চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস—যেখানে হাজারো শিক্ষার্থী স্বপ্ন বুনে। কিন্তু গত ৩১ আগস্ট ও ১ সেপ্টেম্বর সেই ক্যাম্পাস পরিণত হয়েছিল এক বিভীষিকাময় যুদ্ধক্ষেত্রে। গ্রামবাসীর সঙ্গে শিক্ষার্থীদের ভয়াবহ সংঘর্ষে আহত হন অসংখ্য শিক্ষার্থী। চারদিকে শুধু আতঙ্ক, রক্তাক্ত দেহ, সাহায্যের আহাজারি। এমন পরিস্থিতিতে যখন অধিকাংশ যানবাহন ভয়ে পালিয়ে যাচ্ছিল, তখন এক সাধারণ রিকশাচালক নিজের অসাধারণ মানবিকতার নজির রেখে যান। তিনি মহরম আলী রুবেল।
পেশায় তিনি একজন সাধারণ রিকশাচালক। প্রতিদিন ক্যাম্পাসের ভেতরে শিক্ষার্থীদের যাতায়াত করিয়ে সংসার চালান। কিন্তু সেই দিনে তিনি প্রমাণ করলেন, মানবিকতা কোনো পদ-পদবী বা সামাজিক অবস্থানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আহতদের চিৎকার শুনে রুবেল ছুটে যান নিজের রিকশা নিয়ে।
সেদিন তিনি একাই প্রায় ৮৩ জন আহত শিক্ষার্থীকে বিনা ভাড়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টারে পৌঁছে দেন। শুধু পৌঁছে দেওয়া নয়—অনেক গুরুতর আহত শিক্ষার্থীকে তিনি নিজ হাতে রিকশায় তুলে নেন। যারা হাঁটতে পারছিল না, তাদের কাঁধে ভর দিয়ে সহায়তা করেন। কারও রক্তে ভিজে যায় তার পোশাক, কিন্তু তাতেও থামেননি তিনি। যেন আহতদের জীবন বাঁচানোই ছিল তার একমাত্র দায়িত্ব।
চবির এক শিক্ষার্থী বলেছিলেন, “আমরা সবাই সেদিন আতঙ্কে দৌড়াচ্ছিলাম। কেউ কাছে আসছিল না। তখন হঠাৎ দেখি রুবেল ভাই দৌড়ে এসে বললেন, ভাই তাড়াতাড়ি উঠেন, আমি নিয়ে যাচ্ছি। সেই মুহূর্তে তিনি আমাদের কাছে একজন অভিভাবকের মতো মনে হয়েছিল।”
রুবেলের এ মহৎ কাজ ক্যাম্পাসজুড়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। শিক্ষার্থীরা তাকে ‘প্রকৃত নায়ক’ হিসেবে আখ্যা দিচ্ছেন।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল বডি বৃহস্পতিবার (১১ সেপ্টেম্বর) তার এ কাজের স্বীকৃতি দিয়েছে। সহকারী প্রক্টর নুরুল হামিদ কানন বলেন, “মহরম আলী রুবেল কেবল একজন রিকশাচালক নন, তিনি চিন্তা ও মননে পূর্ণ মানবিক একজন মানুষ। ৮৩ জন আহত শিক্ষার্থীকে বিনা ভাড়ায় হাসপাতালে পৌঁছে দিয়ে তিনি যে উদাহরণ তৈরি করেছেন, তা ইতিহাস হয়ে থাকবে। তার সরলতা, সততা, মানবিকতা ও দায়িত্ববোধ আমাদের জন্য গর্বের।”
রুবেল নিজেও বিনম্রভাবে বলেছেন, “আমি শুধু আমার কর্তব্য করেছি। সেদিন যদি আমি সাহায্য না করতাম, হয়তো অনেক শিক্ষার্থীর অবস্থা আরও খারাপ হতো। তারা তো আমাদের সন্তানসম।”


