বুধবার, ১ এপ্রিল ২০২৬
Single Top Banner

কাতারগামী শ্রমিকদের স্বাস্থ্য পরীক্ষায় চরম হয়রানি

নিজস্ব প্রতিবেদক

দেশের অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তি প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স। কিন্তু সেই রেমিট্যান্স যাদের হাত ধরে আসে—বিদেশগামী শ্রমিকদের—বিদেশে যাওয়ার প্রক্রিয়াতেই পড়তে হচ্ছে নানা ভোগান্তিতে। বিশেষ করে কাতারগামী শ্রমিকদের বাধ্যতামূলক স্বাস্থ্য পরীক্ষা ঘিরে এক ধরনের দুর্নীতির চক্র গড়ে উঠেছে বলে অভিযোগ উঠেছে, যেখানে পরীক্ষার নামে গড়ে তোলা হয়েছে হয়রানির ফাঁদ। অভিযোগ রয়েছে, নির্ধারিত কিছু মেডিকেল সেন্টার ও কিছু ট্রাভেল এজেন্সির যোগসাজশে সিন্ডিকেট তৈরি করে ঘুষ ছাড়া কাউকে “ফিট” সার্টিফিকেট দেওয়া হয় না।

বর্তমানে বাংলাদেশে কাতার সরকারের অনুমোদিত মাত্র দুটি মেডিকেল সেন্টার রয়েছে। একটি ঢাকার বাংলা মোটরের রূপায়ন ট্রেড সেন্টারের ১১ তলায়, অন্যটি সিলেটের গার্ডেন টাওয়ারের দ্বিতীয় তলায়। অথচ চট্টগ্রাম অঞ্চল থেকে সবচেয়ে বেশি শ্রমিক কাতারে যান, কিন্তু সেখানে এখনো কোনো কাতার মেডিকেল সেন্টার নেই। ফলে চট্টগ্রাম ও পার্শ্ববর্তী জেলার মানুষকে ঢাকায় বা সিলেট গিয়ে পরীক্ষা দিতে হচ্ছে, যা ভিসাপ্রত্যাশী দরিদ্র শ্রমিকদের জন্য এক বড় বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার বাসিন্দা মো. আরিফ নামে এক যুবক জানান, তিনি শ্রমিক ভিসায় কাতার যাওয়ার প্রক্রিয়ায় আছেন। স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য তাকে ঢাকায় তিনবার যেতে হয়েছে। প্রথমবার এক্স-রে রিপোর্টে সমস্যা দেখিয়ে ফেরত পাঠানো হয়। দ্বিতীয়বার ঢাকায় গিয়ে আবার এক্স-রে করতে বলা হয়। এরপর বলা হয়, রিপোর্টে সমস্যা রয়েছে, সব পরীক্ষা আবার নতুন করে করাতে হবে, যার জন্য ৬-৭ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। শেষ পর্যন্ত তৃতীয়বার পরীক্ষায় সঠিক রিপোর্ট পাওয়া যায়। তার মতে, ঢাকার কাতার মেডিকেল সেন্টারে প্রতিনিয়ত এমন হয়রানির মুখে পড়ছেন অনেকেই।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, ওই সেন্টারে ঘুষ ছাড়া সঠিক রিপোর্ট পাওয়া প্রায় অসম্ভব। এমনও অভিযোগ রয়েছে, টাকা না দিলে ‘আনফিট’ দেখিয়ে ভিসা বাতিলের ঝুঁকি তৈরি করে এক ধরনের চাপ সৃষ্টি করা হয়। কেউ কেউ জানিয়েছেন, ভিসার মেয়াদ সাধারণত তিন মাস হলেও, শুধু স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্যই সময় লেগে যায় দুই মাসের বেশি। পরীক্ষার নামে কোনো না কোনো অজুহাতে বারবার ঢাকায় যেতে বাধ্য করা হয়, ফলে যাতায়াত, খাওয়া-দাওয়াসহ আনুষঙ্গিক খরচে আরও অর্থ ব্যয় হয়।

অনেক প্রবাসী প্রত্যাশী জানিয়েছেন, রিপোর্টে সমস্যা আছে জানালেও বাইরে অন্য কোনো ক্লিনিকে পরীক্ষা করিয়ে দেখা গেছে, কোনো সমস্যাই নেই। এর অর্থ হচ্ছে, ইচ্ছাকৃতভাবে বিভ্রান্তিকর রিপোর্ট দিয়ে হয়রানি চালানো হচ্ছে। অনেকে জানান, এই ফাঁকে কোনো কোনো দালালচক্র ভিসার মূল মালিককে বাদ দিয়ে সেই স্লট অন্য কারও কাছে বিক্রি করে দেয়।

অভিযোগ রয়েছে, প্রতিদিন কাতার মেডিকেল সেন্টারে হাজার হাজার লোক ভিড় করছেন, যার বিপরীতে তৈরি হচ্ছে কৃত্রিম সংকট। এই সুযোগে দালালদের দৌরাত্ম্য বেড়ে যায়। বিদেশে যাওয়ার স্বপ্ন দেখা শ্রমিকদের ফাঁদে ফেলে সিন্ডিকেট প্রতিদিন কোটি টাকারও বেশি হাতিয়ে নিচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অথচ এসব ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর কোনো তদারকি নেই। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, অভিবাসন ও স্বাস্থ্য পরীক্ষার প্রক্রিয়াকে ঘিরে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট কাজ করছে। সংশ্লিষ্টরা বলেন, দেরিতে রিপোর্ট দেওয়া বা সমস্যাজনক রিপোর্ট দেখিয়ে ভিসার স্লট অন্য কারও কাছে বিক্রি করার সুযোগ তৈরি করছে একটি গোষ্ঠী। আবার ‘ওষুধ খাওয়ার’ নাম করে সময়ক্ষেপণ করানো হচ্ছে। তার মতে, এই সিন্ডিকেট ভাঙতে হলে দ্রুত সরকারকে হস্তক্ষেপ করতে হবে। প্রয়োজন টাস্কফোর্স গঠন করে অভিযানে নামা।

বাংলাদেশে যেখানে বিদেশগমনেচ্ছু শ্রমিকদের সংখ্যা দিনদিন বাড়ছে, সেখানে এই হয়রানিমূলক ব্যবস্থা পুরো অভিবাসন প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। অন্যান্য দেশে যেখানে এক মাসেরও কম সময়ে মেডিকেলসহ ভিসা প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়, সেখানে বাংলাদেশে শুধু স্বাস্থ্য পরীক্ষার ধকলেই কেটে যাচ্ছে বহু সময়। এর ফলে অনেক শ্রমিকই নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কর্মস্থলে পৌঁছাতে পারছেন না, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে তাদের ব্যক্তিগত ভবিষ্যৎ ও দেশের রেমিট্যান্স প্রবাহে।

সরকারের প্রতি জোর দাবি উঠেছে—এই অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতির সিন্ডিকেট এখনই ভাঙতে হবে। কাতারসহ অন্যান্য দেশের ভিসা ও মেডিকেল প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক এবং হয়রানিমুক্ত করতে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। অন্যথায় প্রবাসী শ্রমিকদের আস্থা হারানোর পাশাপাশি দেশের অর্থনীতিও পড়বে চাপে।

Single Sidebar Banner
  • সর্বশেষ
  • পঠিত