বুধবার, ১ এপ্রিল ২০২৬
Single Top Banner

সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অনন্য নিদর্শন: পাশাপাশি মসজিদ ও মন্দির

নিজস্ব প্রতিবেদক :

আঙিনার এক পাশে মসজিদ, অন্য পাশে মন্দির। অভিন্ন আঙিনায় পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়েন মুসল্লিরা, আর সকাল-সন্ধ্যা চলে পূজা-অর্চনা। তবুও কখনও কারও মধ্যে তৈরি হয়নি কোনো বিরোধ বা বিভেদ। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এই অনন্য চিত্র দেখা গেছে লালমনিরহাট, পঞ্চগড় ও কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ীতে।

লালমনিরহাট শহরে ১৮৩৬ সালে পুরানবাজার কালীমন্দির প্রতিষ্ঠিত হয়। তার প্রায় ৮০ বছর পর, ১৯১৫ সালে, মন্দির থেকে মাত্র দেড়-দুই ফুট দূরত্বে নির্মিত হয় ওয়াক্তিয়া মসজিদ। সময়ের পরিক্রমায় কালীমন্দিরের পাশে গড়ে ওঠে দুর্গামন্দির, আর ওয়াক্তিয়া মসজিদ পরিণত হয় পুরানবাজার জামে মসজিদে। আজও দুই সম্প্রদায়ের মানুষ পাশাপাশি শান্তিপূর্ণভাবে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালন করছেন।

কালীমন্দিরের প্রধান পুরোহিত সুমন চক্রবর্তী জানান, প্রতি বছরের মতো এবারও উৎসবমুখর পরিবেশে পূজা অনুষ্ঠিত হবে। নামাজের সময় মাইক ও ঢাক-ঢোল বন্ধ রাখা হবে। নামাজ শেষে সুগন্ধি ছড়াবে ধূপকাঠি, আবার শুরু হবে ঢাকের বাজনা। তিনি বলেন, যুগ যুগ ধরে চলা এই সম্প্রীতি আমরা ধরে রাখব। প্রতিমা তৈরির কারিগর পল্লব মালী জানান, মন্দিরের বাইরে পর্দা টেনে ভেতরে প্রতিমার কাজ করা হচ্ছে, এখন চলছে তুলির শেষ আঁচড়।

সম্প্রীতির আরেক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত পঞ্চগড়ের জিতাপাড়া এলাকায়। উপজেলা সদরের গরিনাবাড়ী ইউনিয়নের জিতাপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠের এক পাশে মসজিদ, অন্যপাশে পূজামণ্ডপ। ৩০ বছরের বেশি সময় ধরে এ মাঠে মুসল্লিরা নামাজ আদায় করছেন, আর পাশেই পূজামণ্ডপে চলে দুর্গোৎসব। নামাজের সময় বন্ধ থাকে সব ধরনের মাইক, ঢাক-ঢোল ও গান-বাজনা। পূজা উদযাপন কমিটি ও মসজিদ কমিটি আলোচনার মাধ্যমে ধর্মীয় অনুষ্ঠান নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করে আসছেন।

স্থানীয় বাসিন্দা সুমন চন্দ্র রায় বলেন, “২৫/৩০ বছর ধরে জিতাপাড়া সার্বজনীন পূজামণ্ডপে দুর্গোৎসব পালন করছি। পাশেই মসজিদ। মুসল্লিরা নামাজ পড়েন, আমরা পূজা করি। নামাজের সময় আমরা সব ধরনের বাজনা বন্ধ রাখি।” পূজামণ্ডপের সাধারণ সম্পাদক জয়দেব বর্মণ জানান, “২৪ বছর ধরে এখানে পূজা করছি। কখনও কোনো সমস্যা হয়নি। মুসল্লিরা সব সময় আমাদের সহযোগিতা করেন।”

কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার কাছারি মাঠও অসাম্প্রদায়িক চেতনার এক অনন্য উদাহরণ। মাঠের এক পাশে কাছারি মাঠ জামে মসজিদ, অন্য পাশে কাছারি মাঠ দুর্গাপূজা মন্দির। মাত্র একশ গজ দূরত্বে অবস্থিত এ দুটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান প্রায় ৫০ বছর ধরে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের সাক্ষী হয়ে আছে। জানা গেছে, দেশ স্বাধীনের আগে জমিদার জগদীশ নারায়ণ বুত বাহাদুর এখানে দুর্গোৎসবের জন্য ছোট আকারে চালাঘর তৈরি করেছিলেন। পরে ফুলবাড়ী-লালমনিরহাট সড়কের জিরো পয়েন্টে নির্মিত হয় স্থায়ী মন্দির। অন্যদিকে আশির দশকের আগে ফুলবাড়ী বাজারে টিনশেড ঘরে নামাজ আদায় শুরু করেন মুসল্লিরা। বাজার সম্প্রসারণের জন্য ঘর ভেঙে ফেলা হলে কাছারি মাঠে গড়ে ওঠে মসজিদ।

ফুলবাড়ীর ইউএনও মেহেনুমা তারান্নম বলেন, ফুলবাড়ীর মানুষ অসাম্প্রদায়িক চেতনায় বিশ্বাসী। একই আঙিনায় পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকা মসজিদ ও মন্দির এই সম্প্রীতির উজ্জ্বল সাক্ষ্য বহন করছে।

Single Sidebar Banner
  • সর্বশেষ
  • পঠিত