বৃহস্পতিবার, ২ এপ্রিল ২০২৬
Single Top Banner

কক্সবাজার বাঁকখালী নদীর অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ শুরু, দখলদারের তালিকায় ৩০০ জন

নিজস্ব প্রতিবেদক :

কক্সবাজার শহরের ঐতিহাসিক বাঁকখালী নদীর তীরবর্তী অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) বৃহৎ পরিসরে অভিযান শুরু করেছে। বাঁকখালী নদীর দখলদারির বিরুদ্ধে এই অভিযান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ নদীটি দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ দখলে রয়েছে, যা পরিবেশগত ক্ষতি এবং নদীটির প্রবাহ ব্যাহত করছে। বিআইডব্লিউটিএ’র অভিযানে সেনাবাহিনী, পুলিশ, র‌্যাবসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা মোতায়েন করা হয়েছে।

এই অভিযান চলবে ৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত, এবং অভিযানের সময়সীমা আরো বাড়ানো হতে পারে। এর আগেই কক্সবাজারের প্রশাসন ও বিআইডব্লিউটিএ একটি তালিকা তৈরি করেছে, যার মধ্যে বাঁকখালী নদীর সীমানায় অবৈধভাবে স্থাপনা নির্মাণকারীদের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

কক্সবাজার শহরের পশ্চিম পাশে বাঁকখালী নদীর কস্তুরাঘাট একসময় প্রধান বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ছিল। ওই ঘাট দিয়ে কক্সবাজার শহর থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত চলাচল করতো জাহাজ ও যাত্রীবাহী লঞ্চ। কিন্তু, বর্তমানে সেখানে অন্তত ৩০০ একরের বেশি প্যারাবন ধ্বংস এবং নদী ভরাট করে দুই শতাধিক পাকা-সেমিপাকা ঘরবাড়ি, দোকানপাটসহ নানা স্থাপনা নির্মিত হয়েছে।

নদীর সীমানায় প্রায় ছয় কিলোমিটার এলাকাজুড়ে বাঁকখালী নদী দখল করে নির্মিত হয়েছে সহস্রাধিক অবৈধ স্থাপনা। স্থানীয় ভূমি অফিস এবং বিআইডব্লিউটিএ’র দুটি তালিকায় মোট সাড়ে ৩০০ জন দখলদারের নাম রয়েছে, যাদের মধ্যে অনেকেই প্রভাবশালী ব্যক্তি। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য নামগুলো হলো: কক্সবাজার জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মুজিবুর রহমান, সাংগঠনিক সম্পাদক মাসেদুল হক রাশেদ, কক্সবাজার পৌর বিএনপির সভাপতি রফিকুল হুদা চৌধুরী এবং এবি পার্টির কেন্দ্রীয় নেতা জাহাঙ্গীর কাশেম।

বাঁকখালী নদীটি কক্সবাজার জেলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নদী, যা বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি থেকে উৎপত্তি হয়ে কক্সবাজার সদর ও রামু উপজেলা দিয়ে প্রবাহিত হয়ে বঙ্গোপসাগরে মিশেছে। নদীটির সীমানায় বহু অবৈধ স্থাপনা নির্মিত হয়েছে, যার মধ্যে বেশিরভাগই ১০ থেকে ১২ বছর আগে গড়ে উঠেছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, নুনিয়াছড়া থেকে মাঝিরঘাট পর্যন্ত ছয় কিলোমিটার এলাকাজুড়ে সহস্রাধিক অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে। এসব স্থাপনার মধ্যে রয়েছে পাকা এবং সেমিপাকা ঘরবাড়ি, দোকানপাট, রেস্টুরেন্ট, এবং অন্যান্য ব্যবসায়িক স্থাপনা।

এই অবৈধ স্থাপনার ফলে নদীটির প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, যার ফলে নদী ভরাট হয়ে যাচ্ছে এবং নদীর পরিবেশ ও প্রতিবেশী বাস্তুতন্ত্রের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব পড়ছে। নদীটির পাশের প্যারাবনও বিপুলভাবে ধ্বংস হয়েছে, যা পরিবেশবিদদের উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে হাইকোর্টের নির্দেশনায় কক্সবাজার জেলা প্রশাসন এবং বিআইডব্লিউটিএ যৌথ অভিযান চালিয়ে চার শতাধিক অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করেছিল। এ সময় ৩০০ একর প্যারাবন মুক্ত করা হয়েছিল, কিন্তু সেই জমিতে পুনরায় দুই শতাধিক অবৈধ স্থাপনা নির্মিত হয়েছে। নদীর দখলদাররা নিয়মিতভাবে নতুন স্থাপনা নির্মাণ করে এবং এসব স্থাপনা বেআইনিভাবে পানি, প্যারাবন, এবং জলাভূমি দখল করছে। গত ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর এই ধরনের স্থাপনা নির্মাণের হিড়িক পড়েছে। তবে এখন পর্যন্ত দখলকারীদের বিরুদ্ধে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি।

এদিকে, স্থানীয় পরিবেশকর্মীরা এবং সাধারণ মানুষ অভিযোগ করেছেন যে, দখলদারদের বিরুদ্ধে যথাযথ পদক্ষেপ না নেওয়া হলে নদী এবং পরিবেশের ক্ষতি আরো বাড়বে। তারা দাবি করছেন, সরকারের এই অভিযানকে কার্যকর এবং দীর্ঘস্থায়ী করতে হবে, যেন বাঁকখালী নদীকে সুরক্ষিত রাখা যায়।

এছাড়া, স্থানীয়দের অভিযোগ যে, দখলদাররা সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগকে উপেক্ষা করে নদী ও প্যারাবন ধ্বংস করছে, যা দীর্ঘমেয়াদে কক্সবাজারের পরিবেশকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। এই ধরনের অভিযান আরও সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ এবং দীর্ঘমেয়াদী হতে হবে, যাতে অবৈধ দখলদারদের কার্যক্রম বন্ধ করা যায় এবং পরিবেশ সংরক্ষণের মাধ্যমে নদীটির প্রবাহ ও প্রতিবেশী বাস্তুতন্ত্র রক্ষা করা সম্ভব হয়।

Single Sidebar Banner
  • সর্বশেষ
  • পঠিত