাকুন্ড ও মীরসরাইয়ের বাড়ৈয়াঢালা জাতীয় উদ্যান একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পরিবেশবান্ধব পর্যটন স্পট। ২০১০ সালে এটি সংরক্ষিত বনাঞ্চল হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এখানে রয়েছে ২৫০ প্রজাতির গাছ এবং ১৫০ প্রজাতির পাখি, যার মধ্যে বন ছাগল, বন কুকুর, মেটে কাঠমৌর, কালাপিঠ চেরালেজ সহ নানা বিরল প্রাণী ও পাখি পাওয়া যায়।
এছাড়া, এই উদ্যানের চারপাশে অনেক প্রাকৃতিক ঝর্ণা ছড়িয়ে রয়েছে। স্থানীয় জনগণের সহায়তায় ইউএসএআইডি ক্রেল প্রকল্প এর মাধ্যমে একে অভয়ারণ্য হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছে। এখানে গেলে আপনি প্রকৃতির এক অপূর্ব সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারবেন।

নাপিত্তাছড়া ঝরনা : 
নাপিত্তাছড়া ঝরনা চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ের পাহাড়ে অবস্থিত একটি অসাধারণ জলপ্রপাত। এতে কুপিকাটাকুম, মিঠাছড়ি, বান্দরকুম—এই তিনটি ঝরনা রয়েছে, যেখানে বান্দরকুমটি সবচেয়ে উঁচুতে। বর্ষাকালে ঝরনাগুলোর পানি প্রবাহিত হয়ে আরও মোহময় হয়ে ওঠে।
এই ঝরনাগুলো পৌঁছানোর পথ নাপিত্তাছড়া ট্রেইল নামে পরিচিত, যেখানে ছোট ছোট পাথর দিয়ে পথ তৈরি করা হয়েছে। মারমা উপজাতির বসবাসের জন্য এই জায়গাটি একটি সাংস্কৃতিক এবং প্রাকৃতিক মিশ্রণও।

হাজারিখিল বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য : 
হাজারিখিল বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলায় অবস্থিত, যা রামগড়-সীতাকুণ্ড বনাঞ্চলের মধ্যে পড়ে। এই অভয়ারণ্যে মোট ১২৩ প্রজাতির পাখি দেখা যায়, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কাঠময়ূর, মথুরা, কাউ ধনেশ, হুতুম পেঁচা।
এই অঞ্চলে পরিযায়ী পাখির দল শীতকালীন সময়ে আসলে এটি আরও বেশি জীবন্ত হয়ে ওঠে। নানা প্রজাতির পাখি ও উদ্ভিদের সমারোহে এই অভয়ারণ্য পাখিপ্রেমীদের জন্য এক স্বর্গরাজ্য। বাংলাদেশ বন গবেষণা ইনস্টিটিউটের গবেষণায় এখানে এমন কিছু পাখি পাওয়া গেছে যা অন্য কোথাও দেখা যায় না।

সন্দ্বীপ : 
সন্দ্বীপ চট্টগ্রামের এক মনোমুগ্ধকর দ্বীপ, যা বঙ্গোপসাগরের মেঘনার মোহনায় অবস্থিত। এটি “সাগর কন্যা দ্বীপ” নামে পরিচিত এবং এখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য একেবারে অনন্য।
সন্দ্বীপের সবুজ চর বা গ্রিনল্যান্ড এক বিশেষ আকর্ষণ, যা দীর্ঘাপাড়া ইউনিয়নে অবস্থিত। এখানকার সবুজ ঘাসের গালিচা এবং প্রশান্ত পরিবেশ আপনাকে এক অনন্য অভিজ্ঞতা দেবে। সন্দ্বীপের চারপাশে জেগে ওঠা চর এলাকা যেমন উড়ির চর, কালাপানি, কালিয়ার চর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরা। এখানকার প্রকৃতি, নদী এবং সমুদ্রের সংমিশ্রণ আপনাকে মুগ্ধ করবে।

বাঁশখালী ইকোপার্ক : 
দক্ষিণ চট্টগ্রামের বাঁশখালী ইকোপার্ক প্রকৃতির এক অনন্য রূপ। উঁচু-নিচু পাহাড়, ঝলমলে লেকের পানি, সবুজ বনাঞ্চল, এবং বঙ্গোপসাগরের বিস্তৃত তটরেখা এখানে এক চমৎকার পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। ২০০৩ সালে ১ হাজার হেক্টর বনভূমি নিয়ে গঠিত এই ইকোপার্ক শীলকূপ ইউনিয়ন এবং বামেরছড়া ও ডানেরছড়া এলাকা নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়।
এটি জলদি অভয়ারণ্য রেঞ্জের জলদি ব্লকে অবস্থিত এবং এটি চুনতি অভয়ারণ্যের অংশ হিসেবে পরিবেশ রক্ষা ও বনজ সম্পদের সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এই অঞ্চলে ছোট-বড় পাহাড়, খাল, ছড়া এবং নানা প্রজাতির প্রাণী দেখা যায়, যা প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য এক দারুণ গন্তব্য।

পারকী সমুদ্র সৈকত : 
পারকী সমুদ্র সৈকত আনোয়ারা উপজেলায় অবস্থিত, যা কর্ণফুলী নদীর মোহনায় অবস্থিত একটি দৃষ্টিনন্দন সমুদ্র সৈকত। চট্টগ্রাম শহর থেকে মাত্র ২৫ কিলোমিটার দূরে এই সৈকতটি সহজেই পৌঁছানো যায়।
এটি সুরম্য ঝাউবন আর একটানা বিস্তৃত সৈকতের জন্য বিশেষভাবে পরিচিত। এখানে সূর্যাস্তের দৃশ্য একেবারে অতুলনীয়, এবং সৈকত বরাবর হাঁটাহাঁটি বা হালকা জলখাবার উপভোগ করারও সুযোগ রয়েছে। সমুদ্রের নৈসর্গিক সৌন্দর্য, ঘোড়া চড়া বা রাইডিং বোটের আনন্দ, সব মিলিয়ে পারকী সৈকত একটি একেবারে রিল্যাক্সিং গন্তব্য।

চুনতি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য : 
চট্টগ্রামের লোহাগড়া উপজেলায় অবস্থিত চুনতি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য একটি চিরসবুজ বনাঞ্চল যা ক্রান্তীয় মিশ্র-চিরহরিৎ বনভূমি হিসেবে পরিচিত। এখানে প্রায় ৪৭৭ প্রজাতির গাছ এবং ১২ লাখেরও বেশি গাছ রয়েছে।
এটি এশীয় হাতি সহ নানা বিরল প্রজাতির প্রাণীর বাসস্থান। এই অভয়ারণ্যটি চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের পাশেই অবস্থিত এবং বিশেষত পাহাড়ি অঞ্চলের গর্জন বেল্টের অংশ। সারা বিশ্ব থেকে প্রকৃতিপ্রেমীরা এখানে আসেন প্রকৃতির বুকে সময় কাটানোর জন্য।

Single Sidebar Banner
  • সর্বশেষ
  • পঠিত