উপার্জনক্ষম একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে পরিবারের হাল ধরে রাখা ৮৬ বছর বয়সী অশিতিপর পত্রিকা বিক্রেতা শেফালী পালের চলাচলের রাস্তায় ছাদ ঢালাইয়ের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। দীর্ঘদিন ধরে সংবাদপত্র বিতরণ করে জীবিকা নির্বাহ করা এই বৃদ্ধা হকার এখন সুবিচারের আশায় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন।
গত শুক্রবার রাতের আঁধারে কক্সবাজারের ঈদগাঁও সদর ইউনিয়নের পালপাড়ায় ঘটে এই চাঞ্চল্যকর ঘটনাটি। স্থানীয়দের ভাষ্য, বহু বছর ধরে শেফালী পালের পরিবার যে সরু পথে চলাচল করে আসছিল, সেই পথটি রাতের অন্ধকারে দখলে নিয়ে ছাদ ঢালাই শুরু করেন প্রতিবেশী বিমল চৌধুরীর ছেলে বিধু ভুষণ চৌধুরী ওরফে বিধু মিস্ত্রী। ঘটনাস্থলে উপস্থিত সূত্রগুলো জানায়—বৃদ্ধা শেফালী প্রতিবাদ করতে গেলে বিধু ও তার ছেলে সঞ্জিতের নেতৃত্বে ভাড়াটিয়ারা তাকে মারধর ও প্রাণনাশের হুমকি দেয়।

খবর পেয়ে ঈদগাঁও থানার পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। যদিও ততক্ষণে ছাদের কাজের বেশিরভাগই শেষ হয়ে যায়। এ ঘটনায় মারাত্মক মানসিক আঘাত পেলেও ন্যায্য অধিকার ফিরে পেতে এখনো লড়ে যাচ্ছেন অশীতিপর এই নারী।
শেফালী পাল জানান, “আমাদের ঘরের একমাত্র পথটা রাতের অন্ধকারে দখল করে ছাদ দিতে শুরু করে। বাধা দিলে তারা আমাকে মারধর করে এবং মেরে ফেলার হুমকি দেয়। এখন আমার যাওয়ার কোনো রাস্তা নেই।”
মামলার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন স্থানীয় ইউপি সদস্য বাবু ভেক্কা পাল। তিনি জানান, “রাতেই ছাদ ঢালাই করা হয়েছে। বিষয়টি অত্যন্ত অনাকাঙ্ক্ষিত।”
ঘটনাস্থল পরিদর্শনকারী ঈদগাঁও থানার এএসআই সুমন বড়ুয়া বলেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে কাজ বন্ধের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। তিনি জানান, পরিস্থিতি আরও খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।
ঈদগাঁও ইউপি চেয়ারম্যান (ভারপ্রাপ্ত) আবদুল হাকিম বলেন, উভয় পক্ষকে পরিষদে ডেকে বিষয়টি মীমাংসার চেষ্টা চলছে।
অন্যদিকে অভিযোগ অস্বীকার করে বিধু ভুষণ চৌধুরীর ছেলে সঞ্জিত দাবি করেন, জায়গাটি তাদেরই ক্রয়কৃত এবং তারা নিজেদের জায়গার ওপরই ছাদ নির্মাণ করেছেন। তার দাবি, “আমাদের জায়গার ওপর দিয়েই তারা এতদিন যাতায়াত করেছে। আমরা কোনো অবৈধ কাজ করিনি।”
এ ঘটনায় ঈদগাঁও আদর্শ সাংবাদিক পরিষদের নেতৃবৃন্দ তীব্র নিন্দা জানান এবং অবিলম্বে চলাচলের পথ পুনরুদ্ধারে প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেন।
প্রসঙ্গত, শেফালী পালের উপার্জনক্ষম একমাত্র সন্তান হকার স্বপনের মৃত্যু হয় দুই দশকেরও বেশি সময় আগে। তারপর থেকেই জীবনের কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে তিনি মৃত ছেলের রেখে যাওয়া পত্রিকা বিক্রির পেশাই আঁকড়ে ধরেন। দীর্ঘদিন ধরে বয়স্ক ও শারীরিকভাবে দুর্বল হয়েও শেফালী পাল উপজেলার একমাত্র জাতীয় ও আঞ্চলিক পত্রিকার হকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। কোনো কারণে তিনি নিজে পত্রিকা বিক্রিতে যেতে না পারলে পাঠকদের খবর থেকে বঞ্চিত না করতে কর্তব্যবোধ থেকে পুত্রবধূকে পাঠান পত্রিকা বিতরণে। মানুষের কাছে তিনি “শেফালী মাসী” নামে পরিচিত।
এমন অকুতভয় একটি নারীর চলাচলের রাস্তায় জোরপূর্বক ছাদ নির্মাণ স্থানীয় সমাজে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। এলাকাবাসীর দাবি—অবিলম্বে অবৈধ ছাদ অপসারণ এবং বৃদ্ধা হকারের পথ উন্মুক্ত করে তাকে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।


