চট্টগ্রাম নগরীতে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে সড়ক দুর্ঘটনা। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত নগরে ৩৮১টি দুর্ঘটনায় ৩৯৮ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন অন্তত ৬১১ জন। গত বছরের তুলনায় দুর্ঘটনার হার বেড়েছে প্রায় ১০ শতাংশ। বিভিন্ন হাসপাতাল, ট্রাফিক বিভাগ, বিআরটিএ ও সড়ক দুর্ঘটনা পর্যবেক্ষণকারী সংগঠনের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে এ তথ্য পাওয়া গেছে।
সম্প্রতি বাস থেকে নামতে গিয়ে দুর্ঘটনায় মৃত্যুর ঘটনা বেড়েছে। গত শনিবার নগরীর দুই নম্বর গেট এলাকায় সিটি সার্ভিসের একটি গাড়ি রিকশাকে চাপা দিলে শিক্ষিকা তানজিবা সাইফুল তিশমা ঘটনাস্থলেই মারা যান। তিনি ইংলিশ প্যাক স্কুলের শিক্ষিকা এবং হাজী মুহাম্মদ মহসীন কলেজের ইংরেজি বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী ছিলেন। এর আগে গত ৮ এপ্রিল লালখানবাজার এলাকায় চাকরিজীবী রিয়া মজুমদার বাস থেকে নামার সঙ্গে সঙ্গেই অন্য একটি বাসের নিচে চাপা পড়ে প্রাণ হারান। একইভাবে ২০২৩ সালের ১৪ মার্চ স্কুলশিক্ষিকা সাকিয়াতুল কাউচার বায়েজিদে দ্রুতগামী বাসের চাপায় নিহত হন। গত বছরের ১৫ এপ্রিল আউটার রিং রোডে দুর্ঘটনায় এশিয়ান ইউম্যান ইউনিভার্সিটির লাওসের শিক্ষার্থী ফুতফাফোনে জায়ডালা প্রাণ হারান। এছাড়া গত ১৮ আগস্ট ভোরে সিটি গেটে পিকআপ-ভ্যানের সংঘর্ষে পাঁচজন নিহত হন।
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির তথ্য অনুযায়ী, চলতি আট মাসে চট্টগ্রাম নগরের দুর্ঘটনার ৫০ শতাংশই চালকের অদক্ষতা ও অবহেলার কারণে ঘটেছে। সংগঠনটির দাবি, মালিক সমিতি ও শ্রমিক সংগঠনগুলো কম বেতনে অদক্ষ চালক নিয়োগ করছে। পরিবহন সেক্টরে মাদকের বিস্তার এবং চালকদের মোবাইল আসক্তিও দুর্ঘটনা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, শুধু লাইসেন্স প্রদানের সময় ডোপ টেস্ট করলেই হবে না, নিয়মিত চেকপোস্ট বসিয়ে হঠাৎ র্যাপিড ডোপ টেস্ট চালু করতে হবে। তবেই চালকদের মাদক নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে।
চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের ট্রাফিক (উত্তর) বিভাগের ডিসি নেছার উদ্দিন আহমেদ জানান, পুলিশ নিয়মিত বেপরোয়া চালকদের বিরুদ্ধে মামলা করছে, জরিমানা করছে এবং গাড়ি জব্দ করছে। তবে দক্ষ চালক নিয়োগ না হলে দুর্ঘটনা কমানো সম্ভব নয়। তিনি বলেন, কোনো কিছু যাচাই না করেই বিআরটিএ লাইসেন্স দিচ্ছে। এতে চালকের হাতে মৃত্যুর অস্ত্র তুলে দেওয়া হচ্ছে।
অন্যদিকে বিআরটিএ চট্টগ্রাম বিভাগের উপপরিচালক সৈয়দ আইনুল হুদা চৌধুরী অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, লাইসেন্স যথাযথ যাচাই-বাছাই করেই দেওয়া হয়। তিনি দাবি করেন, আমাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ ভিত্তিহীন। আমরা নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করছি।
চট্টগ্রামে দুর্ঘটনার প্রকৃত পরিসংখ্যান নিয়েও মতপার্থক্য রয়েছে। যাত্রী কল্যাণ সমিতি জানায়, আট মাসে ৩৯৮ জন নিহত হলেও বিআরটিএর হিসেবে ছয় মাসে নিহত ৫০ জন। ট্রাফিক বিভাগও যাত্রী কল্যাণ সমিতির সংখ্যার সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করছে। যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব বলেন, আমরা বিভিন্ন গণমাধ্যম ও হাসপাতাল থেকে তথ্য সংগ্রহ করে রিপোর্ট তৈরি করি। সরকারি সংস্থাগুলো দুর্ঘটনার সংখ্যা কম দেখানোর চেষ্টা করে।
পর্যবেক্ষকরা বলছেন, সরকারি সংস্থা ও বেসরকারি সংগঠনের পরিসংখ্যানের মধ্যে ফারাক থাকলেও একটি বিষয় স্পষ্ট—চট্টগ্রাম নগরীতে সড়ক দুর্ঘটনা দিন দিন বাড়ছে। এর পেছনে দায়ী ফিটনেসবিহীন যানবাহন, অদক্ষ ও মাদকাসক্ত চালক এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের গাফিলতি।


