জাহেদুল ইসলাম আরিফ :
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতাল। যেখানে চট্টগ্রাম বিভাগের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে প্রতিদিন হাজার হাজার রোগী ছুটে আসেন চিকিৎসা নিতে। তবে প্রতিদিনকার সমাগমে ৫ শতাংশ রোগীর ভিড়ে লুকিয়ে থাকে ‘দালাল’ নামে দুষ্ট সিন্ডিকেট। এসব দালালরা মূলত চমেক হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের ফুসলিয়ে বেসরকারি ক্লিনিক-হাসপাতালে পাঠাতে তৎপর। এ কাজে পুরুষদের পাশাপাশি তৎপর নারীরাও।
বর্তমানে চমেক হাসপাতালের বর্হিবিভাগে (আউটডোরে) প্রতিদিন আড়াই হাজার থেকে ৩ হাজার রোগী চিকিৎসা সেবা গ্রহণ করেন। প্রতিনিয়ত প্রায় ৩ হাজার রোগী ভর্তি থাকছে এই হাসপাতালের আন্তঃবিভাগে (ইনডোরে)। হাসপাতালটির অনুমোদিত শয্যা ২২০০ টি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গরিবের হাসপাতাল হিসেবে পরিচিত এ চমেক হাসপাতালে দালাল চক্রে পুরুষ ও নারী সদস্য মিলেই গড়ে তুলেছে সিন্ডিকেট। নারী সদস্যরা খুব সহজেই হাতে নিতে পারেন রোগীদের। তবে এসব নারী সদস্যদের উৎপাত সবচেয়ে বেশি হাসপাতালের ভেতর ওয়ার্ডগুলোতে। তাদের পাতানো ফাঁদে পা দিচ্ছেন রোগীরাও। এমন তথ্যই উঠে এসেছে সেবা নিতে আসা রোগীদের বক্তব্যে।
এসব দালাল চক্রের সদস্যরা হাসপাতাল অনুযায়ী বেঁধে দেয় মূল্য ছাড়ের পরিমাণ। অতঃপর নেওয়া হয় সরকারি হাসপাতাল থেকে বেসরকারি হাসপাতালে। ফলে সিণ্ডিকেটের কাছেই জিম্মি হাসপাতালে আসা সকল রোগী। এমনকি তাদেরকে টাকা দিলেই সহজেই মিলয়ে দেন চিকিৎসা সেবা। এসব চক্রের সাথে ওতপ্রোতভাবে সম্পৃক্ততা রয়েছে হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ডের দায়িত্বে থাকা অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সাথে। যাদের সহযোগিতায় চালানো হচ্ছে দালালী কার্যক্রম।
তবে বহিরাগত রোগী ও স্বজনদের একাংশ দালালদের খপ্পরে পড়ছে। এক্ষেত্রে শুধুই সাধারণ রোগীই নয়, মরণব্যাধি ক্যানসার, যক্ষ্মা, নিউমোনিয়াসহ সব ধরনের রোগীরা দালালদের খপ্পরে পড়ে হচ্ছেন প্রতারিত, হারাচ্ছেন অর্থ। অন্যদিকে হাসপাতালের একটি চক্র হাতিয়ে নিচ্ছে এসব অর্থ। যারা দালালদের নিয়ন্ত্রণে কাজ করেন।
চমেক’র বহির্বিভাগে গিয়ে দেখা মিলে এক দালালের। পিছু হেটে কিছুদুর যেতেই দেখা যায় দালালদের রয়েছে বিশাল সিণ্ডিকেট। একসাথে মিলিত হয়ে করা হয় বুদ্ধি পরামর্শ। চক্রের সদস্যদের সাথে রয়েছে সার্বক্ষণিক মুঠোফোনে যোগাযোগ। সন্দেহজনক মনে হওয়ার পাশে গিয়ে নাম জিজ্ঞাসা করতেই দেয় ভোঁ দৌড়।
জরুরী বিভাগে আরেক দালালের সন্ধান পাওয়া যায়। নাম তার সুমন। দীর্ঘক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায় জরুরী বিভাগের সামনে। কিছুক্ষণ পর পর রোগীর সাথে কথা বলার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে তেমন সাড়াও মিলছে না। টার্গেট অনুযায়ী কিছুক্ষণ পর এক মহিলাকে জিজ্ঞাসা করেন কী সমস্যা হয়েছে মানে রোগীর সমস্যা কি? উত্তর পাওয়ার সাথে সাথেই দেওয়া হলো অফার। বলতে শোনা যায় পাশের হাসপাতালে ভালো চিকিৎসা মিলিয়ে দিব। এবং বিশ্বাস রাখতে পারেন কম খরচে মিলিয়ে দেব ভালো চিকিৎসা। কিন্তু এখানে দিনেরপর দিন পড়ে থাকলেও ডাক্তার কবে পাবেন তার হিসেব আছে? এমনভাবে বিভিন্ন কলাকৌশলে অফার করে যাচ্ছেন সেই সেবাপ্রার্থীকে।
তবে সেই মহিলা সাড়া না দিয়ে চলে যান ভেতরে। পিছু নেয় প্রতিবেদক। জিজ্ঞাসা করা হয় ওই যুবক কী জানতে চাইলেন। নুর জাহান নামের সেই নারী বলেন, আমার রোগীকে অন্য হাসপাতালে ভালো চিকিৎসার ব্যবস্থা করে দিবেন বলছে। তবে আমি তো উনাকে চিনিও না। কী সহযোগিতা নিব?
চমেক হাসপাতালে আসা কহিনুর আক্তার নামের এক মহিলা জানান, আমি হাসপাতালে এসেছি তিনদিন হলো, আমার ভাগ্নি ভর্তি আছে। হাসপাতালে যেসব আয়া রয়েছে তারা বেশী ভয়ংকর। তাদের টাকা না দিলে কোন সেবা মেলেনা। এমনকি স্যালাইনের সুই খুলতে বলা হলে ২০-৫০ টাকা দিলে তারপর খুলে দেয়। তাদের কাছে অসহায় আমরা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দ্বিতীয় তলার বাউন্ডারিতে শুয়ে থাকা আরেক রোগীর অভিযোগ, গরীব মানুষ আমি টাকা কড়ি নেই। তাই চলাচলের রাস্তায় শুয়ে আছি৷ এখানে সেবা নিতে গেলে দালাল ধরতে হয়। চিকিৎসা পাওয়ার যে নিয়ম রয়েছে হাসপাতালে সেই নিয়ম অনুযায়ী তো চিকিৎসা পায়না। যদি টাকা-পয়সা থাকতো সব পাইতাম। না হলে প্রাইভেট হাসপাতালে যাইতাম। আমি এই জায়গায় দুইদিন, এভাবেই আছি। খাবার দাবারে কতো সমস্যা হচ্ছে কিন্তু বলার উপায় নেই। আর বাথরুম গুলোতে তো যাওয়ার মতো অবস্থায় নেই। আপনাকে এতোকিছু বলেও কী লাভ হবে। সমাধান করে দিবেন নাকি? গরীবের দুঃখ কিছুতেই যায় না। বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়েন এই রোগী।
অভিযোগ রয়েছে, হাসপাতালে দায়িত্বরত আনসার সদস্যরা বিভিন্ন সময় টাকা দাবী করেন। সিঁড়ি দিয়ে প্রবেশের সময় টাকা চাওয়া হয় বলে অভিযোগ স্বজন ও রোগীদের। এমনকি তাদের অবজ্ঞা করারও সুযোগ থাকেনা, কথার বিপরীত হলেই চালানো হয় হাতের লাঠি দিয়ে অত্যাচার। এছাড়াও আনসার সদস্যের লাঠির আঘাতে রোগী ও স্বজনদের মাথা ফাটাফাটিসহ শিশু নির্যাতন এবং গাড়ি ভাংচুরেরও অভিযোগ উঠে বিভিন্ন সময়। কিন্তু অজানা কারনে থামে না আনসার সদস্যদের দৌরাত্ম্য।
এর আগে গত ৬ নভেম্বর হাসপাতালের মর্গের দুই কর্মচারীর মধ্যে মারামারির ঘটনায় মো. ইলিয়াস (৪৭) নামের এক কর্মচারী চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায়।
একের পর এক অনাকাঙ্খিত ঘটনা, দালালের দৌরাত্ম, আনসার সদস্যদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগসহ নানান অরাজকতা তৈরী হলেও অজানা কারনে কোন কিছুই থামাতে পারেনা কর্তৃপক্ষ। তবে সম্প্রতি দালাল চক্রের বিশাল এক সিন্ডিকেটকে কব্জায় নিতে সক্ষম হয় চমেকের পুলিশ ফাঁড়ি। গ্রেফতার করা হয় নারী-পুরুষসহ দালাল চক্রের বেশ কয়েকজন সদস্যদের।
সম্প্রতি চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল (চমেক) থেকে দু’য়েক মাসে ডজনখানেক দালাল ধরা পড়ে চমেক পুলিশ ফাঁড়ির সদস্যদের হাতে। তবে পুরুষ দালালের মধ্যে নারী দালাল মিলছে বেশিরভাগ। যাদের লাগাম টেনে ধরতে ব্যর্থ হাসপাতাল প্রশাসন ও কর্তৃপক্ষ।
চমেক পুলিশ ফাঁড়ির এসআই নূরুল আলম আশিক বলেন, ‘অভিযোগ পেলেই গ্রেফতার করা হচ্ছে। তার বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে আদালতে সোপর্দ করা হচ্ছে। হাসপাতালের প্রতিটি ওয়ার্ডে আমাদের সার্বক্ষণিক নজরদারি করা হচ্ছে।’
জানতে চাইলে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. শামীম আহসান বলেন, ‘দালাল ধরা মানেই দালাল বেড়ে যাওয়া নয়। দালাল আগেও ছিলো, আগেও ধরা পড়েছে। এখন ওরা মহিলা দালাল এমপ্লয় করছে, এখন মহিলা দালাল বেশি ধরা পড়ছে এই।’
তিনি আরও বলেন, ‘আগে পুরুষ দালাল ধরা পড়েছে আর এখন নতুন করে মহিলা দালাল ধরা পড়ছে। তারমানে এই না উৎপাত বেড়ে গেছে। উৎপাত আগে যা ছিলো তার চেয়ে ৮০ ভাগ কমে গেছে।’


