বুধবার, ১ এপ্রিল ২০২৬
Single Top Banner

অনুমোদন ছাড়া চট্টগ্রাম বন্দরে এনএইচ অ্যাপারেলসের ৯২৬ মেট্রিক টন ফেব্রিকস আমদানি

নিজস্ব প্রতিবেদক :

চট্টগ্রাম বন্দরের মাধ্যমে কাস্টমস বন্ড কমিশনারেটের অনুমোদন ছাড়া প্রায় ৯২৬ দশমিক ৬১ মেট্রিক টন ফেব্রিকস আমদানির ঘটনায় তোলপাড় শুরু হয়েছে। ঢাকার পোশাক প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান মেসার্স এনএইচ অ্যাপারেলস লিমিটেড এলসিবিহীন বা ফ্রি অব কস্টে (এফওসি) ফেব্রিকস আমদানি করে খালাস নিয়ে গেছে। নিয়ম অনুযায়ী এত বড় পরিমাণ ফেব্রিকস আমদানি করতে হলে কমিশনারেটের প্রত্যয়নপত্রের প্রয়োজন ছিল। কিন্তু অনুমোদন ছাড়াই খালাস নেওয়ায় প্রতিষ্ঠানটিকে শোকজ নোটিশ দিয়েছে কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট। কেন তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে না, তা সাত দিনের মধ্যে লিখিতভাবে ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়েছে। তবে এখনো প্রতিষ্ঠানটি কোনো জবাব দেয়নি।

কাস্টমস সূত্রে জানা গেছে, এনএইচ অ্যাপারেলস ২০২৩ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৪ সালের ২২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ২৫২ দশমিক ৭২ মেট্রিক টন তৈরি পোশাক রফতানি করে, যেখানে ফেব্রিকসের ব্যবহার ছিল ২৯৫ দশমিক ৬৮ মেট্রিক টন। নিয়ম অনুযায়ী, এফওসির ভিত্তিতে আমদানির ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ ফেব্রিকস আমদানির অনুমতি রয়েছে। এর বাইরে অতিরিক্ত পণ্য আনতে হলে কমিশনারেটের প্রত্যয়নপত্র প্রয়োজন হয়। অথচ ২০২৪ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৫ সালের ২২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়ে এনএইচ অ্যাপারেলস এফওসির ভিত্তিতে ১ হাজার ১১৩ দশমিক ৭১ মেট্রিক টন ফেব্রিকস আমদানি করেছে। এর মধ্যে ১১৩ দশমিক ৯৭ মেট্রিক টন ফেব্রিকসের জন্য অনুমোদন দেওয়া হলেও তারা খালাস নিয়েছে মাত্র ৩৯ দশমিক ২৬ মেট্রিক টন। অনুমোদন ছাড়া খালাস করেছে ৯২৬ দশমিক ৬১ মেট্রিক টন ফেব্রিকস।

চট্টগ্রাম কাস্টমস বন্ড কমিশনারেটের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, নিয়ম ভেঙে বাড়তি পণ্য আনলে শুল্ক দিয়ে ছাড় নিতে হয়। কিন্তু এনএইচ অ্যাপারেলস অনুমোদন ছাড়া এত বড় পরিমাণ ফেব্রিকস খালাস নিয়েছে এবং শুল্ক ফাঁকি দিয়েছে। এ কারণে তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এই ঘটনায় চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউস এবং বন্দর এলাকায় তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। তবে প্রকাশ্যে কোনো কর্মকর্তা মন্তব্য করতে রাজি হননি। সংশ্লিষ্ট মহলের অভিযোগ, এ ধরনের ঘটনা বারবার ঘটছে, অথচ কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় ব্যবসায়ীদের মধ্যে অস্বচ্ছ প্রতিযোগিতা তৈরি হচ্ছে। শোকজ নোটিশে কাস্টমস আইন-২০২৩-এর ধারা ১১৮ ও ১২৬ ভঙ্গ এবং বন্ড লাইসেন্সের শর্ত লঙ্ঘনের অভিযোগ আনা হয়েছে। একই আইনের ধারা ১৭১ (১)-এর টেবিলভুক্ত ক্লজ ২, ২২ ও ২৩(২) অনুযায়ী এই অপরাধ দণ্ডনীয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

এমন ঘটনা এই প্রথম নয়। অতীতে চট্টগ্রাম কাস্টমসে নানা অনিয়ম ধরা পড়েছে। সম্প্রতি সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা রাজীব রায় ও তার সহযোগী মাইনুদ্দীনকে ঘুষ নেওয়ার সময় হাতেনাতে গ্রেফতার করা হয়। আবার বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধার অপব্যবহার করে বহু প্রতিষ্ঠান কাঁচামাল আমদানির পর সেগুলো স্থানীয় বাজারে বিক্রি করেছে, যা বাজার অস্থিরতার কারণ হয়েছে। চট্টগ্রাম কাস্টমসে ভুয়া ঘোষণার মাধ্যমেও শুল্ক ফাঁকি দেওয়ার ঘটনা ধরা পড়ে। এক ঘটনায় ২৮ মেট্রিক টন পণ্য কাঁচামাল হিসেবে ঘোষণা দেওয়া হলেও আসলে তা ছিল সোফা ও কার্টেনের ফেব্রিকস, যাতে প্রায় ৫০ লাখ টাকার শুল্ক ফাঁকি হয়।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই সব ঘটনা থেকে স্পষ্ট, এনএইচ অ্যাপারেলসের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বরং এটি চট্টগ্রাম কাস্টমসে দীর্ঘদিনের একটি প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা এবং দুর্নীতির প্রতিচ্ছবি। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, অনুমোদন ছাড়া এত বিপুল পরিমাণ ফেব্রিকস আমদানি কেবল কর্মকর্তাদের শৈথিল্যের কারণে সম্ভব হয়েছে। এর পেছনে প্রশাসনিক দুর্বলতা ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আঁতাতও থাকতে পারে।

শিল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারের জন্য এটি একটি বড় পরীক্ষা। যদি এনএইচ অ্যাপারেলসের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া হয়, তবে এটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত তৈরি করবে। অন্যথায় এ ধরনের অনিয়ম ভবিষ্যতেও চলতে থাকবে, যা রপ্তানি খাতের ভাবমূর্তি ও ন্যায্য প্রতিযোগিতা দুটোই নষ্ট করবে।

Single Sidebar Banner
  • সর্বশেষ
  • পঠিত