বুধবার, ১ এপ্রিল ২০২৬
Single Top Banner

চবির সংঘর্ষ : একজনের খুলি ফ্রিজে, আরেকজন লাইফ সাপোর্টে

নিজস্ব প্রতিবেদক :

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে গুরুতর আহত দুই শিক্ষার্থী এখন জীবন-মৃত্যুর লড়াই লড়ছেন। একজনের মাথার হাড় খুলে ফ্রিজে রাখা হয়েছে, অন্যজন এখনো লাইফ সাপোর্টে। পরিবারের স্বপ্ন ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ভেঙে গেছে রক্তাক্ত বাস্তবতার কাছে।

সমাজতত্ত্ব বিভাগের অনার্স শেষ বর্ষের ছাত্র মামুন মিয়া ক’দিন পরই শেষ করতেন শিক্ষাজীবন। চাকরিতে প্রবেশ করে সংসারের হাল ধরবেন— এমন স্বপ্ন ছিল পরিবারের। কিন্তু সেই মামুন এখন শয্যাশায়ী। রামদার কোপে তার মাথার খুলির গুরুতর ক্ষতি হয়েছে। অপারেশনে খুলির একাংশ সরিয়ে ফ্রিজে সংরক্ষণ করতে হয়েছে। ব্যান্ডেজে বড় অক্ষরে লেখা— “হাড় নেই, চাপ দেবেন না।”

ভাইয়ের শয্যার পাশে বসে কাঁদছিলেন মামুনের বড় ভাই মাসুদ রানা, যিনি টাঙ্গাইলে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। তিনি বলেন, “মামুন এখনো কথা বলতে পারছে। কিন্তু সে কি আর কখনো স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবে? যে আশা নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে পাঠালাম, সেটা আজ ধুলিস্মাৎ।”

অর্থনীতি বিভাগের মাস্টার্সের ছাত্র ইমতিয়াজ আহমেদ সায়েমের অবস্থা আরও ভয়াবহ। রোববারের সংঘর্ষে ধারালো অস্ত্রের কোপ পড়ে তার মাথায়। জরুরি অস্ত্রোপচারের পর চার দিন কেটে গেছে, কিন্তু তার চোখ খোলেনি। তিনি নগরের পার্কভিউ হাসপাতালের আইসিইউতে লাইফ সাপোর্টে আছেন।

সায়েমের বাবা মোহাম্মদ আমির হোসেন ছেলের খোঁজ শুনে বগুড়া থেকে ছুটে আসেন চট্টগ্রামে। হাসপাতালের করিডোরেই দিন-রাত পার করছেন। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, “অনেকবার ছেলেকে বলেছিলাম, মারামারির কাছে যাস না। কিন্তু সে বলল, আহত বন্ধুদের হাসপাতালে নিতে যাচ্ছে। কিছুক্ষণ পর খবর এল— আমার ছেলেকে কুপিয়ে রক্তাক্ত করেছে সন্ত্রাসীরা। একজন মানুষ আরেকজনকে কীভাবে এতটা নির্মম হতে পারে?”

চিকিৎসকরা বলছেন, সায়েমের খুলির ভেতরের অংশ ও রক্তনালী মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পার্কভিউ হাসপাতালের স্পেশালাইজড ইউনিটের ইনচার্জ ডা. সিরাজুল মোস্তফা জানান, “এখনো জ্ঞান ফেরেনি। শুধু রক্তচাপ কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এসেছে। অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক।” মামুন সম্পর্কে তিনি বলেন, “তার উন্নতি হচ্ছে। খুলি দুই-আড়াই মাস পর পুনঃস্থাপন করা হবে। তবে দীর্ঘ সময়ের জন্য তাকে শারীরিক সীমাবদ্ধতায় ভুগতে হবে।”

উল্লেখ্য, শনিবার রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ২ নম্বর গেট এলাকায় এক নারী শিক্ষার্থীকে লাঞ্ছিত করার ঘটনার প্রতিবাদে শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে নামলে তা গ্রামবাসীর সঙ্গে সংঘর্ষে রূপ নেয়। এ ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য, প্রক্টরসহ প্রায় ৪০০ জন আহত হন। তাদের মধ্যে অন্তত তিনজনের অবস্থা এখনও আশঙ্কাজনক।

চবির দুই তরুণ শিক্ষার্থী এখন হাসপাতালের শয্যায় মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন। তাদের চোখভরা স্বপ্ন থমকে গেছে এক ঝলক সহিংসতায়। পরিবার, সহপাঠী ও শিক্ষকরা আজ প্রার্থনা করছেন— মামুন ও সায়েম যেন বেঁচে ওঠেন, ফিরতে পারেন স্বাভাবিক জীবনে।

Single Sidebar Banner
  • সর্বশেষ
  • পঠিত