২০২৪ সালের ৫ আগস্ট-এর ছাত্র–জনতার অভ্যুত্থানের পর দেশ ফ্যাসিস্টমুক্ত হলেও চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলা আজও সহিংসতা ও রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের বাইরে আসতে পারেনি বলে অভিযোগ করেছেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান (পদ স্থগিত) ও চট্টগ্রাম-৬ (রাউজান) আসনের বিএনপি প্রার্থী আলহাজ্ব গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী। তিনি দাবি করেছেন, অভ্যুত্থান-পরবর্তী ১৭ মাসে রাউজানে সংঘটিত ১৯টি হত্যাকাণ্ডের মধ্যে ১৩ জনই তার অনুসারী এবং সবাই বিএনপির আদর্শে বিশ্বাসী ছিলেন।
শুক্রবার (৯ জানুয়ারি) বিকেলে চট্টগ্রাম নগরের গুডস হিলে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘৫ আগস্টের পর রাউজানে শান্তির সুবাতাস বইবে বলে সবাই ভেবেছিল। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, আওয়ামী লীগের এজেন্ডা বাস্তবায়নকারী একটি গোষ্ঠী আগের মতোই রক্তপাত অব্যাহত রেখেছে।’
সংবাদ সম্মেলনে সর্বশেষ নিহত ক্যানসার আক্রান্ত যুবদল নেতা জানে আলম সিকদারের হত্যাকাণ্ডের প্রসঙ্গ তুলে ধরে গিয়াস কাদের চৌধুরী বলেন, ‘৫ আগস্টের পর যেসব হত্যাকাণ্ড ঘটেছে, তার অধিকাংশই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। নিহতদের একমাত্র অপরাধ—তারা আওয়ামী ফ্যাসিবাদের বিরোধী এবং শহীদ জিয়া, বেগম খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের আদর্শে বিশ্বাসী।’
তিনি অভিযোগ করেন, বিগত ১৭ বছর ধরে রাউজান ছিল আওয়ামী ফ্যাসিস্টদের নির্যাতনের অন্যতম কেন্দ্র। এই সময়ে বিএনপির প্রকৃত নেতা-কর্মীদের গুম, খুন, নির্যাতন, মিথ্যা মামলা এবং প্রকাশ্যে হত্যার শিকার হতে হয়েছে। এমনকি জুমার নামাজের সময় মসজিদ থেকে টেনে বের করে হত্যার ঘটনাও ঘটেছে বলে তিনি দাবি করেন।
গিয়াস কাদের চৌধুরী বলেন, “এক সময় রাউজানে একজন সাধারণ বিএনপি সমর্থকও নিরাপদে থাকতে পারেননি। নেতা-কর্মীরা মা–বাবার দাফন-কাফন, জানাজা ও ঈদের নামাজ পর্যন্ত পড়তে পারেননি। ধর্মীয় ও সামাজিক জীবন সম্পূর্ণভাবে স্তব্ধ করে দেওয়া হয়েছিল।”
তিনি অভিযোগ করেন, সেই সময় বিএনপি দাবিদার একটি ক্ষুদ্র গোষ্ঠী আওয়ামী লীগের সঙ্গে আঁতাত করে নিরাপদে রাউজানে অবস্থান করে ব্যবসা-বাণিজ্য চালিয়েছে। শুধু তাই নয়, চট্টগ্রাম শহরে আশ্রয় নেওয়া বিএনপি নেতা-কর্মীদের বাসা ও আত্মীয়স্বজনের ঠিকানা পুলিশকে সরবরাহ করেছিল তারা।
সংবাদ সম্মেলনে তিনি ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি নুরুল আলম নূরুকে বাসা থেকে তুলে নিয়ে হত্যার ঘটনা, বিএনপি কর্মী হেজা হাসেমকে পিটিয়ে হত্যা এবং মসজিদ চত্বরে মুসল্লিদের সামনে মুসা হত্যার বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি বলেন, “এই হত্যাকাণ্ডগুলোর প্রতিবাদে ওই গোষ্ঠী কখনো একটি বিবৃতিও দেয়নি; বরং আওয়ামী লীগের সঙ্গে উল্লাসে মেতে উঠেছিল।”
নিজের বিরুদ্ধে চালানো দমন-পীড়নের বর্ণনায় গিয়াস কাদের চৌধুরী বলেন, ২০১৭ সালে রমজান মাসে ফটিকছড়ির এক জনসভায় দেওয়া বক্তব্যের জেরে তার গুডস হিলের বাসভবনে হামলা ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। পরবর্তীতে একের পর এক মিথ্যা মামলায় তাকে ছয় মাস কারাভোগ করতে হয় এবং মাত্র ২০ মিনিটের শুনানিতে তিন বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয় বলে তিনি অভিযোগ করেন।
তিনি আরও বলেন, মিথ্যা মামলার ধারাবাহিকতায় তার বড় ভাই, সাবেক সংসদ সদস্য মরহুম সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীকেও হত্যা করা হয়েছে। তাকে হত্যার উদ্দেশ্যে রাউজানে তার গাড়িতে চারবার গুলিবর্ষণ করা হয়েছিল বলেও দাবি করেন তিনি।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে তিনি বলেন, সীমান্তের ওপার থেকে অবাধে অস্ত্র আসছে এবং হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই অপরাধীরা সীমান্ত পার হয়ে যাচ্ছে। তিনি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অস্ত্র উদ্ধার অভিযান জোরদারের দাবিতে চিঠি দিয়েছেন বলেও জানান।
সংবাদ সম্মেলনে তিনি অভিযোগ করেন, তার বক্তব্য বিকৃত করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো হচ্ছে। নির্বাচন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আসন্ন সংসদ নির্বাচন শতভাগ সুষ্ঠু হবে এবং দল তাকে চট্টগ্রাম-৬ (রাউজান) আসনে প্রার্থী হিসেবে সবুজ সংকেত দিয়েছে। দলীয় সিদ্ধান্ত মেনে তিনি কাজ করছেন বলেও জানান।
রাউজানের শান্তি ফিরিয়ে আনতে তিনি আওয়ামী এজেন্ডা বাস্তবায়নকারী একটি গোষ্ঠীর সন্তানকে জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটি থেকে অপসারণ এবং জানে আলম সিকদার হত্যাকাণ্ডসহ সব হত্যার সুষ্ঠু তদন্ত ও দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার জোর দাবি জানান।
সংবাদ সম্মেলনে রাউজান উপজেলা বিএনপির নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।


